
প্রকাশিত হয়েছে :
সংশোধিত :

কদম রসুল দরগাহ, নাম শুনেই অনেকে হয়তো অনুমান করে ফেলবেন রসুলের কদম (পা) সংশ্লিষ্ট কিছু নিয়ে এই দরগাহ।
কথিত আছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর কদম মোবারকের ছাপ সংবলিত একটি পাথর আছে এই দরগাহ-তে। তাই এই দরগাহর নামকরণ করা হয় কদম রসুল দরগাহ নামে।
এই দরগাহটি নারায়ণগঞ্জ জেলার অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান যা বন্দর উপজেলার নবীগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর কোল ঘেঁষে অবস্থিত।
কথিত আছে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মেরাজের উদ্দেশ্যে বোরাকে ওঠার সময় বেশকিছু পাথরে তার পায়ের ছাপ পরে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত পাথরটি আছে জেরুজালেমে। এছাড়া আরও কিছু পাথর রয়েছে ইস্তাম্বুল, কায়রো এবং দামেস্কে।
বাংলাদেশেও এমন দুটি পাথর রয়েছে, যার একটি আছে চট্টগ্রামে আর অপরটি নবীগঞ্জের কদম রসুল দরগায়। ধারণা করা হয়, দরগায় রক্ষিত পাথরের ফলকের ওপর দৃশ্যমান পদচিহ্নটি প্রকৃতপক্ষে হযরত মুহম্মদ (সা:) এর পদচিহ্ন। পরে সেই পাথরটিকে মানুষের পায়ের পাতার আকৃতিতে কাটা হয়।

পাইতি ঘরে কাচের বাক্সে কদম রসুল পাথর
কদম রসুল দরগাহের অতীত
মির্জা নাথানের লিখিত ঐতিহাসিক গ্রন্থ বাহারিস্থান-ই-গায়েবী থেকে জানা যায় যে মুঘল সম্রাট আকবর এর বিপক্ষে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী আফগান নেতা মাসুম খান কাবুলী নামে সম্ভ্রান্ত রাজা ছিলেন। মাসুম খান কাবুলী ঈশা খাঁর বন্ধু ছিলেন। তিনি ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে আরব বণিকদের থেকে অনেক টাকার বিনিময়ে এই মহা মুল্যবান পাথরটি ক্রয় করেন এবং এ স্থানে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।
সুবাদার ইসলাম খান, মুঘল সম্রাট শাহজাহানসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এ স্থান দর্শন করেন। এই দরগার জন্য সুলতান শুজা ৮০ বিঘা জমি দান করেছিলেন।
ঈশা খাঁর নাতি দেওয়ান মনোয়ার খাঁ এখানে একটি ইমারত তৈরি করেছিলেন। একসময় সেই ইমারতটি কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
ঢাকার জমিদার গোলাম নবী পরে ১৭৭৭ থেকে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দের (১১৯১ হিজরিতে) দিকে এক গম্বুজ বিশিষ্ট দরগা নির্মাণ করে পাথর খন্ডটি স্থাপন করেন। গোলাম নবীর তৃতীয় পুত্র গোলাম মোহাম্মদ ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম দিকের দোতলা তোরণটি নির্মাণ করেন।
বর্তমান কদম রসুল দরগাহ
দরগার পশ্চিম দিকে সুউচ্চ তোরণ দরগার মূল প্রবেশ পথ। খুব দূর থেকে এ তোরণটি দেখা যায়। তোরণ দিয়ে প্রবেশ করার পরই চোখে পড়বে দরগা চত্ত্বরের মাঝামাঝি অবস্থিত একটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট সাদা শ্বেতপাথরের মাজার। এ মাজারের ভেতরেই খুব যত্নের সাথে সংরক্ষিত আছে কদম রসুল পাথরটি।
নবীজীর পদচিহ্ন সম্বলিত পাথরটি যেখানে রাখা হয়েছে তাকে বলা হয় পাইতি ঘর। পাথরটি একটি কাঁচের বাক্সের ভেতরে রাখা আছে।
৩০-৩৫ বছর আগে দর্শনার্থীরা এটি খুব সহজেই এটি দেখতে পারতো, এই পাথরে চুমো খেতে পারতো। এখন দর্শনাথীরা দরজা থেকে কাচের বাক্সে থাকা পাথরটি দেখতে পারে এবং কিছু বিশেষ দিনেই এটা বাক্স থেকে বের করে দেখানো হয়।
পাথরটি যখন বের করা হয় তখন পাথরটি একটি গোলাপজল মিশ্রিত পানির মধ্যে চুবিয়ে সেই পানি ছোট একটি কাঁসার গ্লাসে করে ভক্তদের পান করতে দেয়া হয়।

ছবিতে তিন দরজা বিশিষ্ট পাইতি ঘর
পাইতি ঘরের (যে স্থানে কদম রসুল পাথরটি রাখা আছে) দক্ষিণ পাশে রয়েছে কিছু মাজার। এই পাথরটির ধারক হিসেবে হাজী নূর মোহাম্মদ শাহ (রহ.)-এর মাজার এখানকার প্রধান মাজার। প্রধান মাজারের পাশে রয়েছে তার প্রধান ১৩ জন ভক্তের মাজার। পশ্চিম দিকে আরও ৪ টি মাজার রয়েছে।

পাইতি ঘরের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত মাজার
পাইতি ঘরের উত্তর পাশে দোতলা একটি মসজিদ রয়েছে। পূর্ব পাশে মহিলাদের নামাজ পড়ার স্থান রয়েছে। তার পাশে কামাল শাহ ও সৈয়দ বোরহান উদ্দিন শাহ-এর মাজার।
দরগাহে খালি পায়ে যাওয়ার রেওয়াজ কেন?
সম্রাট শাহজাহান যখন তৎকালীন রাজধানী ঢাকা আসেন, তিনি কদম রসুল দরগাহ পরিদর্শন করেন এবং খালি পায়ে ওঠেন। সেদিন থেকে সম্রাট শাহজাহানের সম্মানার্থে খালি পায়ে দরগা শরীফে ওঠার রেওয়াজ চালু হয়।
যেভাবে যাবেন
ঢাকার গুলিস্তান থেকে বাসে করে নারায়ণগঞ্জ শহরের ২নং লঞ্চ ঘাট যাবেন। সেখান থেকে নৌকা বা ফেরিতে করে শীতলক্ষ্যা নদী পার হয়ে বন্দর উপজেলার ঘাটে নেমে রিক্সাযোগে কদম রসুল দরগাহতে যাওয়া যাবে।
সত্যতা
প্রথাগত মুসলিমরা এটি স্বীকার করেন না। তাছাড়া বিভিন্ন জায়গায় সংরক্ষিত পদচিহ্ন গুলো বিভিন্ন আকারের যেখানে একজন মানুষের পায়ের ছাপ একই হওয়ার কথা। এই মাজার ও পাথর নিয়ে লোকমুখে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও গল্প প্রচলিত আছে। কিন্তু এই পাথরের ছাপটি রাসুলের পায়ের ছাপ দাবি করা হলেও এর কোনো ঐতিহাসিক স্বীকৃতি নেই।
s-13th-2018422920@mcj.du.ac.bd

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.