"আন্দোলনের সময় প্রশ্ন উঠে, এই সরকারের পতন হলে বিকল্প কে? তখন শিক্ষার্থীরা বলে আমরাই বিকল্প। স্বৈরাচারের পতনের পর আমরা শিক্ষার্থী রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে নেমেছিলাম। আর এখন যখন নিজ দেশের এতো বড় ক্রান্তিকাল, বন্যায় যখন ঘর-বাড়ি ভেসে যাচ্ছে, মানুষ যখন প্রচন্ড কষ্টে আছে, তখন তো বিকল্প হিসেবে আমাদেরকেই কাজ করতে হবে, তাই না?" বলছিলেন বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সিনথিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রে (টি এস সি) বন্ধুদের সাথে কাজ করার সময় "বিকল্প কে ?" এই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এসব কথা বলেন। সিনথিয়াসহ টিএসসিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে আসা অসংখ্য শিক্ষার্থী নিজেদের বিকল্প মনে করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রে গেলে দেখা যাবে অসংখ্য শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছে। তাদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পরিবারের অনেকেই তাদের ছোট ছেলে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার জন্য। তাদেরই একজন আল ইমরান, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাক্তন শিক্ষার্থী বর্তমানে তিনি একজন ব্যাংক কর্মকর্তা।
আল ইমরানের বড় ছেলে, ইযাজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। শুক্রবার রাত ১ টায় টিএসসির ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, ইযাজ তার বাবার সাথে বস্তা বোঝাই করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা টিম ওয়ার্ক করে আনন্দ পাচ্ছে:
সিনথিয়া টিএসসিতে বন্ধুদের সাথে একটি দলের সঙ্গে সন্ধ্যা শুরু করে থেকে সারারাত পর্যন্ত কাজ করেছে। ক্লান্তিকর শোনালেও, এই টিম ওয়ার্ক তারা উপভোগ করছেন বলে জানান সিনথিয়া।
"আমরা আমাদের কলেজ থেকে কয়েকটি টিম হয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে ফান্ড কালেক্ট করেছি। এখন বন্ধুরা মিলে এখানে অন্যদের সাথে কাজ করছি। এটি একটি নতুন অভিজ্ঞতা," সিনথিয়া উল্লেখ করেন।
টিএসসিতে স্বেচ্ছাসেবীরা মূলত কাজ করছে কয়েকটি ভাগে। পুরো বিষয়গুলোকে তদারকি করেছে সমন্বয়কের কয়েকজন। একজন সমন্বয়কের অধীনে কাজ করছে কয়েকটি টিম লিডার বা দলনেতা। আর প্রতিটি টিম লিডারের অধীনে কাজ করছে অন্তত দশ পনেরোজন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থী।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে কিছুটা সমন্বয়হীনতা দেখা গেলেও শনিবার থেকে সেটি কাটিয়ে উঠা যাচ্ছে বলে জানায় অনেকে।
"কারণ আগে থেকে এমন একটি কাজের জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না, অনেকের কোনো অভিজ্ঞতাও নেই এধরনের কাজের; যে যার মতো করে এগিয়ে এসেছে এটিই অনেক," বলেন মোস্তবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তার্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ও একজন স্বেচ্ছাসেবী।
প্রাইম ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সাইন্সের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রিদওয়ান এসেছিলেন তার বন্ধু নাজমুল হোসেনের সাথে, যিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থী। তারা দুজনই মিরপুর থেকে এসেছেন।এই দুই বন্ধু জানান সবকিছু ঠিক না হওয়া পর্যন্ত দেশের জন্য কাজ করে যাবে তারা।
নাজমুল হোসেন উল্লেখ করেন, "বন্যার্ত মানুষের কথা ভেবে সেই বৃহস্পতিবার রাত থেকে ঘুমাতে পারি না। সকাল দশটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত দুইদিন টানা কাজ করি। সেদিকের কাজ শেষ করে আজ টিএসসি এসেছি। আমার পায়ে ফোস্কা পড়ে গেছে।"
"আন্দোলনের সময় টিউশনি চলে গেছে, এখন কাজের জন্য আরও একটি যেটি আছে সেখানেও যেতে পারবো না। এটা চলে গেলেও চলে যাবে, কিন্তু দেশ আগে।" তিনি যুক্ত করেন।
কেউ কাউকে জোর করছে না, সবাই কাজ করছে সতস্ফূর্তভাবে; ক্লান্ত হলে দিচ্ছে স্লোগান, হচ্ছে গান:
এই প্রতিবেদনটি লেখার জন্য প্রতিবেদক রাতে যখন স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছিলেন, তখন তারা কাজে বেশ ব্যস্ত। এতোটাই যে ত্রান নিয়ে কথা বলারও সময় যেন নেই। টানা কাজ করে হাঁপিয়ে উঠলেই, শুরু হয় স্লোগান। পাশে দু-একজন গায় দেশাত্মবোধক গান।
ইতোমধ্যে স্বেচ্ছাসেবী দলগুলো ফেনি-কুমিল্লাসহ কয়েকটি জেলায় গিয়ে স্বেচ্ছাসেবীর ভূমিকা পালন করে৷ অনেকে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের কাজ বুঝিয়ে দেন, আবার নিজেরাও কাজ করেন।
তবে সাংগঠনিকভাবে কাজটি করা গেলে আরও সুশৃঙ্খল হতো বলে উল্লেখ করেন স্বেচ্ছাসেবকদের একজন সমন্বয়ক নাদিম শুভ। তিনি বলেন, "আমরা এই ত্রাণ কর্মসূচি চালিয়ে যাবো। যতদিন পর্যন্ত সবকিছু ঠিক না হবে ততদিন পর্যন্ত চলবে এই কাজ।"
ত্রান হিসেবে গত ২২ আগস্ট থেকে ২৫ তারিখ বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত নগদ অর্থ, মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টিএসসিতে প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা এসেছে।
shakibtahmid05@gmail











