
প্রকাশিত হয়েছে :
সংশোধিত :

ক্লাসিক ফ্যাশন মিলিয়ে যাবেনা অসংখ্য ট্রেন্ডের ভীড়ে, বেনারসি শাড়ির আবেদন তেমনি মিশে থাকবে বাঙাল ফ্যাশন আবহে সবসময়। তবে প্রশ্ন হলো 'বেনারসি' নামটি এলো কিভাবে।
শাড়ির নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে উত্তর; বেনারস থেকে বেনারসি? কাশি, বানারস বা ভারাণসী নামেও এই প্রাচীন ভারতীয় শহরটি পরিচিত। কালের প্রবাহে চাহিদা ধরে রাখা বাঙাল হালফ্যাশনের প্রিয় বেনারসির উদ্ভব এই শহর থেকে সেটাই ধরে নেয়া হয়। এছাড়া রয়েছে মুঘল প্রভাব এবং আরব মুল্লুকের বস্ত্র বাংলা অব্দি পৌঁছে যাবার গল্প-ও।
ভারতে উদ্ভাবিত তাঁত শিল্পের মধ্যে বিস্তার অর্জনকারী, ঐতিহ্যবাহী একটি বুননশৈলী বেনারসি বুনন। বেনারস শহরটিকে একটি পবিত্র শহর বিবেচনা করা হয়। পৌরাণিক গ্রন্থে বেনারসি বুননের কথা বলা আছে। ধারণা করা হয় যে শাড়িটির এই বুননকৌশল প্রায় ২০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো।
অ্যারিস্টোক্রেটিক ধাঁচের ব্রোকেডের জন্যে বিখ্যাত এই শাড়িটি ১৪ শতকের নিকটবর্তী সময়ে বেনারসের কারিগরদের থেকে তৈরি শুরু হয়। সেই সময় চলছিলো মুঘল শাসন। কারিগরেরা রেশম বা সিল্ক কাপড়ের জমিনে এনেছিলেন সোফিস্টিকেটেড ব্রোকেড। স্বর্ণের বা রুপোর জরির সুতোর কাজ এই শাড়িতে এনে দিলো বিলাসিতার ছোঁয়া।
সময় পেরিয়ে ১৮-১৯ শতকে এই শাড়ির নাম ছড়িয়ে পড়লো এর ফাইন সিল্ক আর নিপুণ হাতে গড়নের কারণে। বেনারসির ওপর করা ডেলিকেট নকশা, চকচকে মোটিফ একে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। পানপাতা, চাঁদ, শিকারের দৃশ্য এবং প্যাস্টেল রং মিলে বৈচিত্র এনেছে।
নকশার এই বৈচিত্র প্রভাবিত হয়েছিল তৎকালীন মুঘল শাসনামলের নকশা কালগা, বেল, ঝাল্লার থেকে। এছাড়া ছিলো কমপ্যাক্ট বুনন, জালি কাজ, মেটালিক গ্লস তৈরি করে শাড়িকে আরও জমকালো বানানোর চল যেগুলো এখনও এই বিখ্যাত শাড়িতে প্রয়োগ করা হয়।
বেনারসি উল্টে দেখলে ঘন সুতার কাজ দেখতে পাওয়া যায় - এটি হলো কমপ্যাক্ট বুননশৈলী। রেশম বুননের প্রসার লাভের কথা জেনে সম্রাট আকবর এই শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতায় নেমেছিলেন এবং প্রচার বৃদ্ধিতে সহায়তাও নাকি করেছিলেন।
এ শাড়ি নিয়ে প্রচলিত আছে মুসলিম তাঁতীদের ঐতিহ্যের কথাও। কখনো কখনো ধারণা করা হয় বেনারস শহরে বাসকারী তাঁতীরা ছিলেন আরব দেশের আনসারী সম্প্রদায়ের মানুষ। আরব দেশের বুনন চলে এলো ভারতবর্ষে। সেই তাঁতীদের অনেকেই নাকি ভারতবর্ষ ভাগের সময় তৎকালীন পূর্ব-বঙ্গ, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে চলে আসেন।
মিরপুর ১০ সহ মিরপুরের অন্য যেখানে এখন বেনারসি পল্লী গড়ে উঠেছে, তাঁতীরা সেসব স্থানে এবং পুরান ঢাকায় বসতি গড়ে তোলেন। ঢাকায় শাড়ির নামডাক, ব্যাবসা ছড়িয়ে পড়ে।
