Bangla
3 years ago

প্রাচীন ভারতের স্তন কর ও ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে নাঙ্গেলির প্রতিবাদ

প্রকাশিত হয়েছে :

সংশোধিত :

 ও নাঙ্গেলি বৃত্তান্ত

ভারতের কেরালা রাজ্যে আলাপুঝার এঝাওয়া সম্প্রদায়ের এক নিম্নবর্ণের কৃষক পরিবারে জন্ম নেন ‘নাঙ্গেলি’ নামের এক সাধারণ নারী। নাঙ্গেলি অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন ‘মুলাক্করম’-এর বিরুদ্ধে  প্রতিবাদে। নিম্নশ্রেণির নারীদের অধিকার আদায়ের জন্যে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন নাঙ্গেলি, দিয়েছিলেন আত্মহুতি।  

মুলাক্করম বা স্তন শুল্ক কী? 

সালটা ১৮০৩। ভারতবর্ষের কেরালা অঙ্গরাজ্যে চালু ছিল এক অদ্ভুত প্রথা। ত্রিবাঙ্কুর রাজা নিয়ম করেন, ব্রাহ্মণ ব্যতীত অন্য কোনো হিন্দু নারী তার স্তন ঢেকে রাখতে পারবে না। ব্রাহ্মণ নারীরা স্তনের ওপর এক ধরনের সাদা কাপড় দিয়ে আব্রু করবার সুযোগ পেতেন কোনো ধরনের শুল্ক প্রদান ছাড়াই। কিন্তু এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতেন অন্যান্য শ্রেণির নারীরা। নিম্নবর্ণের নারীদের স্তনকে আবৃত করবার জন্যে দিতে হতো শুল্ক এবং এ শুল্ক নির্ধারণ করা হতো স্তনের আকারের ওপর। আকার বড় হলে দিতে হবে বেশি কর।

শ্রেণি শোষণের অভিনব কৌশল 

নিম্নশ্রেণির নারীদের আব্রুর জন্যে কর আরোপ করে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ চলে আসত রাজ কোষাগারে। আর আদায়কৃত শুল্কের সিংহভাগ চলে যেত পদ্মনাভ মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণে। শুধুমাত্র স্তনকরই নয়, নানা ধরনের আজব কর যেমন মৎসজীবীদের জাল রাখবার জন্যে কর, অলঙ্কার পরিধানের জন্যে কর, গোফের ওপর কর নির্ধারণ প্রভৃতি ১১০ ধরনের করের মাধ্যমে ত্রিবাঙ্কুর রাজা নিম্নশ্রেণির মানুষের ওপর শোষণ ও নিপীড়ন চালাতেন। 

ধর্মের মোড়কে ব্রাহ্মণ্যবাদের তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বকে ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি করা হতো শ্রেণি বৈষম্য। শাসকশ্রেণি থাকত উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত এবং শোষিতশ্রেণী অনেকটা ভয়েই মুখ বুজে সমস্ত অন্যায় অত্যাচার মেনে নিত।

নাঙ্গেলি: রক্ত দিয়ে লেখা নাম

কৃষ্ণা বর্ণের এক নারী নাঙ্গেলি, বয়েস বছর পয়ত্রিশ। কাজের জন্যে প্রায়ই ঘরের বাইরে বেরোতেন নাঙ্গেলি। স্তনকে আবৃত করে রাখবার কারণে নাঙ্গেলিকে আনা হয়েছিল স্তন শুল্কের আওতায়। শুল্ক সংগ্রহ করতে আসা রাজার প্রতিনিধি, যাদেরকে বলা হতো পর্বরতিয়ার, প্রায়ই শুল্ক পরিশোধের জন্যে চাপ দিতে থাকে নাঙ্গেলিকে। 

দিনমজুরি করে কোনোমতে সংসার চলে। মড়ার ওপর খাড়ার ঘা এই খাজনার বোঝা। এরপর কোনো একদিন শুল্ক সংগ্রহকারী আবারো একদিন হাজির হয় নাঙ্গেলির বাড়িতে। 

