প্রখর ঘ্রাণশক্তি, দারুণ ক্ষীপ্রতা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, অব্যর্থ নিশানার মতো গুণ রয়েছে কুকুরের। এই গুণগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিরলস প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হয় ডগ স্কোয়াড।

শারীরিক গঠন, আকার, রং ইত্যাদি বিবেচনায় পৃথিবীতে কম বেশি ১৪০ প্রজাতির কুকুর রয়েছে। ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে কুকুরকে সাতটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। হাউন্ড, হার্ডিং, স্পোর্টিং, নন স্পোর্টিং টেরিয়ার, টয় ব্রিডস ও ওয়ার্কিং ডগস।
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের সামরিক বাহিনীতে রয়েছে ডগ স্কোয়াড। আমাদের দেশে সামরিক বাহিনী ছাড়াও বিজিবি, পুলিশ ও র্যাব এর রয়েছে এই স্কোয়াড।
বর্তমানে ডিএমপিতে ৩৫টি, এপিবিএনে ৮টি এবং র্যাবে মোট ৫১টি প্রশিক্ষিত কুকুর রয়েছে। এই স্কোয়াডের কুকুরগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও খাবারের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে নির্ধারিত ভেটেরিনারি কর্মকর্তা।
মাদকদ্রব্য শনাক্ত ও উদ্ধার, গন্ধ শুঁকে বোমা শনাক্ত, খুন কিংবা ডাকাতির ঘটনায় অপরাধী খুঁজতে, ভিভিআইপি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তার কাজে, মরদেহ উদ্ধার, ইত্যাদি কাজে কুকুর ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা বাহিনীগুলো।
সম্প্রতি ট্রেনের নিরাপত্তায় র্যাব কমলাপুর রেলস্টেশনে ডগ স্কোয়াড মোতায়েন করেছে। ট্রেন ছাড়ার আগে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে করা হবে স্ক্যানিংও। কর্ণফুলি টানেলের নিরাপত্তায়ও মোতায়েন করা হয়েছে এই স্কোয়াডের সদস্যদের।
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক সফলতার যুগেও নিরাপত্তার কাজে কুকুর এক ভরসার নাম। কুকুরের ঘ্রাণশক্তি মানুষের চেয়ে অনেক বেশি এবং একবার কোনা ঘ্রাণ কুকুরের নাকে পৌঁছালে তা দীর্ঘ সময় ধরে তার স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকে। কারণ কুকুরের আছে মানুষের চেয়ে প্রায় ২০০ মিলিয়ন বেশি সেন্ট রিসেপ্টর। এর মধ্যে ১৫ মিলিয়ন রিসিপ্টরের আছে ইনফ্রারেড ক্যাপাবিলিটি । বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে ২শত লিটার পানির মধ্যে এক ফোঁটা অন্য কোনো তরল পদার্থ মিশিয়ে দিলেও কুকুর তা শনাক্ত করতে পারে।
৫ প্রজাতির কুকুর এ ধরনের কাজে বেশি পারদর্শী। জার্মান শেফার্ড ও রুট হুইলার, ব্রিটিশ ল্যাব্রেডোর ও ব্লাডহাউন্ড এবং বেলজিয়ান ম্যালিনয়েচ জাতের কুকুর৷ আমাদের দেশে জার্মান শেফার্ড ও রুট হুইলার এবং ব্রিটিশ ল্যাব্রেডোর জাতের কুকুরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা হয়।
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পুলিশের ডগ স্কোয়াডের দায়িত্ব দেওয়া হয় সাতজন নারী সদস্যকে। ডগ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের হ্যান্ডলার বলে। সাধারণত পুরুষ সদস্যরাই এ দায়িত্ব পালন করে। শুধুমাত্র বাংলাদেশেই নয় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে কোনো বাহিনীর ডগ স্কোয়াডে নারী হ্যান্ডলার এটিই প্রথম।
বেসিক কে-নাইন হ্যান্ডলার কোর্সে অংশ নিয়ে নতুন যুগের সূচনা করেছেন এই সাত নারী পুলিশ সদস্য। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবৈধ এবং চোরাই মালামাল খুঁজে বের করার দায়িত্ব পালন করছেন তারা।
আমাদের দেশে র্যাবের ডগ স্কোয়াড সবচেয়ে দক্ষ এবং চৌকস। দেশের পুলিশ বাহিনীতে সর্বপ্রথম ডগ স্কোয়াড গড়ে তোলা হয় ১৯৯৮ সালে। সে সময় ৫টি প্রশিক্ষিত কুকুর (ট্রেইনড ডগ) এবং ২০টি পাপিস ডগ নিয়ে প্রথম ডগ স্কোয়াডটি গঠন করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে ওই ডগ স্কোয়াডটি পুলিশের কাছ থেকে র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ঢাকার মিরপুরে ২০০৪ সালে ২০ টি কুকুর ও ৬৫ জন সদস্য নিয়ে র্যাবের কুকুর প্রশিক্ষণকেন্দ্র শুরু হয় । স্কোয়াডটিতে বর্তমানে কুকুরের সংখ্যা ৫১। কুকুরগুলোকে কঠোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ট্রেনিং টিম, আর্মস এন্ড এক্সপ্লোসিভ টিম, নার্কটিক্স টিম এবং গার্ড টিমে ভাগ হয়ে কাজ করে র্যাবের সদস্যরা।
সম্প্রতি সিদ্দিকবাজারে ৩টি মরদেহ শনাক্ত করে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো র্যাবের মহাপরিচালকের নিকট পুরস্কার পায় কোনো কুকুর। বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য ল্যাব্রেডোর জাতের চিতা নামের কুকুরটিকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
ডগ স্কোয়াডের কুকুরগুলো কোনো কিছুতেই ভয় পায় না। সদা সতর্ক এবং প্রস্তুত হ্যান্ডেলারের নির্দেশের অপেক্ষায়। প্রখর ঘ্রাণশক্তির কারণে কুকুর অন্যান্য প্রাণি থেকে আলাদা।
নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে কার্যকরী অস্ত্র হলেও বরাবরই পর্দার আড়ালে, আলোচনার বাইরে থেকে যায় বিভিন্ন বাহিনীর ‘ডগ স্কোয়াড ’। তাই হয়তো এই স্কোয়াডকে বলা হয় বিপজ্জনক সময়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু।
mohammadullahtusher@gmail.com



