Bangla
9 months ago

ঢাকাইয়া কুট্টি ও সোব্বাসী ভাষা: এক শহরের দুই প্রাণ

ফরাশগঞ্জ, পুরান ঢাকা
ফরাশগঞ্জ, পুরান ঢাকা

প্রকাশিত হয়েছে :

সংশোধিত :

'লাল বাজারে গলির মোড়ে পান দোকানের খরিদ্দার/ বাকের আলীর আদুরে মেয়ে, নাম ছিল তার গুলবাহার/ নাম ছিল তার গুলবাহার, দেখতে ভারী চমৎকার/ তুলনা যে হয় না তার, হোসনে আরা গুলবাহার' - সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এই গানটা শুনলে আজও পুরান ঢাকার হালকা মিষ্টি ঢঙে প্রেমের গন্ধ ভেসে আসে। এই গানের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে ঢাকার এক বিশেষ জনগোষ্ঠীর আবেগ, ভাষা আর জীবনযাপন—যাদের বলা হয় ঢাকাইয়া কুট্টি। কিন্তু এই ঢাকায় আরও এক সম্প্রদায় আছে, যাদের বলা হয় সোব্বাসী।  এই দুই গোষ্ঠী নিয়ে শহরটা যেন দুই রঙের ক্যানভাস—একটা পুরান ঢাকার রঙ, আরেকটা নবাবী ঢাকার রঙ। 

পুরান ঢাকার প্রাণ: ঢাকাইয়া কুট্টি

"ঢাকাইয়া কুট্টি" বলতে আমরা বুঝি সেই সব মানুষদের, যাঁদের শিকড় বহু পুরুষ ধরে পুরান ঢাকায়। তবে অনেকেই তাদের 'আদি ঢাকাইয়া' হিসেবে জানলেও তাদের ঢাকায় আগমন ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষের পর। 

কুট্টিদের নিয়ে মোশাররফ হোসেন ভূঞা তার ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষার অভিধান বইয়ে লিখেছেন, ১৮ শতকের মধ্যভাগ থেকে পূর্ববঙ্গে চাল একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য ছিল। চাল রপ্তানিকারকেরা ছিলেন মাড়োয়ারি ও মধ্য ভারতের মানুষ। তারা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান সংগ্রহ করে সেগুলো ঢেঁকিতে ভানতেন এবং কুটতেন।

এসব ধান কুটতে ঢাকার আশপাশের এলাকা থেকে শ্রমিকেরা আসত। শ্রমিক-ব্যবসায়ী ও দিল্লির সৈন্যদের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে একটি ভাষার উদ্ভব ঘটে। সেটিই কালের পরিক্রমায় 'কুট্টি' হিসেবে পরিচিতি পায়।

আবার হেকিম হাবিবুর রহমানের মতে, '১৭৭০ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফরিদপুর থেকে দরিদ্র লোকেরা ঢাকায় এসে ভিড় জমায় এবং বসতি স্থাপন করে।

ঢাকা শহরের আমীর-কবীরগণ খাজনার পরিবর্তে প্রজাদের নিকট হতে যে ধান আদায় করতেন, এসব লোকেরা তা ঢেঁকিতে ভানত এবং এ আয় দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত। ধান থেকে চাল-তুষ বার করাকে ধান কোটা বলা হয়। এজন্যই এ শ্রেণীর লোকদের 'কুট্টি' বলে অভিহিত করা হতো।

এই শ্রেণির মানুষেরা ঢাকার আদি উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর ভাষার সঙ্গে খাপ খাইয়ে ঢাকাইয়া ভাষার এক নতুন সংস্করণ তৈরি করেন। এই ভাষাটিই পরবর্তীতে 'ঢাকাইয়া ভাষা' নামে পরিচিত হয়েছে৷ এখন সাহিত্যে/ সিনেমায় যে পুরান ঢাকার ভাষা হিসেবে আমরা যা দেখি, তা হলো এই কুট্টি ভাষা।

