Loading...
The Financial Express

টিকাদানে এগিয়ে থেকেও সংক্রমণের বাড়-বাড়ন্ত যে দেশে

| Updated: May 18, 2021 14:38:18


দ্বীপরাষ্ট্র সিশেলেসের আয়ের বড় খাত পর্যটন; তড়িঘড়ি করে তা খুলে দেওয়াই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স দ্বীপরাষ্ট্র সিশেলেসের আয়ের বড় খাত পর্যটন; তড়িঘড়ি করে তা খুলে দেওয়াই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকাদানে বিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি সেশেলেস, অথচ সেই দেশটিতে এখন করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না।

গত এক মাসে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ভারতীয় মহাসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্রটির সরকার ফের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সিএনএন-এর বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেশেলেসে সংক্রমণের ঊধ্বগতির মানে এই নয় যে টিকায় কাজ হচ্ছে না। বরং এটাই মেলে ধরছে যে টিকা নেওয়ার পরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থায় ঢিল দেওয়া যাবে না।

ভারত মহাসাগরে আফ্রিকা উপকূলের কাছে ১১৫টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত রাষ্ট্র সেশেলেস। ১৭৭ বর্গমাইলের এই দ্বীপরাষ্ট্রে জনসংখ্যা এক লাখের কাছাকাছি।

জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির তথ্য বলছে, সেশেলেসে সোমবার নাগাদ শনাক্ত কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ৭৬৪ জন, এর মধ্যে মারা গেছে ৩৫ জন।

যেখানে বিশ্বের নানা দেশে টিকার জন্য চলছে হাহাকার, সেখানে ক্ষুদ্র এই দেশটি তার নাগরিকদের সুরক্ষায় ৬১ দশমিক ৪ শতাংশ অধিবাসীকে টিকা দিয়ে ফেলেছে ইতোমধ্যে।

কিন্তু সংক্রমণের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতির মধ্যে গত বৃহস্পতিবার দেখা গেছে, দেশটিতে সক্রিয় রোগীর সংখ্যা এখন ২ হাজার ৭০০। আর এই রোগীদের ৩৩ শতাংশই টিকা নেওয়ার পর আক্রান্ত হয়েছেন।

অথচ মহামারী নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে ভেবে গত মাসেই বিধি-নিষেধ শিথিল করে পর্যটকদের জন্যও দুয়ার খুলে দিয়েছিল সেশেলেস সরকার। পর্যটন থেকেই দেশটির আয়ের বড় অংশ আসে। তাই পর্যটক আকর্ষণে বাইরে থেকে কেউ এলে কোভিড-১৯ নেগেটিভ হলে কোয়ারেন্টিনে থাকার বাধ্যবাধকতাও তুলে নেওয়া হয়।

আর তার পর থেকে সেশেলেসে ৩ হাজার ৭০০ জনেরও (মোট সংক্রমণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি) বেশি মানুষের সংক্রমণ ধরা পড়ে। আর মোট মৃত্যুর অর্ধেকই (১৬ জন) হয় গত এক মাসে।

এটা এখনও স্পষ্ট নয়, কেন হঠাৎ করে সেশেলেসে কোভিড-১৯ সংক্রমণ বাড়ছে। দেশটির পররাষ্ট্র ও পর্যটনমন্ত্রী সিলভাস্টর রাডেগোন্ডে বলেন, টিকা নেওয়ার পর সবার মধ্যে একটা গাছাড়া ভাব চলে এসেছে। আর এখন পরীক্ষাও বেশি হচ্ছে বলে শনাক্ত রোগীও বেড়েছে।

পর্যটনকেন্দ্রিক এই দেশে মানুষের মধ্যে হৈ-হুল্লোড়ের প্রবণতা বেশি। নানা ধরনের পার্টিতে মেতে থাকতে পছন্দ করে দ্বীপবাসী।

“টিকা নেওয়ার পর গত কয়েক মাসে মানুষ দেখছে, আক্রান্ত হলেও তো খুব একটা অসুস্থ হচ্ছি না, বড় ধরনের জটিলতাও হচ্ছে না, মারাও যাচ্ছে না কেউ। তাই মানুষ সতর্কতা ভুলে গেছে,” বলেন রাডেগোন্ডে।

সেশেলেসে দুটি টিকা দেওয়া হচ্ছে। একটি চীনের সিনোফার্মের তৈরি টিকা, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে তৈরি অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা। যারা টিকা নিয়েছেন, তাদের ৫৭ শতাংশকে দেওয়া হয়েছে সিনোফার্মের টিকা, বাকি ৪৩ শতাংশ পেয়েছেন কোভিশিল্ড। বয়স্কদের দেওয়া হয়েছে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা।

গত এক মাসের মধ্যে চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহে যত রোগী শনাক্ত হয়েছে, তার ৩৭ শতাংশই টিকার দুই ডোজ নেওয়া ব্যক্তি বলে দেশটির সরকার জানিয়েছে। তবে তারা কোন টিকা নিয়েছেন এবং তাদের বয়স কত, তা প্রকাশ করা হয়নি।

আক্রান্ত হয়ে যতজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তার ২০ শতাংশই টিকার দুই ডোজ সম্পন্ন করেছেন। তবে তাদের কারও অবস্থাই গুরুতর নয় বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

রাডেগোন্ডে জানিয়েছেন, দেশটিতে এখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে আইসিইউতে রয়েছেন কেবল দুজন কোভিড-১৯ রোগী।

“তার মানে হল টিকা সুরক্ষা দিচ্ছে। যারা টিকা নিয়েছেন, তারা আক্রান্ত হলেও তেমন অসুস্থ হচ্ছেন না। দুটি টিকার উপরই আমাদের ভরসা আছে। এগুলোই পরিস্থিতির নাজুক হওয়া ঠেকাচ্ছে,” বলেন তিনি।

তাহলে টিকা কী করছে?