নাঙ্গেলি ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে তার স্তনদ্বয় কর্তন করে কলাপাতায় মুড়িয়ে শুল্ক প্রতিনিধির হাতে তুলে দেন। সাধারণত কর হিসেবে কলা পাতায় মুড়িয়ে চাল দেয়া হতো। শুল্ক প্রতিনিধি প্রথমে বুঝতে পারেন নি মূল ঘটনা। রক্ত ঝরতে দেখে মোড়ানো পাতা খুলে তারা আঁতকে ওঠেন এবং দ্রুত পালিয়ে যান। দরজার পাশে অচেতন হয়ে পড়ে থাকেন নাঙ্গেলি। 

পাড়াপ্রতিবেশি ছুটে আসে। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু হয় নাঙ্গেলির। তবে নাঙ্গেলির এই দুঃসাহসিক প্রতিবাদ বিফলে যায় নি। নাঙ্গেলির মৃত্যুর ঘটনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ভারতে। ফলে রাজা ত্রিবাঙ্কুরকে সমস্ত অবৈধ কর রহিত করতে হয় অনেকটা বাধ্য হয়েই। নাঙ্গেলির মৃত্যু পরবর্তী সময়ে কেরালার চের্থলায় অবস্থিত তার মৃত্যুবরণের স্থানটি  মুলাচিপারাম্বু (অর্থাৎ স্তনধারী মহিলার জমি ) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। 

 স্ত্রীর চিতায় সহমরণ 

নাঙ্গেলি দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান। স্তন কর্তনের ফলে রক্তক্ষরণ, নাঙ্গেলির শরীরের বিকৃত দশা এবং প্র‍িয়তমার মৃত্যু কিছুতেই সইতে পারেননি স্বামী চিরুকানন্দন। তখন চলছিল নাঙ্গেলির শেষকৃত্য। নাঙ্গেলির শরীর জ্বলছে দাউদাউ করে, তখনো হয়নি পুরোপুরি ছাই। 

অকস্মাৎ জ্বলন্ত চিতায় ঝাপিয়ে পড়েন চিরুকানন্দন। ভার‍তবর্ষে স্বামীর চিতায় স্ত্রীর সহমরণের কথা কে না জানে কিন্তু প্রথমবারের মতন স্ত্রীর চিতায় সহমরণে গেলেন কোনো স্বামী। এবং এটিই পুরুষের সহমরণের শেষ দৃষ্টান্তও বটে। চিরুকানন্দন এভাবেই তৈরি করলেন ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। 

কাপড় দাঙ্গার বীজ বপন

স্তনকরের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন নাঙ্গেলি। ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে, শ্রেণিপ্রথার নামে চালিয়ে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নাঙ্গেলি নেমেছিলেন একলাই। কিন্তু এ লড়াইয়ে সামিল হলো অনেকে। নাঙ্গেলি শুধু যে স্তনকর রহিতে ভূমিকা রেখেছিলেন তা নয়, তৈরি করে গেছেন ‘মারু মারাককাম সমরম’ বা কাপড় দাঙ্গার পটভূমি। 

স্তন কর রহিত হলো বটে কিন্তু দক্ষিণ ভারতের নারীদের শরীর আবৃত অনাবৃত রাখবার ব্যাপার নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। পুরোহিতরা বিধান দিলেন, নিম্নবর্ণের নারীদের শরীরের ওপরের অংশ আবৃত করা ধর্ম বিরোধী। 

১৮১৩ থেকে নিম্নবর্ণের নারীদের বক্ষে আবরণ দেয়ার যে লড়াইয়ের সূচনা তার চরম রূপ হচ্ছে ১৮৫৯ সালে সংঘটিত কাপড় দাঙ্গা। নারীদের উর্ধ্বাঙ্গকে নিজ ইচ্ছানুযায়ী আবৃত করবার দাবিই ছিল এ দাঙ্গার মূল লক্ষ্য। যদিও তাদের এই দাবি আদায় করতে সময় লেগে গিয়েছিল ১৯১৩-১৪ সাল পর্যন্ত, তবু আগুনের ফুলকি হিসেবে কাজ করেছিল নাঙ্গেলি।

নাঙ্গেলি যেন রবি ঠাকুরের "নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী," যে সাধারণ কিন্তু অসামান্য, যে আত্মধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়তে জানে, মরতে জানে কিন্তু হারতে জানে না।

banushka0322@gmail.com

শেয়ার করুন