শাড়িটি জনপ্রিয়তা লাভের পর পুরান ঢাকা থেকে কারখানা সরিয়ে মিরপুরে আনা হয়। ধারণা করা হয় সেই তাঁতীদের হস্তনৈপুণ্যের ফসল আজকের দিনের আরেক জনপ্রিয় কাতান শাড়ি যেটি কিনা বেনারসির মতোই সিল্ক এবং রেশম থেকে তৈরি হয়।
বেনারসি কাতান নামে কাতান শাড়ির একটি ধরন বেশ পরিচিত, যার নাকি বেনারসির পিওর সিল্ক ভ্যারিয়্যান্ট হিসেবেও নামডাক রয়েছে। কাতানকে অনেক সময় বেনারসির পরিবর্তিত নামও মনে করা হয়
বাণিজ্যের জন্যে বাংলার সুপরিচিতি ছিল এবং সেই সূত্র ধরে বেনারসি শাড়ি বাঙালির আপন হয়ে ওঠার পেছনে আছে আরেকটি গল্প। বেনারস থেকে বাংলায় বাণিজ্যিক যোগাযোগ হতো। ভারতের উত্তর প্রদেশের সেই শহরে তৈরি লাল বেনারসির জুড়ি মেলা ভার। ব্যাবসায়িক যোগাযোগের মাধ্যমে লাল বেনারসি বাংলায় আসতে শুরু করলো বণিক ও বিক্রেতাদের হাত ধরে।
দ্রুতই শাড়ির সোনালি রুপালি সুতোর কারুকাজ, নকশা এবং আভিজাত্যিক ছোঁয়ার কারণে বাংলায় জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লো। সেই থেকে শত শত বছর ধরে যেকোনো অনুষ্ঠানে বাঙালি নারী নিজেকে সেলাইবিহীন নান্দনিক এই বস্ত্রে জড়িয়েছে।
বেনারসি তৈরি একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, কাপড়ের মান তৈরির সময়ের ওপর নির্ভরশীল। ৫০০০০ থেকে লাখ টাকা দামের বেনারসিও তাই বাজারে পাওয়া যায়। আর স্বল্পসময় ও শ্রম ব্যায়ে তৈরি শাড়িগুলো বিক্রি হয় কয়েক হাজার টাকা মুল্যে।
এছাড়া বেনারসির আদলে থ্রিফট ভ্যারিয়ান্ট বেরিয়েছে যেটি সিনথেটিক কাতান যার মুল্য একেবারেই কম তবে দেখতে বেনারসির মতো। মুর্শিদাবাদের বালুচরির সাথে পাল্লা দিয়েছে বেনারসি, ওজনে ভারী এবং মোটা এই বস্ত্র বালুচরির চাইতে বেশি জনপ্রিয় বাংলায়। কাপড়ের জমিনের জন্যে কারিগরেরা বেছে নেন জরজেট, ক্লাসিক সিল্ক, সুতি, টিস্যু বা অরগাঞ্জা ।
ইন্ডিয়ান ব্রাইডাল হেরিটেজের সাথে শক্তভাবে জড়িয়ে আছে বেনারসি। ব্রাইডাল ট্রুসাউ যেটিতে বিয়েতে কণের জন্যে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উপস্থাপন করা হয় তাতে বেনারসি থাকাটা একটি রীতি।
বেনারস শহরের এই শাড়িটিকে বৈবাহিক সম্পর্কের পবিত্রতার অংশ মনে করা হয়। এখনও ভারতে পবিত্র শহর থেকে আসা এই শাড়ি পরে বিয়ে করা পূণ্যকর্ম বলেই ভাবা হয়।
বেনারসি বুনন এবং কাপড় শুধু শাড়িতে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যান্য পোশাক - ট্রেন্ডি কুর্তা, লেহেঙ্গা, সালোয়ার কামিজ তৈরিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। উৎসবে, পার্বনে বাঙালি নারীর প্রিয় পরিচ্ছদ হিসেবে বেনারসির জায়গা অন্য কিছুর দখল করে নেয়া অসম্ভবই বলা যায়।
sofiarafanbackup@gmail.com

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.