অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ‘ব্লু নেটওয়ার্ক প্রোগ্রাম’ বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে বিশ্বব্যাংক। ঢাকার আশেপাশের সব নদী, খাল ও ড্রেনেজ চ্যানেলগুলো পুনরুজ্জীবিত করা এবং সেগুলো সংরক্ষণ করা এই প্রকল্পের লক্ষ্য।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পয়ঃনিষ্কাশন এবং পানি নিরাপত্তার জন্য একটি সমন্বিত পরিবেশগত ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। এটি বাংলাদেশের অন্যতম উচ্চাভিলাষী নগর-সহনশীলতা প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া প্রথম ধাপের জন্য প্রয়োজনীয় এক বিলিয়ন ডলারের প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থ এই ঋণ থেকে আসবে।
এই বৃহৎ উদ্যোগটি ২০৪০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং এতে মোট ৮ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিশ্বব্যাংকের এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ঢাকা মহানগরের পানি অবকাঠামো রূপান্তরের প্রচেষ্টার প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার পুনঃপ্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এক সময় বাণিজ্য ও পরিবহনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত ঢাকার নদীগুলো বর্তমানে দখল, দূষণ এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে জর্জরিত, ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ শহুরে জলাবদ্ধতা এবং পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইআরডি-এর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকার ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ প্রোগ্রামও প্রস্তাব করেছে, যার আওতায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নীতিগত কাঠামো এবং প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং ৫০ মিলিয়ন ডলার টেকনিক্যাল সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
"এই প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে, বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে একটি কনসেপ্ট প্রোগ্রাম ইনফরমেশন ডকুমেন্ট (পিআইডি), একটি খসড়া পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থা মূল্যায়ন (ইএসএসএ), এবং অন্যান্য প্রাথমিক কাগজপত্র প্রকাশ করেছে," বলেন ওই কর্মকর্তা।
ইআরডি জানায়, বিশ্বব্যাংকের রেয়াতি ঋণ প্রদানকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) থেকে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার আসতে পারে, তবে প্রথম ধাপের বাকি অর্থ এখনও নিশ্চিত হয়নি।
কর্মকর্তারা জানান, ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হবে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন সেবার সার্বজনীন প্রাপ্যতা, বন্যা ও খরার ঝুঁকি হ্রাস, এবং টেকসই জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
প্রকল্পের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে—পানীয় জলের সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন সেবা, স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ, এর পাশাপাশি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং খাল পুনর্বাসনের মতো সহায়ক ব্যবস্থা।
বিশ্বব্যাংকের কনসেপ্ট পেপারে ঢাকার জলসংকটের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। নগর ও শিল্পাঞ্চলগুলো দৈনিক বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ও বিষাক্ত বর্জ্য নদী ও খালে ফেলে, যা দূষণ, পলি জমা এবং প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শহরের ঝুঁকি বাড়ছে, এবং পানি প্রবাহ হ্রাস ও দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বন্যার আশঙ্কাও বেড়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ এবং শীতলক্ষ্যা নদীতে প্রতিদিন আনুমানিক ১,৫০০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য, ২,৪০০ মিলিয়ন লিটার শিল্পবর্জ্য এবং ১০,০০০ টন কঠিন বর্জ্য ফেলা হয়। এর ফলে একসময়ের প্রাণবন্ত নদীগুলো এখন কার্যত উন্মুক্ত নর্দমায় পরিণত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সেবায় ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে।
যেখানে ঢাকার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকায় পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ হচ্ছে, সেখানে আশেপাশের শহরগুলোতে এই হার ২৫ শতাংশেরও কম। এছাড়া, দূষিত ভূগর্ভস্থ পানির উপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা এবং সীমিত পরিশোধন সুবিধার কারণে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ঢাকায় পয়ঃনিষ্কাশন কাভারেজ মাত্র ২০ শতাংশ, এবং সঠিক ফিকাল স্লাজ ব্যবস্থাপনার আওতায় রয়েছে মাত্র ২ শতাংশ পরিবার।
আশেপাশের শহরগুলোতে নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন সেবার প্রাপ্যতা আরও কম। বিশ্বব্যাংকের মতে, দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে পানি দূষণ বাড়ছে, এবং সেই দূষণ ও জলাবদ্ধতা আবার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সেবার স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।
ব্লু নেটওয়ার্ক প্রোগ্রামটি স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি) এর নেতৃত্বে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে পরিচালিত হবে।
বাস্তবায়নে অংশ নেবে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসা।
গত বছর এই উদ্যোগটি প্রথম উন্মোচন করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিস্তারিত অঞ্চল পরিকল্পনা (ডিএপি) ২০২২-২০৩৫ অনুযায়ী, এই ১৫ বছর মেয়াদি কর্মসূচির লক্ষ্য হলো ঢাকার জলপথগুলো পুনরায় সংযুক্ত করা এবং প্রাকৃতিক ড্রেনেজ পুনর্বহাল ও পানির গুণগত মান উন্নয়নের মাধ্যমে বন্যার ঝুঁকি কমানো।
যদি এই কর্মসূচিটি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি নগর জল-ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। পাশাপাশি, ঢাকার নদীগুলোকে দূষিত বর্জ্যনদী থেকে রূপান্তরিত করে টেকসই, সহনশীল এবং অর্থনৈতিক কার্যকলাপের প্রাণসঞ্চারক জলপথে পরিণত করতে পারে।











