Bangla
2 years ago

মিরপুরের বিখ্যাত ঝুটপট্টি আগের মতো নেই- কেন?

আগের মতো আবারো রমরমা অবস্থায় ফিরবে ঝুটপট্টি
আগের মতো আবারো রমরমা অবস্থায় ফিরবে ঝুটপট্টি Photo : নীলাঞ্জনা চম্পা

প্রকাশিত হয়েছে :

সংশোধিত :

মিরপুর ১০ নম্বরে পপুলার হাসপাতালের মোড় ঘুরলেই চোখে পরে সারি সারি দোকান। নানা রঙে রঙিন রিবন, ফিতা, চুমকি ঝুলছে বেশ কিছু দোকানে। আবার কোনো কোনো দোকানের ভেতরের দিকে চোখ রাখলে দেখা যায় রং-বেরঙের সুতার পাহাড়। এ যেন রং-তুলি-সুতার মেলা! দোকানগুলোর সামনে প্রায়শই চোখে পড়ে দাঁড়িয়ে থাকা নীল-হলুদ পিক-আপ ট্রাক। বস্তা ভরা পণ্য নামাতে এগিয়ে আসতে দেখা যায় বেশ কিছু কিশোরদের। আবার কিছু অল্পবয়সী ছেলে রিকশায় ২-১ বস্তা তুলে দেয়ার বিনিময়ে হাতে বখশিশ পেয়ে মেতে উঠছে খুশিতে। বৈচিত্র্যময় এই স্থানে কিছুদিন আগেও এমন প্রফুল্ল চিত্র দেখা যেত। তবে বেশ সপ্তাহখানেকের তীব্র তাপদাহ যেন ঝিমিয়ে দিয়েছে গার্মেন্টস পন্যের পাইকারী-খুচরার এই জনপ্রিয় বাজার ঝুটপট্টিকে।

ছবিঃ নীলাঞ্জনা চম্পা 

তাপদাহের কারণে ব্যবসার গতি খানিকটা কম থাকলেও ব্যবসা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়নি বলে জানিয়েছেন সেখানকার অন্যতম দোকান সোলাইমান এন্টারপ্রাইজের মালিক মোঃ সোলাইমান। বলেন, “মাল আগের মতই আসছে, তবে ক্রেতা কম। তাপদাহ হোক কিংবা প্রখর বৃষ্টি, দোকান বন্ধ রাখলেই লোকসান।” 

নিরীহ এই মানুষগুলো পেটের দায়ে এই গরমের মধ্যে শরীরে ঘাম নিয়ে চোখ বুজে আসা ক্লান্তি কিংবা শীতের জড়সড় নিদারুন ঠান্ডা আবহাওয়া, বৃষ্টির কর্দমাক্ত রাস্তা, সব কিছু উপেক্ষা করেই চালায়ে যান নিজেদের ব্যবসা। দোকানগুলো মাঝারি কিংবা ছোট আকারের হলেও নানা গার্মেন্টস পণ্যে ঠাঁসা তাকগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে মনে হয় যেন তলাহীন কলসি। 

কম দামে সুতা, কাপড়, জুতার সোল, রং, রিবন, ব্লক-বাটিকের দ্রব্য, প্লাস্টিক ফুল, লেইস, ব্যাগের সোল, প্লেট, সেলাই বিষয়ক সকল পণ্য, কুশি কাজের যাবতীয় সামগ্রী ইত্যাদি হাতে বোনার জিনিসপত্র বেশ কম দামেই পাওয়া যায় এখানে।

মোস্তফা এক্সেসরিজের মালিক মোস্তফা হাকিম জানায়, পাইকারী দামে চেইন প্রতি ৫০ পিস দরে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা, বোতাম ১০০০ পিসের প্যাকেট দরে সর্বনিম্ন ৫০০-৭০০ টাকা, ইলাস্টিক বান্ডিল সর্বনিম্ন ১০০ টাকা, সুতা কেজিতে সর্বনিম্ন ২৫০-৫০০ টাকা, কাপড় কোয়ালিটি অনুযায়ী গজ ৩০-২৫০ টাকায় বিক্রি হয়।

