
প্রকাশিত হয়েছে :
সংশোধিত :

২০২৫ সাল এখনও শেষ হয়নি, অথচ ইতোমধ্যেই এটি প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে উঠেছে। রাজা-ফেরাউনের হারানো সমাধি, প্রাচীন গোপন ধর্মাচার, সাগরতলে অক্ষত জাহাজ, ব্রিটেনের নিচে রোমান নগর, বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে থাকা এই আবিষ্কারগুলো আমাদের অতীতকে নতুন করে বুঝতে সাহায্য করছে। এ যেন হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের গায়ে ধুলোমাখা পর্দা সরিয়ে বাস্তবকে ছুঁয়ে দেখা।
ফারাও তুতমোস দ্বিতীয়ের হারানো সমাধির খোঁজ
মিসরের দক্ষিণে বিখ্যাত ভ্যালি অফ দ্য কিংস-এ প্রত্নতত্ত্ববিদরা এক নতুন সমাধি আবিষ্কার করেছেন, যা সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ১৪৯৩ থেকে ১৪৭৯ সাল পর্যন্ত শাসন করা তুতমোস দ্বিতীয়-এর। তার সমাধির অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই অজানা ছিল, ফলে এটি আবিষ্কারকে এক বিরাট ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সমাধির ভেতরে পাওয়া গেছে কাঠের ফার্নিচার, চিত্রশিল্প এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সামগ্রী যা এই ফেরাউনের পরিচয় নিশ্চিত করতে সাহায্য করেছে। মোহামেদ ইসমাইল খালেদ, মিসরের পুরাতত্ত্ব পরিষদের মহাসচিব, একে সাম্প্রতিক সময়ের 'সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় আবিষ্কার' বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।
পম্পেইয়ে ডায়োনিসাস দেবতার উল্লাসমুখর দৃশ্য
প্রাচীন রোমান শহর পম্পেই ধ্বংস হওয়ার ঠিক ১০০ বছর আগে, একটি ভোজসভা কক্ষের দেয়ালে আঁকা হয়েছিল বিশাল এক চিত্রমালা। তিনটি দেয়াল জুড়ে দেখা যায়, ডায়োনিসাস, মদের দেবতা, তার অনুসারীদের নিয়ে আনন্দে মেতে আছেন। বাঁশি বাজানো, মদ ঢালা, নৃত্য ও গান—সবই ফুটে উঠেছে সেসব দৃশ্যে।
এই চিত্রমালা কেবল শিল্প নয়, বরং এক রহস্যময় ধর্মাচারের দলিল। ডায়োনিসীয় মিস্ট্রি নামে পরিচিত এই উপাসনাচর্চা ছিল গোপন, যেখানে আনন্দ, উন্মাদনা ও মাদকগ্রহণ ছিল ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার উপায়। এই ফ্রেস্কো আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া আচার-অনুষ্ঠানের অন্তরঙ্গ দিক জানার বিরল সুযোগ দিয়েছে।
সাটন হু-এর ব্রোমসওয়েল বালতির রহস্য উদঘাটন
ইংল্যান্ডের সাটন হু নামক প্রত্নস্থানে খননকার্যে পাওয়া যায় একটি ৬ষ্ঠ শতকের বাইজান্টাইন বালতি, যা প্রথমে মনে হয়েছিল সাধারণ একটি পানির পাত্র। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যায়, এটি আসলে ব্যবহৃত হয়েছিল চিতাভস্ম সংরক্ষণের পাত্র হিসেবে।
এর মধ্যে পাওয়া গেছে ঘোড়ার হাড়, ছাই ও একটি চিতার নিদর্শন, যা প্রমাণ করে এটি কোনও সম্মানিত ব্যক্তির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অংশ ছিল। এটি শুধু ইংল্যান্ডের অভিজাত শ্রেণির অন্ত্যেষ্টি সংস্কৃতিই নয়, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ দ্বীপের সাংস্কৃতিক লেনদেন সম্পর্কেও নতুন তথ্য দেয়।
লন্ডনের নিচে লুকিয়ে থাকা রোমান নগরভবন
আজকের আধুনিক লন্ডন শহরের এক আকাশছোঁয়া দালানের নিচে পাওয়া গেছে একটি বিশাল রোমান ব্যাসিলিকার ধ্বংসাবশেষ। প্রায় ২০০০ বছর পুরোনো এই ভবনটি ছিল লন্ডিনিয়াম নামের রোমান ব্রিটেনের রাজধানীর প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে মানুষ একত্র হয়ে আইনি বিচার, ব্যবসায়িক চুক্তি ও জনসমাবেশে অংশ নিত।
