
প্রকাশিত হয়েছে :
সংশোধিত :

পৃথিবীর তিন ভাগ জল এক ভাগ স্থল। স্থলভাগের চেয়ে জলের গভীরেই আছে অধিক রহস্য। বিজ্ঞানের কৃপায় মানুষ আজ পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাকাশে বিচরণ করলেও সমুদ্রের অতলের জগত সম্পর্কে মানুষের ধারণা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। এই সম্পূর্ণ অচেনা দুনিয়াকে চিনতে কৌতূহলীদের কাছে স্কুবা ডাইভিং ব্যাপক জনপ্রিয়।
SCUBA এর পূর্ণ রূপ হলো - Self-Contained Underwater Breathing Apparatus। এটি একপ্রকার যান্ত্রিক ব্যবস্থা যার মাধ্যমে মানুষ হতে পারে পানিতে বসবাসকারী মাছের মতো। এতে থাকে পানির নিচে মাছের মতো ভেসে থাকার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কারিগরি সুবিধা এবং তাপমাত্রা অনুকূল পোশাক। স্কুবা ছাড়াও আরো অনেকভাবেই পানিতে ডাইভিং করা যায়, তবে সহজলভ্য এবং ব্যবহারিক সুবিধার কারণে স্কুবা ডাইভিং সবচেয়ে জনপ্রিয়।
স্কুবা ডাইভিং সরঞ্জামগুলো ওপেন সার্কিট বা ক্লোজ সার্কিটও হতে পারে। ওপেন সার্কিট সরঞ্জামগুলো শ্বাস নেওয়ার পরে প্রশ্বাসের গ্যাস পানিতে ছড়িয়ে দেয়, অপরদিকে ক্লোজ সার্কিট যন্ত্রগুলো প্রশ্বাসের বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড অপসারন করে অক্সিজেন যোগ করে পুনরায় শ্বাসপ্রশ্বাসের কাজে ব্যবহার হয়।
দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া-ওশেনিয়া অঞ্চল স্কুবা ডাইভিং এর জন্য সবচেয়ে আদর্শ এবং জনপ্রিয়। এর মাঝে সবচেয়ে সমৃদ্ধ অস্ট্রেলিয়া। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের মতো পৃথিবী বিখ্যাত প্রবাল প্রাচীর এখানেই অবস্থিত।
অদূরে দক্ষিণ মেরু থেকে আগত শীতল জল আর প্রশান্ত মহাসগরের উষ্ণ জলরাশির মিলন অস্ট্রেলিয়ার উপকূল জুড়ে তৈরি করেছে পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান। বৈচিত্র্যময় প্রাণী দেখার নেশায় প্রতি বছর হাজার হাজার ডুবুরি পর্যটক তাই ছুটে আসেন এই উপকূলে, যা অস্ট্রেলিয়াকে অবধারিতভাবেই পরিণত করেছে স্কুবা ডাইভারদের মক্কায়।
অস্ট্রেলিয়ার পর্যটনশিল্পের অনেক বড় একটা যোগান আসে স্কুবা ডাইভিংয়ের মাধ্যমে, যা দিন দিন আরো বেশি পরিমাণে বিকশিত হচ্ছে। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের মতো প্রবাল বাংলাদেশেও আছে, আছে প্রকৃতির অনন্য উপহার সেইন্ট মার্টিন নামক পুরো একটি প্রবাল দ্বীপ।
বাংলাদেশে স্কুবা ডাইভিং
প্রতিবছর নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে স্কুবা ডাইভিং করা যায়। ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি এই তিনমাস সেন্টমার্টিন স্কুবা ডাইভিংয়ের জন্য উপযুক্ত। বাংলাদেশে যে ধরনের স্কুবা হয়ে আসছে তা মূলত ডিসকভারি পর্যায়ের।
স্কুবা ডাইভিংয়ে জন্য সাধারণত ৫ ধাপে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরমধ্যে প্রথম ধাপ হচ্ছে ডিসকভারি পর্যায়, সেন্টমার্টিনে যা হয়। এই ধাপের জন্য কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। এমনকি সাঁতার না জানলেও কোনো সমস্যা নেই।
রোমাঞ্চকর এই অভিযান পরিচালনা করে থাকে কয়েকটি বেসরকারি এজেন্সি। এদের মধ্যে আছে- কোরাল ভিউ রিসোর্ট, ঢাকা ডাইভার্স ক্লাব ও ওশেনিক স্কুভা ডাইভিং সার্ভিস। প্রশিক্ষণসহ খরচ পড়ে ৩৫০০-৪০০০ টাকার মতো।
২০০০ সালের দিকে প্রথমবারের মতো সেন্টমার্টিন দ্বীপে শুরু হয় স্কুবা ডাইভিং। বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ওরিয়েন্টেশন করিয়ে, স্কুবা ডাইভিং সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠান, ‘সিসিমপুর’ অনুষ্ঠানে দেখানো সহ নানান উপায়ে এর প্রসার ও পরিচিতি বাড়ানো হয়। বাংলাদেশের সেইন্ট মার্টিন, টেকনাফ কোস্ট, রাঙ্গামটি লেক (ডুবে যাওয়া চাকমা রাজার বাড়ি), সিলেটের পিয়াইন নদী, টাঙ্গুয়ার হাওড়ে রয়েছে স্কুবা ডাইভিংয়ের সুবিধা।
