"আমার যে অজ্ঞতা ছিলো বই পড়ার মাধ্যমে আমি সেটা দূর করেছি। আমি যে মানুষের জন্য কিছু করবো ছোট থেকেই এমন ভাবনা। যখন দেখলাম বই বা এই জ্ঞানের জায়গাটায় আমি আরও বেশি করে মানুষের জন্য কিছু করতে পারি, তখন আমি এই পেশাতেই থেকে যাই।" 

কথাগুলো বলছিলেন মধু মন্ডল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  চারুকলা অনুষদের সামনের রাস্তায় চোখে পড়ে একটি ভ্রাম্যমান বইয়ের দোকান। এই দোকানের কর্ণধার তিনি। দ্যা ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস মধু মন্ডলের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে, তার চিন্তাভাবনার সাথে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করে।

বইপোকা নামটি কীভাবে এলো?

মধু মন্ডলের ছোট থেকেই ইচ্ছে ছিল আইন নিয়ে পড়া, শিল্পী হওয়া, সেই অভিপ্রায়ে তিনি ঢাকাতে আসেন ৫০০ টাকা নিয়ে। 

"তারপর আমি ধানমন্ডি ল' কলেজে ভর্তি হই। সেখানকার প্রিন্সিপালের রেফারেন্সে  আমার এক জায়গায় চাকরি হয়। পরে চাকরি চলে যায়। " 

তখন নজরুল সমাধীর এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন বই বিক্রি করতো। মধুমন্ডল তাকে তার সবকিছু ব্যক্ত করেন। 

"আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম আমাকে এই কাজের সাথে নেয়া যায় কিনা। তিনি আমাকে তার সাথে নিলেন। তখন থেকেই যে আমার বইয়ের সাথে যুক্ত হওয়া, সেখান থেকে আর বের হতে পারিনি। তখন থেকে বইপোকার মতো বই পড়ি। একসময় নামই হয়ে যায় বইপোকা ", তিনি যুক্ত করেন।

বই পড়ার আন্দোলন কী?

"আমরা যেসব বই বিক্রি করি, এগুলো পড়লে মানুষ কিছুটা হলেও সভ্য হবে, তাদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় ঘটবে, তারা ভালো মানুষ হবে, অন্যের ক্ষতি করবে না, অন্যায় করবে না। এতে করে সমাজে অপরাধও কমে যাবে," বলেন মধু মন্ডল। আর এটিকেই তিনি বলেন বই পড়ার আন্দোলন।  

তবে তার মতে, এই আন্দোলন সহজ নয়। কারণ, এর আগে চুয়াডাঙ্গায় মাদুড়ে বিছিয়ে তিনি কিছু বই নিয়ে একটা উন্মুক্ত দোকান দিয়েছিলেন। সেটার নাম দিয়েছিলেন জ্ঞানাগার। কিন্তু গ্রামের মানুষের কটুকথা ছিল এমন, এতো লেখাপড়া করে ফুটপাতে দোকান শেষম্যাশ। এসব কথা শোনে তিনি শেষ পর্যন্ত সেই দোকান রাখতে পারেননি।

ভ্যান চুরি হয়ে গিয়েছিল

২০১৪ সালের একরাতে সব বইসহ তার ভ্যানটি চুরি হয়ে যায়। পরে একজন লোকের কাছ থেকে  পাঁচ-ছয় হাজার টাকা ধার নিয়ে আবার শুরু করেন। প্রতিদিন অল্প অল্প করে সেটা পরিশোধ করেন।

এ বিষয়ে তিনি বললেন, “সে সময় ভ্যানে প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার টাকার বই ছিলো। জিডি করেছিলাম। তবে ভ্যান আর পাওয়া গেলো না। অবশ্য পাওয়া যাবে তা আমি ঠিক আশাও করিনি। তবে সেই পরিমাণ বই আজও আর আনা যায়নি।”

বই বিক্রেতা কিন্তু বই ব্যবসায়ী নন

মধু মন্ডল ভালোলাগা থেকে বই বিক্রি করেন। বই নিয়ে ব্যবসা করবেন এই উদ্দেশ্যে বই বিক্রি করেন না। এজন্য বাজারের প্রচলিত গাইড বই বিক্রির বদলে মানুষের চিন্তার জগতে পরিবর্তন আসতে পারে এমন বই তিনি বিক্রি করেন।

উনার বেশিরভাগ বই হচ্ছে সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, রাজনীতি এসব। আর এগুলোর পাঠক খুব কম।

"আইন পড়ে আমি আর কয়টা লোককে ভালো পথে আনতে পারবো! এর চেয়ে বই পড়ার আন্দোলনটা যদি ছড়িয়ে দিতে পারি তাহলে মানুষ খারাপ কাজ কম করবে।"

"নীতি নৈতিকতার মাধ্যমেই আমরা ভালো মানুষ হতে পারি। বই পড়ার মাধ্যমেই আমরা আদর্শ জাতি গঠন করতে পারি। এমন অভিপ্রায়েই আমার বইপোকা হয়ে উঠা", তিনি মনে করেন।

মধু মন্ডলের স্বপ্ন দেশের প্রতিটা জেলায় একটা করে বইপোকা করা। তার এলাকাতেও একটা বইপোকা করতে চান তিনি। 

shakibtahmid05@gmail