সবার পরিচিত এই স্থান নিয়ে অনেক ক্রেতার অভিযোগ এক পণ্য আর দ্বিতীয় দিনে দেখা মেলে না। এমনকি ওই পণ্য কবে আবার ওই বাজারে আসবে তাও বলা মুশকিল। সেখানকার স্থানীয় ব্যবসায়ী ইশতেখার জমিল জানান, “একই পণ্য পরবর্তীতে কবে পাওয়া যাবে তা বলা যায় না। গার্মেন্টস থেকে যখন যে পণ্য পাওয়া যায়, সেসবই দোকানে তুলি। বাছ বাছাইয়ের সুযোগ নেই।” একারণেই এখানের পণ্যের সমাহার দোকানদারদের নিজ পছন্দের চেয়ে গার্মেন্টস থেকে পাওয়া পণ্য সংগ্রহের মাঝেই সীমাবদ্ধ।  

ছবিঃ নীলাঞ্জনা চম্পা

মান ভালো হওয়ায় এসকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পণ্য কিনতে আসা হয় নির্দ্বিধায়, জানান এক ক্রেতা। বলেন, “প্রতি সপ্তাহেই এখানে কেনাকাটা করতে আসি। দরদাম ভালো। দোকানদাররাও ভালো। নির্দিষ্ট কিছু পণ্য না পেলে এখানের দোকানদারদের জানিয়ে রাখি সেই পণ্য আসলে যেন ফোন দিয়ে জানায়। সার্ভিস খুবই ভালো।” তিনি আরো জানান, চার বছরের অনলাইন ব্যবসার যাত্রায় এখান থেকেই বেশি পণ্য কিনেছেন। 

ক্রেতাদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণত ক্ষুদ্র কিংবা খুচরা ব্যবসায়ী তবে অনেক গৃহবধুরাও ঘর সাজানোর জন্য এখান থেকে পণ্য ক্রয় করেন। সুলভ মূল্যে হ্যান্ডক্রাফট সামগ্রী পাওয়া যায় বিধায় অনেক স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্রীরাও ভিড় জমায় এখানে। তবে ক্রেতাদের মধ্যে ক্ষুদ্র কিংবা খুচরা ব্যবসায়ীর সংখ্যাই বেশি। শুধু মিরপুর কিংবা ঢাকা নয়, দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসে অনেক ক্রেতা।

শরীফ এন্টারপ্রাইজের মালিক জানান তার দোকানে এক দিনে গড়ে প্রায় দুই-পাঁচ হাজার টাকা আয় হয়। তার মাসিক আয় দাঁড়ায় লক্ষাধিক টাকায়। এই দোকানের আয় দিয়েই সাভারে ছয় কাঠা জমি ও একটি বাড়িও করেছেন তিনি। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে তিনি দোকান চালিয়ে আসছেন।  দোকানটি তার দাদার বড় ভাইয়ের। উত্তরাধিকার সূত্রে তার হাতে এসে পড়েছে দোকানের ভার।

এই বাজারটিতে শ’খানেকেরও বেশি পণ্য থাকলেও বাজারের শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ। সে সময়কার মানুষগুলো হয়তো ভাবতেও পারেনি তাদের ছোটখাটো ঝুট কাপড় নিয়ে ব্যবসা থেকে ওই স্থান এত বড় ব্যবসায়িক এলাকায় পরিনত হবে।  

শুরুতে ঝুটপট্টি এলাকা ছিল বিশাল মাঠ, গার্মেন্টস থেকে টুকরো কাপড় এনে বাছবাছাই ছিল তখনকার ব্যবসায়ীদের মূল কাজ। এভাবে যুগ বদলায় - প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটে – ফলে একে একে বৈচিত্রময় পণ্য যুক্ত হতে হতে বেশ রমরমা ব্যবসায় পরিণত হয় এই বাজার।

করোনার সময় বেশ দুর্বিষহ সময় পার করেছে এই জনপ্রিয় স্থানটি। কঠিন বাস্তবতার সময় অনেকেই দোকান ছেড়ে দেয়। করোনার পর অনেকে আবার ফিরেও আসে। সাথে চলে আসে অর্থনৈতিক বিপত্তি। 

দেশের অর্থনীতির দুরবস্থার সাথে মানিয়ে চলতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছিল এখানের দোকানমালিকদের। কর্মী ছাটাই থেকে শুরু করে, পণ্য তোলা বন্ধ পর্যন্ত করতে হয়েছিল তাদের।

তবে অর্থনীতির চাকা ঘোড়ার সাথে ব্যবসা করোনাপূর্ব সময়ের মতো রমরমা অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশা রাখছেন স্থানীয় দোকানদাররা।

fatemaaktarhellbound@gmail.com

 

শেয়ার করুন