Bangla
2 years ago

সম্প্রতি দেখা মিলেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে

যে ফুল শুধু মে মাসেই ফুটে

পশ্চিম আফ্রিকার উষ্ণাঞ্চলের এই ফুলটি আমাদের দেশের পরিবেশের সঙ্গেও খাপ খাইয়ে নিয়েছে
পশ্চিম আফ্রিকার উষ্ণাঞ্চলের এই ফুলটি আমাদের দেশের পরিবেশের সঙ্গেও খাপ খাইয়ে নিয়েছে Photo : ছবিঃ হাসান সজীব

প্রকাশিত হয়েছে :

সংশোধিত :

ঋতু পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রকৃতিতে রকমারি ফুলের আবির্ভাব বিশেষ কিছু নয়। গ্রীষ্মের খরতাপের বার্তা বয়ে যেমন কৃষ্ণচূড়া, জারুল, হিজলের আগমন ঘটে তেমনি কদম, কামিনী আর বকুল জানান দেয় স্নিগ্ধ বর্ষার। শরতে কাঁশফুল, হেমন্তে গন্ধরাজ, শীতে চন্দ্রমল্লিকা-গাঁদা, বসন্তে শিমুল-পলাশ শুধু মৌসুমের পরিবর্তনকে মনে করিয়ে দেয় না, প্রকৃতির বরপ্রাপ্ত দেশমাতৃকার প্রতি আলাদা টানও তৈরি করে।

কিন্তু যদি এমন কোনো ফুলের কথা বলা হয় যেটি সারাবছর নিদ্রালু থাকে, একটি নির্দিষ্ট মাসে কাণ্ডসহ জেগে ওঠে প্রকৃতির কোলে, তবে খানিকটা অবাক হতেই হয়। বলছি 'মে ফুল' বা 'মে ফ্লাওয়ার' এর কথা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে শোভা ছড়াচ্ছে ‘মে ফ্লাওয়ার’ ছবিঃ হাসান সজীব

মে মাসে ফুটে বলেই এর নাম মে ফ্লাওয়ার, যেটি সময়নিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপ দেখিয়ে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পঞ্চম মাসেই প্রকৃতির কোলে আবির্ভূত হয়। সাধারণত দুই সপ্তাহের মতো স্থায়ী হয় এই ফুল।

সুদূর আফ্রিকায় নাড়িপোতা এই অনন্য সুন্দর ফুলটির দেখা মিলেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে।

মে ফ্লাওয়ার মূলত উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলের আলংকারিক বিরুৎ। পশ্চিম আফ্রিকার উষ্ণাঞ্চলের এই ফুলটি আমাদের দেশের পরিবেশের সঙ্গেও খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এটি মূলত একটি ফুল নয়, বরং একসাথে ফোটা অনেকগুলো ফুলের সমষ্টি যা একত্রে একটি বলের মত দেখায়। তাই লাল-গোলাপি রঙের এই ফুলকে ফায়ার বল লিলি, টর্চ লিলি, আফ্রিকান ব্লাড লিলি, পাউডার পাফ লিলি, টর্চ লিলি, ফুটবল লিলি ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়। এই ফুলের নান্দনিক শোভা থাকলেও নেই কোনো সৌরভ।

প্রায় দুশোটির মত পুষ্প বিন্যস্ত হয়ে বল আকৃতির একটি ‘মে ফ্লাওয়ার’এর রূপ নেয়। ছবিঃ হাসান সজীব

সৌরভহীন মে ফ্লাওয়ারের শোভা সম্পর্কে ফুলপ্রেমী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. সৌরভ জানান, "জাবির বোটানিক্যাল গার্ডেনে বাহারি রঙের ফলজ, বনজ, ম্যানগ্রোভ, নগ্নবীজী, আবৃতবীজী ও আলংকারিক উদ্ভিদের  সমারোহ রয়েছে। বল আকৃতির রক্তবর্ণ এই ফুলটি প্রথমবার দেখে কিছুটা অবাক হয়েছিলাম। পরবর্তীতে জানতে পারি ফুলটির নাম 'মে ফ্লাওয়ার'। অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ফুলটি দেখলে  মে ফ্লাওয়ার সম্পর্কে জানতে মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি হবে বলে আমি মনে করি।"

নান্দনিক মে ফ্লাওয়ার সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান গবেষণা কর্মকর্তা ও নিসর্গবিদ মোঃ আব্দুর রহিম বলেন, "মে ফ্লাওয়ারের আদি নিবাস আফ্রিকায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম স্কাডোক্সা মাল্টিফ্লোরাস। এটি এ্যামারাইলদাসি পরিবারের উদ্ভিদ। এর পুষ্পবিন্যাসে দুই’শটির মতো ফুল একত্রে মিশে থাকে। ফুলগুলোর মাথায় হলুদ রঙের পুংকেশর দেখা যায়। কন্দ ও বীজের মাধ্যমে এরা বংশবিস্তার করে।

তিনি আরও বলেন, “সবধরনের মাটিতে মে ফ্লাওয়ার জন্মায়। এই ফুল দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে-পূর্ব ভারত থেকে মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। এর কান্ড ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়।  ফুলের ডাঁটা ও গাছের পাতার রং সবুজ, রসালো এবং নরম প্রকৃতির। এদের সাদা রঙের ফুল ধরতেও দেখা যায়। তবে সাদা রঙের ফুল সচরাচর ভারতীয় উপমহাদেশে দেখা যায় না বললেই চলে।”

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. ছালেহ আহাম্মদ খান জানান, “ফুলটি মে মাসে ফুটলেও পুরো মাসজুড়ে স্থায়ী হয় না। এক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে।”

সৌন্দর্যের সাথে সংকটও আছে। এই ফুল ছাগল, ভেড়া খেয়ে নিলে হতে পারে মারাত্মক পরিণতি। গৃহপালিত পশুর দেহে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যা হতে পারে প্রাণঘাতী। আফ্রিকায় এর কষ শিকারীর তীর এবং মাছ ধরতে ব্যবহার করা হত।

তবে সবকিছু ছাঁপিয়ে এই ফুলের প্রতি আবেদন দিন দিন ছড়িয়ে পড়ছে  পুষ্পপ্রেমীদের মাঝে। বছরে মাত্র একবার এটির লাবণ্য উপভোগ করার স্পৃহায় বাড়ির সামনের আঙিনায়, ছাদ বাগানে বা ব্যালকনিতে স্থান পাচ্ছে নান্দনিক ‘মে ফ্লাওয়ার’।

 

হাসান সজীব জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী এবং দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।

 sojib.mhs@gmail.com

শেয়ার করুন