
Published :
Updated :

অসীম সম্ভাবনা নিয়ে জন্ম নেয় প্রতিটি শিশু। সেই সম্ভাবনাকে ধীরে ধীরে আকার দিতে নীরব বন্ধুর ভূমিকাটি পালন করে বই। বই শিশুকে শুধু গল্প শোনায় না, তাকে ভাবতে শেখায়, অনুভব করতে শেখায় এবং নিজের মতো করে পৃথিবীকে বুঝে নিতে সাহায্য করে। তাই শিশুর বিকাশে বইয়ের ভূমিকা কখনোই কম করে দেখার সুযোগ নেই। তবে শিশুর হাতে বই তুলে দেয়াটাই যথেষ্ট নয়, কোন বয়সে কোন ধরনের বই তার মানসিক জগতের বিকাশে কাজ করবে, সেটি বোঝা আরও জরুরি।
ছবিসহ গল্পের বই
শিশু ভাষা শেখার আগেই রঙ ও অবয়ব চিনতে শুরু করে, তখন ছবি সমৃদ্ধ বই তার প্রথম শেখার মাধ্যম হয়। বড় ছবি, কম শব্দ এবং পরিচিত বস্তু শিশুর কৌতূহল জাগায়।
এই বয়সের উপযোগী বাংলা বইয়ের মধ্যে রয়েছে আমার প্রথম বই, রঙিন ছবি, ছোটদের পশুপাখি, ছোটদের ফলমূল, ছোটদের যানবাহন, ছোটদের ছড়া ছবি, ছোটদের বাংলা বর্ণ, ছোটদের সংখ্যা, ছোটদের গল্পছবি। ৩ বছরের কাছাকাছি শিশুদের মধ্যে কৌতূহল উদ্দীপনের জন্য এই বইগুলো তাদের দেয়া যেতে পারে।
ছড়া ও কবিতার বই
সাধারণত, ৩ থেকে ৫ বছর বয়সে শিশু যখন শব্দের ছন্দে আনন্দ পায় এবং মুখে মুখে বলার চেষ্টা করে, তখন ছড়া তার ভাষা ও স্মৃতিশক্তি বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে।
এই পর্যায়ে আবোল-তাবোল, হযবরল, খাই খাই, ছড়ায় ছড়ায় বাংলা, ছোটদের সুকুমার, ছড়ার দেশে, শিশু কবিতা সংকলন, নজরুলের শিশু কবিতা, আ লাইট ইন দ্য অ্যাটিক বা দ্য পাফিন বুক অব নার্সারি রাইমস-এর মতো বই শিশুকে শব্দের জগতে প্রবেশের পথ তৈরি করে দেয়।
রূপকথা ও লোককাহিনী
রূপকথা শিশুকে তার কল্পনার জগতে প্রবেশ করতে সাহায্য করে, ভালো-মন্দ সম্পর্কে ধারণা দেয় এবং তাদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার বীজ বপন করে। ঠাকুরমার ঝুলি, বাংলার লোককথা বা আরব্য রজনী শিশুদের ন্যায়পরায়ণ এবং সাহসী হতে শেখায়।
গ্রিমস ফেয়ারি টেলস, অ্যান্ডারসনের রূপকথা, কিংবা গোল্ডিলকস অ্যান্ড দ্য থ্রি বিয়ার্স শিশুর কল্পনার জগতকে আরও সমৃদ্ধ করে। পঞ্চতন্ত্র এবং এসপস ফেবলসের মতো গল্প শিশুদের যুক্তি, কৌশল ও সামাজিক বুদ্ধিমত্তা শিখতে সাহায্য করে।
নৈতিক গল্প
শিশুর চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে নৈতিক গল্পের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। সাধারণত ৫ থেকে ৭ বছরের শিশুরা যখন ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখে, তখন এই ধরনের গল্প তাদের মানসিক বিকাশের শক্ত ভিত তৈরি করে। এই বয়সে শিশুরা গল্পের চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেখে এবং আচরণ অনুকরণ করতে শুরু করে।
টুনটুনির গল্প, গুপী গাইন বাঘা বাইন কিংবা ছেলেদের রামায়ণ শিশুকে আনন্দ দেয়ার পাশাপাশি সততা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। এছাড়া ইংরেজি সাহিত্যের দ্য বয় হু ক্রাইড উলফ, ভ্যালুজ ফর চিলড্রেন, স্টোরিজ উইথ মোরালস, লেসন্স ফ্রম লাইফ, গুড ম্যানার্স ফর কিডস এর মতো বইগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশুদের নৈতিক চেতনা গড়ে তুলছে সাহায্য করে আসছে।
কল্পকাহিনি ও অ্যাডভেঞ্চার
সাধারণত ৮ থেকে ১১ বছর বয়সে শিশু যখন বড় গল্পে ডুবে যেতে চায়, তখন কল্পকাহিনী ও অভিযানভিত্তিক বই তার কৌতূহল ও সাহস বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। রহস্য, অভিযান আর কল্পনার জগতে ঢুকে শিশুর মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়া, সমস্যা সমাধান এবং নেতৃত্ব দেয়ার মতো মানসিকতা তৈরি করে।