স্কুবা ডাইভিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ
হাইপ্রেসার এয়ার কম্প্রেসার, স্কুবা সিলিন্ডার, ব্রিদিং রেগুলেটর প্রেসার মিটার, বয়েন্সি কন্ট্রোল ডিভাইস, মাস্ক, স্নোরকেল, ফিন্স ওয়েটবেল্ট, নাইফ, ওয়েটসুট, ডাইভ কম্পিউটর, টর্চলাইট, আন্ডার ওয়াটার ক্যামেরা ইত্যাদি।
ক্যারিয়ার হিসেবে স্কুবা ডাইভিং
সাগর গবেষণা, আন্ডার ওয়াটার মেরিন লাইফ রিসার্চ, কোরাল রিস্টোরেশন, কোরাল শৈবাল সার্ভে, নদী শাসনের মতো প্রকল্পগুলোতে স্কুবা ডাইভারদের কাজের সুযোগ রয়েছে। তাই এই পেশায় যেতে অবশ্যই সমুদ্রতলে ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি, রেসকিউ ডাইভ, মেরিন লাইফের আচরণ, বোট অপারেশনের মতো অনেক বিষয় সম্পর্কে জানাশোনা থাকতে হবে।
স্কুবা ডাইভিং শুধু অ্যাডভেঞ্চার বা রিক্রেয়শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর জন্য অনেকগুলো অ্যাডভান্স স্কুবা অপশন আছে। প্রাথমিক কোর্স শেষ হওয়ার পর ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি, ইর্মাজেন্সি ফাস্ট রেসপন্স, রেসকিউ ডাইভ, মেরিন লাইফের আচরণ, বোট অপারেশন জানা দরকার।
স্কুবা ডাইভারদের কাজের ক্ষেত্র:
স্কুবা ডাইভ গাইড, স্কুবা প্রশিক্ষক, রেসকিউ ডাইভার, আন্ডার ওয়াটার ফটো-ভিডিওগ্রাফি, ডকুমেন্টারি ফিল্মে, আন্ডার ওয়াটার মেরিন লাইফ রিসার্চ, সাগর গবেষণা, কোরাল শৈবাল সার্ভে, কোরাল রিস্টোরেশন, জাহাজের হাল ইন্সপেকশন, ডকইয়ার্ড, নদী শাসনের প্রকল্প, তৈল-গ্যাস উত্তোলন প্রকল্প।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের ১৯টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ১৪ নম্বরে আছে পানির নিচে জীববৈচিত্র্য সম্পদ গবেষণা সংরক্ষণ কার্যক্রম। ২০২৬ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লিখতে যাওয়া বাংলাদেশে তাই স্কুবা ডাইভিংয়ের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বলই বলা চলে।
গত এক দশকে স্কুবা ডাইভাররা দেশের বড় প্রকল্পেও অবদান রেখেছে: পদ্মা সেতু সমীক্ষা, নির্মাণ কাজ, যমুনা সেতু, ভৈরব সেতু, রুপসা সেতু, মেঘনা সেতু, সাবমেরিন কেবল, নদী শাসন প্রকল্প, কর্নফুলী টানেল, চট্টগ্রাম বন্দরসহ সকল বন্দরে ডুবে যাওয়া জাহাজ সালবেস করে বন্দরকে সচল রাখা, সারাদেশে ডুবে যাওয়া মানুষের জীবিত অথবা মৃতদেহ উদ্ধার করে সমাজ সেবামূলক কাজ করে আসছে। বাংলাদেশে দ্রুত উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে স্কুবা ডাইভারদের চাহিদাও বাড়বে।
স্কুবা ডাইভিং করতে পারবেন না যারা
১.শরীরে যদি বড় কোনো অপারেশন করা হয়েছে
২.হৃদযন্ত্রের সমস্যা থাকলে
৩.কখনো স্ট্রোক করলে
৪.ফুসফুস বা কিডনীর সমস্যা থাকলে
৫.সর্দি-কাশি হলে
৬. হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট এবং উচ্চরক্তচাপ থাকলে
বঙ্গোপসাগরে যেভাবে কাজ করবে স্কুবা ডাইভাররা
সমুদ্রের বাস্তুসংস্থানের মূলে রয়েছে প্রবাল। প্রবাল মারা গেলে ওই এলাকার সব মাছই মারা যাবে। পানির নিচের পরিবেশ খুব সহজেই বুঝতে পারে ডাইভাররা। প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম প্রবাল সমুদ্র তলদেশে প্রাকৃতিক দেয়ালের মতো তৈরি করে। যা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো থেকে রক্ষা করতে পারবে। এই প্রবাল রক্ষায় ডাইভাররা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন।
সাধারণত সমুদ্রের তলদেশে ১৭০ থেকে ৩৫০ ফুট পর্যন্ত নিচে নামতে পারেন টেকনিক্যাল ডাইভাররা। হিলিয়াম, নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাসের সমন্বয়ে তৈরি ট্রাইমিক্স গ্যাসের সাহায্যে বঙ্গপসাগরের তিন থেকে চারশত ফুট নিচে নেমেও স্পষ্টভাবে সব দেখা সম্ভব।
tanjilatasnim180@gmail.com

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.