
প্রকাশিত হয়েছে :
সংশোধিত :

“শাড়িতেই নারী” - কথাটি যেন হাজার বছর ধরে বাঙ্গালী রমণীরা হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছে। পহেলা বৈশাখ, ইদ, পূজা-পার্বণ, মিলনমেলা থেকে শুরু করে যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠানে নারীর প্রথম পছন্দ শাড়ি।
নারীর পছন্দের শাড়িরও রয়েছে আবার অসংখ্য ধরণ। যেমন - জামদানি শাড়ি, ঢাকাই শাড়ি, কাতান শাড়ি, টাঙ্গাইল শাড়ি, বেনারসি শাড়ি, রাজশাহী রেশম-সিল্ক শাড়ি, ইত্যাদি।
এসবের মাঝে রাজশাহী সিল্ক রয়েছে পছন্দ তালিকার একদম প্রথম সারিতে। এই পোশাক শীত বা গ্রীষ্ম যেকোনো ঋতুতেই পরিধানের উপযোগী। আর এই গুণের জন্য রাজশাহী সিল্কের কদর যে শুধু দেশেই আছে তা নয়, এর সুনাম রয়েছে বিদেশেও।
চলুন জেনে নিই কীভাবে শুরু হলো আমাদের ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সিল্কের যাত্রা।
বাংলাদেশে সিল্কের যাত্রা
বাংলা অঞ্চলে ১৩ শতাব্দীর শুরু থেকে রেশমের চাষ শুরু হয়। তখন এর নাম ছিল বেঙ্গল সিল্ক বা গঙ্গার রেশম। রাজশাহী অঞ্চলে সরকারী তত্ত্বাবধানে ১৯৫২ সালে রাজশাহী সিল্কের যাত্রা শুরু হয় যা বাংলাদেশে প্রথম। রাজশাহী সিল্ক কারখানা একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা যা ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৮ সালের পর এই রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পটি রেশম উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে আসে।
সিল্ক চাষ-প্রক্রিয়া
সিল্ক বা রেশমের চাষ একটি জটিল প্রক্রিয়া। রেশম চাষ হতে কাপড় তৈরি পর্যন্ত তিনটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়।প্রথমটি তুঁত গাছ চাষ, দ্বিতীয়টি রেশম পোকা পালন এবং কাপড় তৈরির জন্য রেশমগুটির সুতা পৃথক করা। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় পুরোপুরি কৃষি ভিত্তিক হলেও তৃতীয় পর্যায়টি শিল্পভিত্তিক
রেশম গুটি দেখতে অনেকটা কবুতরের ডিমের মতো। রেশমগুটির অন্য নাম কোকুন। এর ভেতরে অবিন্যস্ত ৫০০ মিটারেরও বেশি সুতা থাকে। কোকুন তৈরি হতে তিনদিন সময় লাগে। আট দিনের মধ্যে এর ভিতরের শূককীট পিউপায় রূপান্তরিত হয়। আর পিউপায় পরিণত হওয়ার পূর্বেই রেশমগুটির ভেতরের পোকাটিকে গরম পানিতে সিদ্ধ করে রেশম সুতা সংগ্রহ করতে হয়। অন্যথায় সুতার গুণগত মান হ্রাস পায়।
রাজশাহী সিল্কের শাড়ি
বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে অধিক রেশম চাষ হওয়ার কারণে এই অঞ্চলের নামানুসারে রাজশাহী সিল্কের নামকরণ হয়। রেশমের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং ঐতিহ্যবাহী শাড়ির নাম হল গরদ। এধরনের শাড়ি কেবল রাজশাহীতেই পাওয়া যায়।
রাজশাহী অঞ্চলে বুনানো এই শাড়ি রেশমের স্বাভাবিক রঙের জমিনের বিপরীতে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লাল বা সবুজ এবং কখনো সোনালি জড়ির কাজ করা পাড় থাকে। পাড়ে রেখা, ত্রিভুজ ও জ্যামিতিক আকার সমৃদ্ধ সূক্ষ্ম নকশা থাকে। স্বাভাবিক রঙের রেশমী কাপড়ের নাম কোরা, ক্ষারি বা ধোয়া হলে তার নাম হয় গরদ। গরদের শাড়ির পাড়ের রং যাই হোক না কেন, শাড়ির জমিন উজ্জ্বল বা হাতির দাঁতের বর্ণ হয়ে থাকে।
রাজশাহীতে উৎপাদিত সিল্কের দ্বারা যে সকল কাপড় তৈরি হয় তার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হল বলাকা সিল্ক। এই সিল্কের শাড়ি তৈরিতে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়। মূলত মসলিন সুতা কে টুইস্টিং মেশিনের মাধ্যমে টুইস্ট করে বলাকা সিল্ক তৈরী করা হয়। বলাকা সিল্কের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটা সম্পূর্ণ হ্যান্ডলুম একটি কাপড়। বলাকা সিল্ক কখনোই মেশিনে বুনন করা যায় না। বলাকা সিল্কের বুনন বেশ শক্ত ও ভরাট হয়।এজন্য বলাকা সিল্ক অনেক পাতলা ও হালকা হওয়া সত্বেও ট্রান্সপারেন্ট হয় না।
রাজশাহী সিল্কের বর্তমান অবস্থা
‘বনের পাতা খেয়ে পোকা দেয় সোনার টাকা’ - রাজশাহী শহরে সিল্কের জন্য সবচেয়ে প্রচলিত প্রবাদ এটি । ২০১৮ সালে রাজশাহীর একমাত্র সরকারি রেশম কারখানাটি ফের চালু হয়। কারখানাটি চালুর পর এর ৪২টি লুম মেরামত করা হয়। বর্তমানে এর ১৯টি লুমে ৪১ জন শ্রমিক ও তাঁতি কাপড় উৎপাদন করছেন। চালু হয়েছে বন্ধ শো-রুমও।
বর্তমানে রাজশাহী রেশম কারখানায় মাসে এক টন সুতা উৎপাদিত হচ্ছে। এতে প্রায় এক হাজার ২০০ গজ কাপড় তৈরি হচ্ছে। কারখানার শো-রুমে শাড়ি মিলছে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকাতে। চাদর ও ওড়না মিলছে দুই হাজার টাকার মধ্যে। পাঞ্জাবি ও শার্টের পিসের দাম ৮০০ টাকা গজ।
২০০৫ সালে এক কেজি সুতার দাম ছিল এক হাজার টাকা। বর্তমানে সেই সুতার দাম কেজিপ্রতি সাড়ে ৭ হাজার টাকা। বর্তমানে রেশম উন্নয়ন বোর্ড নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে সাড়ে তিন হাজার টাকা কেজি দরে দেশি সুতা বিক্রি করছে বেসরকারি কারখানা মালিকদের কাছে।
রেশমের উন্নয়নে সরকারিভাবে দেশে ১৩৫ কোটি টাকার কয়েকটি প্রকল্প চালু রয়েছে। সুতার চাহিদা মেটাতে প্রতি বছরই তুঁতগাছ লাগানো হচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যেই রেশম সুতার উৎপাদন বাড়বে। তখন দেশি সুতাতেই শতভাগ রেশম তৈরি হবে।
দেশের জিআই পণ্য হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে রাজশাহী সিল্ক। আবার করোনাকালীন মন্দা কাটিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই বাজারে ফিরেছে তাদের পুরনো পছন্দের খোঁজে। ক্রেতার চাহিদা ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ঐতিয্যবাহী রাজশাহী সিল্কের প্রচার ও প্রসার ঘটানো সম্ভব।
tanjilatasnim180@gmail.com

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.