এটি যুক্তরাজ্যে পাওয়া রোমান স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ এবং সবচেয়ে সুরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া ভবনগুলোর একটি। এখন পরিকল্পনা চলছে ভবনের বেসমেন্টে এই প্রত্নস্থানের অংশকে সার্বজনীন প্রদর্শনীর জন্য সংরক্ষণ করার।
ইথাকায় ওডিসিউসের স্মৃতিবাহী উপাসনাস্থল
গ্রিসের দ্বীপ ইথাকা—যা কিংবদন্তির ওডিসিউস-এর বাড়ি হিসেবে পরিচিত সেখানেই মিলেছে এমন এক প্রত্নস্থল, যেটি ছিল তার নামাঙ্কিত উপাসনাস্থল।
এখানে পাওয়া গেছে টেরাকোটার ফলক, যাতে 'ওডিসিউস' নাম খোদাই করা, নানা ছোট উপহার ও পূজার সামগ্রী। এই জায়গাটিকে বহুদিন ধরে 'স্কুল অফ হোমার' নামে ডাকা হতো। এখানে মাইসেনীয় যুগ থেকে শুরু করে হেলেনিস্টিক যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে এই উপাসনা কয়েক শতাব্দী ধরে চলে এসেছে। ওডিসিউস বাস্তবে ছিলেন কিনা তা বিতর্কের বিষয়, কিন্তু এই আবিষ্কার প্রমাণ করে, গল্প এবং বিশ্বাসের শক্তি বাস্তব সমাজ ও সংস্কৃতি গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
লন্ডনে রোমান ফ্রেস্কোর রঙিন পুনর্জন্ম
লন্ডিনিয়ামের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত রোমান বাড়ি থেকে পাওয়া চার শতাধিক ভাঙা দেয়ালচিত্র জোড়া লাগিয়ে গবেষকরা গড়ে তুলেছেন এক চমৎকার মুরাল বা দেয়ালচিত্র।
এতে দেখা যায় পাখি, সংগীতের যন্ত্র (লায়ার), আইভি পাতার নকশা ও একটি গ্রিক গ্রাফিতি লেখা।
চিত্রগুলো খ্রিস্টীয় প্রথম বা দ্বিতীয় শতাব্দীর, এবং এত বছর পরও এর রঙ ও সৌন্দর্য প্রায় অক্ষত রয়ে গেছে। এই শিল্পকর্মগুলো শুধু রোমান নান্দনিকতাই নয়, বরং ভূমধ্যসাগরীয় শিল্পশৈলী রোমান ব্রিটেনেও কতটা ছড়িয়ে পড়েছিল, তা দেখায়।
স্কটল্যান্ডে আবিষ্কৃত স্টোনহেঞ্জেরও পুরোনো কাঠের প্রাসাদ
স্কটল্যান্ডের একটি স্কুল মাঠের নিচে পাওয়া গেছে ৬,০০০ বছর আগের একটি বিশাল কাঠের হল বা প্রাসাদ, যা স্টোনহেঞ্জের চেয়েও অন্তত হাজার বছর পুরোনো। এটি স্কটল্যান্ডে পাওয়া সবচেয়ে বড় কাঠের স্থাপনা, এবং এর পাশে ছিল আরেকটি সহায়ক ভবন।
খননে পাওয়া গেছে আচারানুষ্ঠানের গর্ত এবং ব্রোঞ্জ যুগের অস্ত্রভাণ্ডার, যার মধ্যে রয়েছে সোনায় অলংকৃত একটি সেল্টিক বর্শা। এই নিদর্শনগুলো দেখায়, সেই সময়েই বিস্তৃত সামাজিক কাঠামো, ধর্মীয় আচারের প্রচলন এবং দূরবর্তী অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ বিদ্যমান ছিল।
সাগরতলে অক্ষত এক রোমান জাহাজ ও তার সম্পদ
তুরস্কের আন্তালিয়া উপকূলে, ভূমধ্যসাগরের ১৪৮ ফুট গভীরে, ডুবুরিরা খুঁজে পান এক আশ্চর্যজনকভাবে অক্ষত থাকা রোমান আমলের জাহাজ। এই জাহাজে শত শত সিল করা অ্যাম্ফোরা ছিল, যাতে সম্ভবত রাখা হয়েছিল মদ, অলিভ অয়েল ও টেবিলের তৈজসপত্র।
এই পাত্রগুলো প্রায় ২,০০০ বছর ধরে পানির নিচে সংরক্ষিত থেকেছে। এটি এক বিস্ময়কর ঘটনা।
'সেরামিক রেক' নামে পরিচিত এই আবিষ্কার আমাদের প্রাচীন রোমান সামুদ্রিক বাণিজ্য, জাহাজ নির্মাণ ও পণ্য পরিবহন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে।
এই আবিষ্কারগুলো শুধু ইতিহাস জানার উপায় নয়, বরং অতীতের সঙ্গে আমাদের জীবন্ত সংযোগ তৈরি করে। সেগুলো আমাদের শেখায় যে কোনও সংস্কৃতি, ধর্ম বা সমাজ একদিনে গড়ে ওঠে না; বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের জীবন, বিশ্বাস ও কল্পনার হাত ধরে এগিয়ে চলে। ২০২৫ সালের এই প্রত্নতাত্ত্বিক চিত্রপট আমাদের অতীতকে আরও কাছ থেকে দেখতে সাহায্য করেছে যা আরও মানবিক, আরও বর্ণময় করে।
mahmudnewaz939@gmail.com

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.