আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধির দাবিতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে স্থানীয় ভোজ্যতেল পরিশোধক প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছে বারবার তেলের দাম বাড়ানোর অনুরোধ করেছে বলে জানিয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স এবং বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিভিওআরভিএমএ) এ বছর জুন ও নভেম্বর মাসে এবং এর মধ্যবর্তী সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম সমন্বয়ের আহ্বান জানালেও কোনো সাড়া পায়নি। ফলে ভোজ্যতেল শিল্প লোকসানের মুখে পড়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
সংগঠনটি মন্ত্রণালয়কে জানায়, উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম স্থানীয় বাজারে বেড়ে যাওয়ায় তেলের দাম বাড়ানো প্রয়োজন।
বিভিওআরভিএমএ আরও জানায়, মন্ত্রণালয় তাদের প্রস্তাবটি বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে পাঠিয়েছে মতামত ও সুপারিশের জন্য। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানান, তারা এখনো কোনো প্রস্তাব পাননি এবং এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রতি টন ছিল ৮২০-৮৫০ ডলার, যা গতকাল বুধবার (৪ ডিসেম্বর) প্রায় ৪৭ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ২২৫ ডলারে পৌঁছেছে।
ভোজ্যতেল পরিশোধক প্রতিষ্ঠানগুলো এ বছর এপ্রিল মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি করে। এ প্রেক্ষিতে গত ১৮ এপ্রিল সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ২-৪ টাকা বাড়ানো হয়।
এ সময়য় বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৬৩ টাকা থেকে ১৬৭ টাকায় উন্নীত করা হয়। এছাড়া খোলা সয়াবিন তেলের খুচরা মূল্য প্রতি লিটার ২ টাকা বৃদ্ধি করে ১৪৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
এ ছাড়া পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮১৮ টাকা করা হয়। পাম তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা। তবে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম আরও ৫-৬ টাকা বেড়ে যায়, যা অন্যান্য পণ্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে ভোক্তাদের জন্য অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রান্নার বাজারের ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, খোলা সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি লিটার ১৬৫-১৬৬ টাকায় এবং সুপার পাম তেলের দাম ১৫৮-১৬২ টাকায় পৌঁছেছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে আগামী বছর মার্চে রমজান মাসের সময় ভোজ্যতেলের সংকটের আশঙ্কা জানিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।
সংকট ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং সব বিভাগীয় কমিশনারকে মজুতদার ও মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে মোবাইল কোর্ট ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহায়তায় প্রস্তুতি নিতে পরামর্শ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় জানায়, বিভিন্ন প্রযোজক, আমদানিকারক এবং ডিলারদের সিন্ডিকেট সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ায় এবং নিজেদের ইচ্ছেমতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বার্ষিক ভোজ্যতেলের চাহিদা আনুমানিক ২. ৪-২. ৯ মিলিয়ন টন, যার ৯৫ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২. ৩ মিলিয়ন টন অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি করেছে।
ভোজ্যতেলের দাম কমানোর লক্ষ্যে সম্প্রতি সরকার সয়াবিন ও পাম তেলের আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ এবং ব্যবসায় ভ্যাট কমিয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয় দুইটি পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে ভোজ্যতেলের ভ্যাট মওকুফের ঘোষণা দেয়।
দেশীয় উৎপাদন ও ব্যবসার ক্ষেত্রে সয়াবিন ও পাম তেলের ওপর ভ্যাট মওকুফ করা হয়, আর আমদানি পর্যায়ে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। এই সুবিধাগুলো এ বছরের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
rezamumu@gmail.com



