হ্যালোউইন আমাদের দেশের প্রচলিত কোনো অনুষ্ঠান না হলেও, ছোট থেকেই বিভিন্ন হলিউড মুভি ও সিরিজে হ্যালোউইন উদযাপন দেখে বড় হয়েছি আমরা। হ্যালোউইনের রাতে ছোট শিশুরা বিভিন্ন অদ্ভুত জামা-কাপড় পরে দলবেঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে "ট্রিক অর ট্রিট" বলে চকলেট চায়, চকলেট না পেলে সে বাড়ির দরজায় ডিম ছুঁড়ে মারে। তবে শুধু কস্টিউম ও ট্রিক অর ট্রিটের মধ্যেই হ্যালোউইন সীমাবদ্ধ নয়, এর রয়েছে বিচিত্র ইতিহাস।
সাধারণত আমরা মনে করি যে হ্যালোউইন একটি আমেরিকান ঐতিহ্য, তবে তা ভুল। যদিও এটি ভাবার কারণ রয়েছে এবং তা হলো হলিউডে হ্যালোউইনের অতিরিক্ত ব্যবহার।
প্রকৃতপক্ষে, হ্যালোউইনের উৎপত্তি হাজার বছর আগে কেল্টিক (বর্তমান স্কটিশ) স্যামহাইনদের উদযাপনে। এটি একটি উৎসব যা ফসল কাটার মৌসুমের সমাপ্তি এবং একটি নতুন বছরের শুরুতে পালন করা হয়।
স্যামহাইনের সময়, জীবিত এবং মৃতের জগতের মধ্যকার পর্দা খুলে যায় বলে মনে করা হতো এবং ভাবা হতো যে মানুষ তাদের মৃত প্রিয়জনদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। বর্তমানে বেশিরভাগ ইতিহাসবেত্তারাই একমত যে হ্যালোউইনের উদ্ভব হয়েছিল প্রায় ২০০০ বছর আগে, ইউরোপের কেল্টিকদের স্যামহাইনের মধ্য।
হ্যালোউইনের একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন আধ্যাত্মিক ইতিহাস রয়েছে। কেল্টিকরা বিশ্বাস করতো যে, স্যামহাইনের রাতে পুরোহিতরা বছরের অন্য দিনের তুলনায় সহজে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। সে রাতে দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য তারা বিশালাকার আগুন জ্বালাতো এবং সে আগুনে ফসল এবং পশু বলি দিতো।
গ্রামবাসীরাও পশুর মাথা এবং চামড়া দিয়ে পোশাক বানিয়ে সেই আগুনে অংশ নিতো এবং সেখান থেকেই হ্যালোউইনের কস্টিউমের ধারণা প্রথম আসে। বর্তমানে আমরা অনেকেই হ্যালোউইনের সাথে বাদুড় যুক্ত করি। বাদুড় হ্যালোউইনের প্রতীক ভাবি এবং এর ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে।
স্যামহাইনের সময় বিশালাকৃতির আগুন জ্বালানো হতো। সেই আগুনে পোকামাকড় আকৃষ্ট হয়ে এর কাছে আসতো। পোকামাকড় দেখে আকৃষ্ট হয়ে, ভুড়িভোজের জন্য আগুনের কাছে চলে আসত বাদুড়ও। তাই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন লোককাহিনীতে বাদুড়কে মৃত্যু বা সর্বনাশের দূত হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
কিছু পুরাণে বলা আছে যে বাড়িতে বাদুড় বাসা বাঁধে তাহলে সে পরিবারের একজন পুরুষ মারা যাবে। যদি বাদুড় বাড়ির ভেতরে ঢুকে হন্যে হয়ে ছুটাছুটি করে এবং বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করে, তবে পরিবারের একজন নারী সদস্য মারা যাবে।
প্রাচীন ইংল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের লোকেরা ভাবতো যে অক্টোবরের শেষের দিকে জীবিতদের মধ্যে মৃত আত্মারাও ঘুরে বেড়াতে থাকে। মৃতদের ক্ষুধার্ত আত্মাকে সন্তুষ্ট করার জন্য তারা ঘরের দরজায় রাতে খাদ্যসামগ্রী রেখে দিতো।
সময়ের সাথে এই প্রথা বদলে যেতে থাকে এবং মানুষজন নিজেরাই ভয়ংকর পোশাক পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার চাইতে থাকে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই খাবার চাওয়ার প্রথাকে "মামিং" বলা হয় এবং বর্তমানের ট্রিক অর ট্রিট এর উৎপত্তি এই মামিং থেকেই।
হ্যালোউইনের অনেক অদ্ভুতুড়ে কাজকর্মের মধ্যে আরেকটি হলো অবিবাহিত নারীদের জন্য স্বামী খোঁজা। ১৭০০ এবং ১৮০০ এর সময়, অবিবাহিত নারীরা স্বামী খুঁজে পাওয়ার আশায় হ্যালোউইনের রাতে কিছু প্রথা পালন করতো।
অবিবাহিত নারীরা তাদের কাঁধের উপর আপেলের খোসা ফেলতো, খোসাগুলো যে আকৃতিতে থাকতো সেখান থেকে ভবিষ্যত স্বামীর নামের প্রথম দেখতে পাবে বলে বিশ্বাস করা হতো।
নারীরা হ্যালোউইনের রাতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতো এবং বিশ্বাস করা হতো যে বিজয়ী নারীর সবার আগে বিয়ে হবে।
তবে হ্যালোউইন নিয়ে কথা বললে যা না বললেই নয় তা হলো জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন। নাম থেকে যদি না ও চিনা যায়, তবে আমরা সবাই-ই জিনিসটি চিনি। মিষ্টিকুমড়ো দিয়ে বানানো লন্ঠন। ১৯ শতকের মাঝামাঝি যখন ভয়াবহ আলুর দুর্ভিক্ষের সময় আইরিশ অভিবাসীদের একটি বড় অংশ তাদের দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেল তখন তারা জ্যাক-ও-ল্যান্টার্নসহ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং প্রথা নিয়ে এসেছিল। তারাই হ্যালোউইনের রাতে এই জ্যাক-ও-ল্যান্টার্নের সূচনা করে। তবে প্রাথমিক ভাবে শালগম, আলু এবং বীট থেকে লন্ঠন খোদাই করা হলেও সময়ের সাথে মিষ্টিকুমড়ো দিয়ে লন্ঠন খোদাই করা শুরু হয় এবং বর্তমানে আমাদের চিরচেনা সেই ভয়ংকর কুমড়ার আবির্ভাব ঘটে।
samiulhaquesami366@gmail.com