নবাবী ঢাকার উত্তরসূরি: সোব্বাসী 

সোব্বাসী হলো একটি ঢাকাইয়া গোষ্ঠী, যারা সোব্বাস ভাষায় কথা বলে। এ ভাষা মূলত ১৪টি ভাষার মিশ্রিত রূপ। সোব্বাসীরা সুবেদার ইসলাম খাঁ’র আমল থেকে ঢাকায় এসে স্থানীয়দের সঙ্গে বসতি গড়ে তুলেছে। এরাই হলো আদি ঢাকাইয়া। অনেকেই ঢাকাইয়া কুট্টিদের ‘আদি ঢাকাইয়া’ হিসেবে জানেন।

কুট্টি এবং সোব্বাসী দুটোই যে পুরো পৃথক গোষ্ঠী, তা আনিস আহমেদ তার ‘ঢাকাইয়া আসলি’ গ্রন্থেও উল্লেখ করেছেন। ঢাকাইয়া সংস্কৃতি বলতে আমরা যেসব আচার-অনুষ্ঠান জানি, এসব প্রকৃতপক্ষে সোব্বাসীদের সংস্কৃতি। 

কারও কারও মতে, সোব্বাসী শব্দটি এসেছে "সুবাহ"  শব্দ থেকে, যা দ্বারা মুঘল আমলে প্রশাসনিক অঞ্চলকে বোঝানো হতো । যারা সেই সুবাহ অঞ্চলের অধিবাসী, তারাই সোব্বাসী। এই সম্প্রদায়টি ঢাকায় এসে নিজেদের একটা ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তোলে। 

কিন্তু এ নিয়ে আবার রয়েছে ভিন্নমতও। আনিস আহমেদ ঢাকাইয়া আসলি গ্রন্থে বলে গেছেন, 'বহিরাগত পশ্চিম ভারতীয় ও পশ্চিমা অভারতীয়রা (ইরান-আফগান) নিজেদের সোব্বাস বা অভিজাত শ্রেণী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।' সোব্বাস ঢাকাইয়ারা 'সুখ'কে বলে 'সোখ'। সুখে বাস করে বলে তাদের সুখবাস বলা হয়। সুখবাস থেকে সোখবাস, আর তা থেকে সোব্বাস। অর্থাৎ, সুখবাস> সোখবাস> সোববাস> সোব্বাস> সোব্বাসী

সোব্বাসীদের মধ্যে একটা অভিজাত রুচি কাজ করত। তারা তুলনামূলক শিক্ষিত, শালীন কথাবার্তায় অভ্যস্ত, পোশাকে বেশ মার্জিত। নারীরা পরতেন ধোপদুরস্ত শাড়ি, হাতে থাকত হালকা গয়না। তাদের ঘরে দেখা যেত ফারসি বই, আরবি কিতাব আর সুরেলা কণ্ঠে গজল। 

এখন কোথায় তারা?

ঢাকা শহরের বিস্তার আর আধুনিকায়নের চাপে আজ অনেক ঢাকাইয়া কুট্টি ও সুব্বাসি পরিবার শহরের প্রান্তে চলে গেছে। কেউ কেউ দেশান্তরী। কুট্টি ভাষাও হারিয়ে যেতে বসেছে। আবার সুব্বাসিদের নবাবী ঢঙ এখন স্মৃতিময় গল্প হয়ে যাচ্ছে।

তবে যখনই 'গান বেজে ওঠে, কিংবা পুরান ঢাকার কোনো চায়ের দোকানে কেউ বলে, “বাইজান, এক কাপ মিঠা চা দেন”—তখনই বোঝা যায়, এই শহরে এখনো ঢাকাইয়া কুট্টি আর সুব্বাসিদের গল্প মিশে আছে বাতাসে, চালে-ডালে, ভালোবাসার হালকা ছোঁয়ায়।

mahmudnewaz939@gmail.com

শেয়ার করুন