স্বীকৃতির পর ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ: সীমান্ত ও নিরাপত্তা কাদের হাতে?

প্রকাশিত হয়েছে :
সংশোধিত :

সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা নৌবহর বিশ্বব্যাপী বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েলের অবরোধ ভেঙ্গে গাজার উদ্দেশ্যে এমন যাত্রা নিঃসন্দেহে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
যদিও বর্বর ইসরায়েলি বাহিনীর বাধার মুখে ত্রাণবাহী সেই নৌবহর তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পারেনি, তবে এটি ইসরায়েলীদের স্পষ্ট ভাষায় এই বার্তাই দেয়- "তোমাদের দিন শেষ হতে চলেছে। কারণ গোটা বিশ্ব ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে জোরালো আওয়াজ তুলছে।"
শুধু ফ্লোটিলা নৌবহরই নয়, ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ঘটে যাওয়া আরও বেশ কিছু ঘটনা নেতানিয়াহু সরকারের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং পর্তুগালের পর এবার জাতিসংঘ অধিবেশন চলাকালীন ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ফ্রান্স।
প্রতিনিয়ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে মানববন্ধন করছে শান্তিপ্রিয় মানুষ। এমনকি বিক্ষোভ হচ্ছে ইসরায়েল সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও।
তাই তো প্রশ্ন ওঠেছে- তবে কি এবার ভাগ্যের পরিবর্তন হতে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিদের?
১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে সংঘাত লেগে আছে। পশ্চিমাদের সহায়তায় একের পর এক ফিলিস্তিনি ভূমি দখল করে ইসরায়েল তার রাষ্ট্র সীমানা বাড়ালেও এর বিপরীতে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যে জুটেছে কেবল শোষণ আর বঞ্চনা।
বর্তমানে ফিলিস্তিনের একটি ছোট শিশুও জানে ক্ষুধার যন্ত্রণা কতটা কষ্টকর।
চোখের সামনে পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু এখন তাদের কাছে একটি নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি যুদ্ধ বিধ্বস্ত এই দেশে ত্রাণবাহী যান পৌঁছাতেও বাধা দেয় দখলদার ইসরায়েল।
সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মানবাধিকারকর্মী কিংবা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ- সব জায়গায় ক্রমেই জোরালো হচ্ছে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির দাবি। ইতোমধ্যে, এই আন্দোলন পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এবং তারই সুবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বেশ কিছু পশ্চিমা দেশও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যা একসময় কল্পনারও বাইরে ছিল।
এই গণজোয়ার অব্যাহত থাকলে হয়তো অচিরেই ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যাকাশে উদিত হবে নতুন এক সূর্য। এখন প্রশ্ন হলো- এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনের ভবিষ্যত কেমন হবে? কিংবা দেশটির সীমান্ত ও নিরাপত্তা কি সত্যিই তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে?
বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কারণ, এতে করে দেশগুলো ফিলিস্তিনের সাথে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে। আর একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো সুদৃঢ় করতে শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি দেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক ঋণ আনয়নের ক্ষেত্রে বিশ্ব দরবারে ঐ দেশটির অবস্থান সতর্কতার সাথে বিবেচনা করে বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে কোনও দেশ যদি অন্য দেশকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেয় তাহলে ঐ দেশের সাথে স্বাভাবিকভাবেই বৈদেশিক লেনদেন বাধাপ্রাপ্ত হয়।
কারণ, এসব লেনদেন প্রক্রিয়াকরণে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা দরকার হয় সেগুলো তখন বাস্তবায়ন করা দুরূহ হয়ে ওঠে। তবে স্বীকৃতির পর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এসব সহযোগিতা করা হয় বিধায় তখন আর তেমন কোনও বেগ পোহাতে হয় না। আর এসব দৃষ্টিকোণ থেকে ফিলিস্তিনিরা আগামীতে হয়ত বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা অর্জন করতে পারবে।
এবার আসা যাক জাতিসংঘ প্রসঙ্গে। গত ১২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের নেতৃত্বে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে একটি প্রস্তাব পাশ হয়। প্রস্তাবটিতে ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দেয় ১৪২টি দেশ, বিপক্ষে ১০টি দেশ এবং ভোটদানে বিরত ছিল ১২টি দেশ।
জাতিসংঘ সনদের ৪নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে পাশ হতে হলে তা সাধারণ পরিষদের পর নিরাপত্তা পরিষদেও পাশ হতে হয়। বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র পাঁচটি এবং অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র ১০টি। মোট ১৫টি রাষ্ট্রের মধ্যে নয়টি রাষ্ট্র প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেই প্রস্তাবটি পাশ হয়ে যায়।
তবে শর্ত হলো, স্থায়ী পাঁচটি সদস্য দেশের সবগুলোকেই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিতে হয়। আর ঐ পাঁচটি স্থায়ী দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র বাদে বাকী চারটি দেশ ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যে সহজেই ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দিবে না সেটি মোটামুটি নিশ্চিত। সেক্ষেত্রে ফিলিস্তিনের জাতিসংঘের সদস্য হওয়াটাও অনেকটাই অনিশ্চিত।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে ফিলিস্তিনের সদস্য হওয়া অনেকটা অনিশ্চিত হলেও ইসরায়েলের মিত্র হিসেবে পরিচিত পশ্চিমা দেশগুলো যেভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে আওয়াজ তুলছে তা বিশ্ব দরবারে ইসরায়েলকে একঘরে করে রাখতে ভূমিকা রাখবে। এতে হয়তো তারা ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হবে। তবে এজন্য প্রয়োজন ফিলিস্তিনের প্রতি বিশ্ববাসীর সমর্থন আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত রাখা।
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে সীমান্ত নিরাপত্তাসহ দেশটির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে ফিলিস্তিনে রাষ্ট্র স্বীকৃত কোনও সামরিক বাহিনী নেই। আধা-সামরিক বাহিনীও ইসরায়েলের অধীনে পরিচালিত হয়। তবে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেলে তা ফিলিস্তিনের সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশীয় নিরাপত্তা জোরদার করতেও ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে ফিলিস্তিনের প্রতিবেশী দেশ হিসেবে রয়েছে ইসরায়েল, জর্ডান ও মিশর। এর মধ্যে ইসরায়েল ব্যাতীত বাকী দুইটি দেশের আগামীতে ফিলিস্তিনের সীমান্তে সমস্যা তৈরির সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
এসব বিষয়ে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাইদুল ইসলাম। ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে সম্মুখসারিতে আন্দোলন করে আসছেন তিনি। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে বিভিন্ন দেশ স্বীকৃতি দিচ্ছে। এটি দেশটির পক্ষে এক ধরনের কূটনৈতিক বৈধতা সৃষ্টি করবে। কিন্তু এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে তাদের সাথে চলা সংঘাতের অবসান নাও হতে পারে। যেসব দেশের সার্বভৌমত্ব আছে তারা অনেক দ্রুত সুশীল সমাজ কিংবা বৈশ্বিক সাহায্য পেতে পারে।"
তিনি আরও বলেন, "জবরদস্তিমূলক পররাষ্ট্রনীতি যে কোনো দেশকেই চিরতরে অন্যায় কিংবা বর্ণবাদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বর্তমানে ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি দেখে মানবিক কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এক হচ্ছে। এটি হয়ত দীর্ঘমেয়াদে তাদের জন্য একটি নিরাপদ সীমান্ত তৈরি করতে সাহায্য করবে।"
স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃতি পেলেও, ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়া সম্ভব নয়। আর তাই ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সব দেশকেই জোরালো কণ্ঠে আওয়াজ তুলতে হবে।
tanjimhasan001@gmail.com

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.