Bangla
3 years ago

ব্যাঙের বিয়ের আদ্যপান্ত!

বৃষ্টির জন্য অনেক অঞ্চলেই দেওয়া হয় ব্যাঙের বিয়ে, ছবি: বিবাহবিডি
বৃষ্টির জন্য অনেক অঞ্চলেই দেওয়া হয় ব্যাঙের বিয়ে, ছবি: বিবাহবিডি

প্রকাশিত হয়েছে :

সংশোধিত :

বিয়ের রীতিটি মূলত আমরা মানুষদের জন্যই হতে দেখি। এটি সামাজিক অনুষ্ঠান। বর-কনেকে সাজানো হবে। অতিথিরা আসবেন। উপহার দেবেন, খাবেন মজাদার খাবার।

কিন্তু যদি এমন হয়- বিয়েটা হচ্ছে দুটো ব্যাঙের! শুনে অনেকেই অবাক হতে পারেন, কিন্তু এটা মোটেও কোনো গল্প বা কার্টুনের কাহিনী নয়৷ বাস্তবে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ঘটনাটি ঘটছে কয়েকশ বছর ধরে!

মূলত প্রত্যন্ত গ্রামেই এ ধরণের বিয়ে দেখতে পাওয়া যায়। ঠিক কবে থেকে শুরু বা প্রথম কোথায় এ ধরণের বিয়ে হয়েছিলো- তা স্পষ্টভাবে জানা না গেলেও এই বিয়ের আয়োজন অন্তত কয়েকশ বছর আগে থেকে হয়ে আসছে।

তীব্র দাবদাহে মানুষের জীবন যখন একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, তখন বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করে মানুষ। ইসলাম ধর্মে যেমন আছে বৃষ্টি বর্ষণের জন্য নামাজ পড়ার ব্যবস্থা।

তবে দেশের অনেক অঞ্চলে আদি লোকাচারের অংশ হিসেবে সনাতন বা ইসলাম উভয় ধর্মীয় পরিচয়ের অনেক মানুষকেই দেখা যায় ব্যাঙের বিয়ে নামের এই আচারে অংশ নিতে। যারা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ, তাদের কাছে এই ব্যাঙের বিয়ে কুসংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়। তবে এটি চালু হবার পেছনে অণুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিলো অনার্যদের বিশ্বাস।

বাঙালি নৃতাত্ত্বিকভাবে আর্য জাতি নয়৷ এ দেশের ভূমিপুত্র বা আদি অধিবাসীদের ভেতর ছিলো পৌত্তলিক নানা আচার। এমন একটা বিশ্বাস ছিলো যে, ব্যাঙ ডাকলে বৃষ্টি হয়। সনাতন বিশ্বাস অনুসারে, জলের দেবতা বরুণ প্রসন্ন হলে নামবে বৃষ্টি। দেবরাজ ইন্দ্রেরই আরেক নাম বরুণ। আর ব্যাঙের বিয়ে দিলে দেবতা তুষ্ট হয়ে বৃষ্টিবর্ষণের ব্যবস্থা করবেন বলে লোকজ বিশ্বাস ছিলো।

সেখান থেকেই উদ্ভব ব্যাঙের বিয়ে নামের এই অদ্ভুত প্রথার। এই বিয়েতে দুটি গর্ত করে একটি নারী ও একটি পুরুষ ব্যাঙকে গর্তগুলোতে রাখা হয়। সাধারণত সোনা ব্যাঙের সঙ্গে  সোনা ব্যাঙের বিয়ে দেওয়া হয়। তবে পুরুষটি সোনা ব্যাঙ হলে নারীটি কোলাব্যাঙ হলেও হয়।

আমপাতা ও জামপাতার পানি দিয়ে গোসল করিয়ে ব্যাঙদুটোর গা ঢেকে দেয়া হয় বিয়ের পোশাকে। তারপর দুটি ব্যাঙের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়৷ দুইপক্ষে ব্যাঙের অভিভাবক হিসেবে দুজন নারীকে থাকতে হয়৷ সাধারণত গ্রামগুলোতে যেকোনো ধর্ম থেকেই নারীদের অভিভাবক হবার চল রয়েছে। তবে পুরুষ ব্যাঙের অভিভাবককে সাধারণত বয়সে বড় হতে হয়।

দুই পক্ষেই অভিভাবক হিসেবে নারীদের উপস্থিতি থেকে ধারণা করা যায়, রীতিটির শুরু হয়েছিলো মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অধীনে থাকা কোনো জাতি থেকে।

বিয়েতে বেশ উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে। গোটা গ্রামের মানুষ একসাথে সমবেত হয়ে উৎসব করেন। মেয়েলি গীতের আয়োজনও থাকে।

নারীরা একসঙ্গে গলা মিলিয়ে গান- " ব্যাঙ্গা-ব্যাঙ্গির বিয়া কুলা মাথায় দিয়া ও ব্যাঙ্গ পানি আন গিয়া/ খালও নাই পানি, বিলও নাই পানি/ আসমান ভাইঙ্গা পড়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি / আম পাতা দিয়া দিলাম ছানি, জাম পাতা দিয়া দিলাম ছানি/ তেও (তাও)  পড়ে মেঘের (বৃষ্টি) পানি....."

বিয়ে উপলক্ষে গোটা গ্রামের মানুষকে খাওয়ানো হয় মজার খাবার। কোথাও খিচুড়ি-লাবড়া, কোথাও ভাত-ডাল-মাংস। অনেক জায়গায় মেয়েলি গীতের পাশাপাশি সাউন্ড সিস্টেম এনেও চলে নাচ-গান। আবার, ব্যাঙের বিয়েতে  অনেকসময় গাওয়া হয় বহুল প্রচলিত "আল্লা ম্যাগ (মেঘ)  দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই, আল্লা ম্যাগ দে।"

বিয়ের অনুষ্ঠানে সাধারণত স্ত্রী ব্যাঙকে ছোট করে ঘোমটা মতো পরানো হয়। মাথার ওপর কোনো ফুল রাখা হয়৷ পুরুষ ব্যাঙের গায়ে ছোট কাপড়ের মতো কিছু দেয়া হয়। কখনো কখনো দুটো ব্যাঙকেই পরানো হয় ছোট ফুলের মালা।  অনুষ্ঠান শেষে ব্যাঙ দুটোকে ছেড়ে দেয়া হয় পুকুরে।

দেবরাজ ইন্দ্র তথা বরুণের  কাছে প্রার্থনার ব্যাপারটি মাথায় রেখে যে সবক্ষেত্রে এটি করা হয় তা নয়। অনেক জায়গায় এটি লোকজ সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। ব্যাঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টি হবে, বৃষ্টি ভালো হলে ফসল ভালো হবে- এ ধরণের সরল বিশ্বাসেও বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠিত হয় ব্যাঙের বিয়ে, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষদেরও অংশগ্রহণ থাকে।

 

মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।

mahmudnewaz939@gmail.com

শেয়ার করুন