জীবনযুদ্ধে সফল হওয়ার দৌড়ে অনেক সময়ই মানুষ হয়ে পড়ে বিষাদগ্রস্ত। বাইরের দুনিয়া হয়ে পড়ে তার জন্য অনাগ্রহের জায়গা। পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিক, কর্মক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশ, এমনকি পড়ালেখা এসবকিছু নিয়ে মানুষ অনেক সময় চরম হতাশার সম্মুখীন হয়। এসব কিছু ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক দুই ক্ষেত্রকেই প্রভাবিত করে। চরম হতাশায় যখন মানুষ মানুষের সাথেই যোগাযোগে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে, তখনই মানুষ খোঁজে ভিন্ন “মানুষ”। যে বিনা স্বার্থে প্রাণ খুলে তার পাশে থাকবে। যার আলতো ছোঁয়ায় কিছুটা হলেও কমবে দুশ্চিন্তা, হতাশা। মানুষের জীবনের এই চরম দুঃসময় ও নিঃশব্দে পাশে থাকে একটি পোষা বিড়াল। যার উপস্থিতিতে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও মানুষ ভুলে থাকে পৃথিবীর সকল ব্যর্থতার, সকল না পাওয়া গল্পকে। 

Advertisement

একটি বিড়ালকে রাস্তা থেকে বা কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে এনেই হোক অথবা অর্থ দিয়ে অন্য কোনো জাতের বিড়াল কিনেই হোক যেকোনো ভাবে একজন ব্যাক্তি বিড়াল পুষতে পারেন।

একটি পোষা বিড়াল তার সকল কাজকর্মের মাধ্যমে প্রতি মূহুর্তেই জানান দিতে থাকে যে সে আছে। তার আলতো ছোঁয়া বা তার লাফালাফিতে সে সব সময়ই মাতিয়ে রাখে ঘরকে। অনেক গম্ভীর মানুষও বিড়াল পোষে কোমল হৃদয়ে পরিণত হতে দেখা যায়।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিড়াল পোষার মাধ্যমে এবং বিড়ালের সাথে খেলাধূলার সময় অক্সিটোসিন ও ডোপামিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় যা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ও হাসি-খুশির অনূভুতি জাগায়। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শামস তারেক আজিজ একজন বিড়ালপ্রেমী। তিনি বলেন, “বিড়ালকে আমি আমার পরিবারের একজন সদস্যই ভাবি। প্রায়ই ক্লান্তিকর দিন শেষে বাড়ি ফিরে বিড়ালের যত্ন নিতে গিয়ে মানসিক ক্লান্তি দূর হয়। নতুন দিনের শুরুতে উজ্জীবিত হই।”

আরেকটি গবেষনায় দেখা গিয়েছে, বিড়াল পোষলে মানুষের একাকিত্ব দূর হয় এবং ব্যাক্তির স্ট্রেস কমে।বিড়ালকে খেতে দেওয়া, বাইরে হাঁটতে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি আরও দায়িত্বশীল হয়, তার মাঝে অনুপ্রেরণা কাজ করে। কিছুক্ষণের জন্য হলেও বিষাদ বেদনা ভুলে থাকা যায় বিড়াল পুষলে।

পোষ্য বিড়ালকে নিয়ে বাইরে হাটঁতে গেলে অনেক সময়ই দেখা যায়, অন্য আরেকজন বিড়ালপ্রেমী ব্যাক্তি বিড়ালটি আদর করতে এগিয়ে আসেন। ফলে সেই ব্যাক্তির সাথেও সখ্যতা গড়ে উঠে।

এর মাধ্যমে ব্যক্তির সামাজিকতা, দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয়। ব্যক্তির অন্যের সাথে একটু গল্প করা বা পার্কে হেঁটে বেড়ানো এসবকিছুই তার মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

তরুণ তরুণীদের পাশাপাশি বয়স্কও তাদের অবসর সময়ের সঙ্গী হিসেবে বিড়াল পোষে থাকেন। পঞ্চাশ বছর বয়সী বিড়ালের অভিবাবক গুল আক্তার জাহান তন্দ্রা জানান, ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলে সারাদিন একা বাসায় প্রায়ই একাকিত্ব অনূভব করতেন তিনি। এই জন্যই মূলত সময় কাটানোর উদ্যেশ্যে বিড়াল পোষা শুরু করেন।

তিনি বলেন, “রান্না করার সময় চুপ করে পাশে বসে সবকিছু নজর রাখে সে। আবার দুপুর বেলা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য দরজা একটু আটকালেই বাইরে থেকে মিউ-মিউ করে ডাকতে থাকে। মনে হয় যেন “মা, মা” করেই ডাকছে। আবার অনেক সময় আলতোভাবে গালে হাত বুলিয়ে দে সে।"

এভাবেই মায়ার বাধনে আটকে যান প্রত্যেক ক্যাট পেরেন্ট বা বিড়াল-পালক।

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, "প্রতি ওয়াক্তের নামাজ পড়ার জন্য উনার সাথে উনার পোষা বিড়ালটি মসজিদ পর্যন্ত আসে এবং নামাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে মসজিদের বাইরেই বসে অপেক্ষা করে। আবার নামাজ শেষ হলে উনার সাথে বাসায় ফেরে বিড়ালটি। এভাবেই সব সময়ের সঙ্গী হয়ে একাকিত্ব কাটায় উনার প্রিয় বিড়াল।"

শুধুমাত্র তরুণ তরুণী কিংবা বৃদ্ধরাই নয়, পোষা বিড়াল শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পোষ্য প্রাণীটিকে খাবার দেওয়ার মাধ্যমে শিশুর মধ্যে  দায়িত্ববোধ জন্মে। এছাড়াও বিড়ালের সাথে খেলাধুলার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সংবেদনশীল মনোভাব সৃষ্টি হয়।

এমনকি কর্মজীবি বাবা মায়ের সন্তানদের একাকিত্ব দূরীকরণ ও সঙ্গী হিসেবে একটি বিড়াল অনেক ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সুতরাং, সকল বয়সের সকল মানুষের একাকিত্ব কাটাতে ও জীবনের নানা হতাশা, পাওয়া না পাওয়া ও ব্যর্থতার চিত্র ভুলে থাকতে একটি পোষা বিড়ালের আলতো ছোঁয়া বা তার গোলগোল চোখের নিষ্পাপ চাহনিই যথেষ্ট।

নাওশিন মুশতারী,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বিভাগে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী। 

nawshinmushtary38@gmail.com