পদ্মগোখরো, ফেলুদা সমগ্র, ঘনাদা সমগ্র, টেনিদা সমগ্র, হ্যারি পটার সিরিজ, দ্য ক্রনিকলস অব নার্নিয়া, পার্সি জ্যাকসন, চার্লি অ্যান্ড দ্য চকোলেট ফ্যাক্টরি, ট্রেজার আইল্যান্ড, দ্য হবিট, দ্য সিক্রেট সেভেন এই জনরার উল্লেখযোগ্য বই।
বিজ্ঞান ও কৌতূহলভিত্তিক বই
প্রশ্ন করার প্রবণতা বাড়ে ৯ থেকে ১২ বছর বয়সে। বিজ্ঞানভিত্তিক বই তখন শিশুর মাঝে যুক্তিবোধ তৈরি করে দেয়। এই জনরায় পড়ার মতো বই হলো বিজ্ঞানের গল্প, মজার বিজ্ঞান, মহাকাশের কথা, লুকিং অ্যাট স্টারস, হিউম্যান বডি ফর কিডস, স্পেস এক্সপ্লোরেশন, দ্য বিগ বুক অব হাউ, এভরিথিং ইউ নিড টু নো অ্যাবাউট সায়েন্স, কিউরিওসিটি বুক।
ইতিহাস ও জীবনীভিত্তিক বই
বাস্তব মানুষ এবং ঘটনার সঙ্গে পরিচয় শিশুকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও মহাকাশ জয়ের গল্প শিশুকে দেশপ্রেম ও সাহসী হতে শেখায়।
হু ওয়াজ আইনস্টাইন, হু ওয়াজ নেলসন ম্যান্ডেলা বা লিটল পিপল বিগ ড্রিমস সিরিজ শিশুকে স্বপ্ন দেখার শক্তি দেয়। ফেমাস সায়েন্টিস্টস, ফেমাস ইনভেনটরস বা ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি ফর কিডস শিশুর ইতিহাস ও বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানের উৎস হিসেবে কাজ করে।
আবেগ ও সামাজিক দক্ষতার বই
শিশুদের আবেগ বোঝা এবং আবেগ প্রকাশ করার উপায় শেখা প্রয়োজন। ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে শিশু যখন বন্ধুত্ব, ভয়, রাগ, ভালোবাসা বুঝতে শেখে, তখন আত্মবিশ্বাস ও আবেগ শেখার বই তার সামাজিক বোধ গড়ে তোলে।
এই ধরনের বই শিশুকে নিজের অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত করায় এবং অন্যের অনুভূতিকে সম্মান করতে শেখায়। আমি যেমন আমি, আবেগের গল্প, দ্য কালার মনস্টার, টুডে আই ফিল এবং হাউ আর ইউ ফিলিং এর মতো বই শিশুকে আবেগ প্রকাশ করতে সাহায্য করে। ।
আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রেরণামূলক বই
নিজেকে নিয়ে ভাবা শুরু হয় সাধারণত ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সে। এই সময়ে অনুপ্রেরণামূলক বই শিশুকে নিজেকে চিনতে শেখায়। এই বয়সে পড়ার মতো বইগুলো হলো আমি পারি, স্বপ্ন দেখো, সফল মানুষের গল্প, কনফিডেন্স ফর কিডস, ইউ আর স্পেশাল, এমোশনস বুক এবং বিয়িং ব্রেভ শিশুকে আত্মবিশ্বাসী ও মানসিকভাবে শক্ত হতে শেখায়।
ক্লাসিক ও কৈশোর সাহিত্য
কৈশোরের শেষ দিকে, সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সে, ক্লাসিক সাহিত্য চিন্তাকে গভীর ও পরিণত করে। এই পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মধ্যে রয়েছে দীপু নাম্বার টু, আমার বন্ধু রাশেদ, আম আঁটির ভেঁপু, হাজার বছর ধরে, কিশোর উপন্যাস সমগ্র, কৈশোরের গল্প, সময়কে ছুঁয়ে, জীবনের গল্প, চিন্তার গল্প।
বয়স অনুযায়ী সঠিক বই শিশুকে ধীরে ধীরে চিন্তাশীল, সৃজনশীল ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়তে সহায়তা করে। প্রতিটি গল্প, ছড়া, কল্পকাহিনী বা বিজ্ঞানভিত্তিক বই শিশুর জীবনে নীরব শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে। এজন্যই শুধু বই পড়তে দেয়া নয়, বয়স অনুযায়ী শিশুকে সঠিক বই নির্বাচন করে দেয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
sumaiyariva1120@gmail.com

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.