টিকা নেওয়ার পরও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটি অস্বাভাবিক নয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, এটা অপ্রত্যাশিতও নয়।

সিনোফার্ম ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা- দুটোর টিকাই ডব্লিউএইচও অনুমোদন দিয়েছে। আর এই পর্যন্ত উদ্ভাবিত কোনো টিকাই যে শতভাগ কার্যকর নয়।

অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা সংক্রমণ প্রতিরোধে ৭৬ শতাংশ কার্যকর বলে দাবি করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে বলা হচ্ছে, এটা গুরুতর অসুস্থ হওয়া ঠেকাতে শতভাগ কার্যকর। অন্যদিকে সংক্রমণ প্রতিরোধে সিনোফার্মের টিকার ৭৯ শতাংশ কার্যকারিতার প্রমাণ মিলেছে পরীক্ষামূলক প্রয়োগে।

টিকায় নিরাময়যোগ্য রোগ বিষয়ে আফ্রিকায় ডব্লিউএইচওর কর্মসূচি সমন্বয়ক ডা. রিচার্ড মিহিগো বলেন, সেশেলেসের তথ্য প্রমাণ করে কোভিড-১৯ টিকার কার্যকারিতা রয়েছে। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ হওয়া এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ঠেকানোর ক্ষেত্রে।

“সবাই সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত এই রোগ না ছড়ানোর কোনো কারণই নেই,” বলেন তিনি।

ডব্লিউএইচওর এই বিশেষজ্ঞ এটাও জানিয়েছেন, সেশেলেসের তথ্যউপাত্ত নিয়ে তারা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির নিউরোবায়োলজি ও বায়ো ইঞ্জনিয়ারিংয়ের সহযোগী অধ্যাপক মাইকেল জেড লিন বলেন, “টিকা দেওয়ার পরও কারও না কারও আক্রান্ত হওয়ার খবরটি মোটেই অবাক করার মতো নয়।”

টিকাগুলোর কার্যকারিতার হার তুলে ধরে তিনি বলেন, শতভাগ মানুষকে টিকা দেওয়া হলেও ২০ শতাংশের মতো মানুষ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থেকেই যাবে।

তবে আক্রান্ত হলেও তাদের বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে টিকা যে ভূমিকা রাখছে, তার গুরুত্ব তুলে ধরেন মাইকেল লিন।

সেশেলেসে দুই টিকার মধ্যে কোনটি গ্রহণকারীরা আক্রান্ত বেশি হচ্ছে কিংবা করোনাভাইরাসের পরিবর্তিত কোনো ধরন দেশটিতে বিস্তার লাভ করেছে কি না, তা জানা যায়নি।

কোভিড-১৯ টিকা নিচ্ছেন সেশেলেসের প্রেসিডেন্ট ওয়াভেল রামাকালাওয়ান। দেশটি ইতোমধ্যে ৬০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিয়েছে।

অসতর্ক হলেই বিপদ

সিশেলেসের ঘটনা তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মহামারীতে অসতর্ক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ সবাইকে টিকা দেওয়া হলে আর কেউ আক্রান্ত হবে না, এমনটা ভাবাও উচিৎ হবে না।

“টিকা আমাদের গুরুতর অসুস্থ হওয়া থেকে রক্ষা করবে, কিন্তু আক্রান্ত হওয়াই পুরোপুরি ঠেকিয়ে দেবে, এমনটা আশা করা বোকামি,” বলেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সহযোগী অধ্যাপক জেরেমি লিম।

আবার অস্ট্রেলিয়ার মার্ডক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ক্যাসি বেরি বলেন, সেশেলেসের ঘটনা দিয়ে গোটা বিশ্ব পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা ভুল হবে।

টিকায় সিশেলেসের সাফল্য সাম্প্রতিক সংক্রমণে ঢেকে যাচ্ছে বলে মনে করার কোনো কারণ দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।

ক্যাসি বেরি বলেন, “আমরা সবাই এখন টিকার পেছনে দৌড়াচ্ছি। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, সামাজিক দূরত্ব, বিশুদ্ধ বায়ু প্রবাহ আর মাস্ক পরাই কিন্তু সংক্রমণ এড়ানোর মূল হাতিয়ার।”

ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক রান্ড করপোরেশনের মহামারী বিশেষজ্ঞ জেনিফার বোয়ের মতে, করোনাভাইরাস হুট করে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে না। সুতরাং এর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টাই চালিয়ে যেতে হবে।

মহামারীতে গত বছর সিশেলেসের পর্যটন খাতে মন্দা যাওয়ায় তা উসুল করতে এবার টিকা দিয়েই নেমে পড়েছে দেশটি। এখন দেশটিতে প্রতিদিন ৫০০ এর মতো পর্যটক যাচ্ছে। কিন্তু সেটাই একটা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

“আপনি ৬০ ভাগ মানুষকে টিকা দিয়ে স্বাস্থ্যবিধির খাতাটি ছুড়ে ফেলে দিতে পারেন না,” বলেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মাইকেল লিন।

Share if you like

Filter By Topic