কালে কালে চিত্রকলার নতুন নতুন নানান ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে। বালুচিত্র বা স্যান্ড পেইন্টিং বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত একটি চিত্রকর্ম। বালুকে কাজে লাগিয়ে যে চিত্রকর্ম তৈরি করা হয় তাই মূলত স্যান্ড পেইন্টিংস বা স্যান্ড আর্ট।

Advertisement

সমুদ্রসৈকতে বালুতে তৈরি করা নানান ভাস্কর্য, চিত্র, ফুল, মানুষের মাথা এসবই কিন্তু স্যান্ড পেইন্টিং বা বালুচিত্র। তবে স্যান্ড পেইন্টিংসের যে ক্ষেত্রটি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে তা হচ্ছে এনিমেশন স্যান্ড পেইন্টিং।   

অনেকেই হয়তো আজই প্রথম এই নামটি শুনলেন। সমুদ্রসৈকতে গেলেই আমরা বসে যাই বালুতে। আর শুরু হয়ে যায় আমাদের শিল্পকর্ম। বালুতে ফুল, পাহাড়, নদী, মানুষের মুখের অবয়ব তৈরি এসব অতি পরিচিত হলেও এনিমেশন স্যান্ড পেইন্টিং বিষয়টি সকলের মধ্যে ওতটা পরিচিত হয়ে ওঠেনি এখনও।

এনিমেশন স্যান্ড আর্ট মূলত বালুচিত্রের সম্প্রাসারিত একটি চিত্রকর্ম। এনিমেশন স্যান্ড পেইন্টিং লাইট বক্সের উপর কাচ বসিয়ে তার উপর বালু ব্যবহার করে হাত বা টুথপিকের সাহায্যে ছবি আঁকা এবং সেটিকে দৃশ্যমান করাকে বুঝায়।

প্রথম এই চিত্রকর্মটি শুরু করেছিলেন ১৯৬৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ক্যারোলিন লিফ তার “স্যান্ড অর পিটার অ্যান্ড দ্য উলফ” চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। তবে শুধুই ছবি নয় এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এই চিত্রশিল্পটি অর্থপূর্ণ হয়ে থাকে।

অর্থাৎ পেইন্টিংটি দর্শনার্থীদের কোনো না কোনো সময়ের ঐতিহাসিক বা ট্রেজেডিক কোনো অধ্যায়ের কাহিনী বলে। যুদ্ধের ভয়াবহতা কিংবা প্রানীকূলের প্রতি মানুষের বর্বরতার মতো নানান চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয় এই বালুচিত্রে।

বালুচিত্রের অন্তঃর্নিহিত অর্থ সম্পূর্ণই নির্ভর করে শিল্পীর উপর যে উনি কি বুঝাতে চান তার চিত্রকর্মের মাধ্যমে। স্যান্ড আর্টিস্টদের মধ্যে পরিচিত কয়েকজন হলেন ইসরাইলি শিল্পী ইলানা ইয়াহাভ। তিনি তার ইউটিউব চ্যানেলে স্যান্ড পেইন্টিং ভিজুয়ালাইজের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।

সারা বিশ্বে তার মতো আরও কয়েকজন স্যান্ড আর্টিস্ট আছেন। ২০১৯ সালে “ব্রিটেন গট ট্যালেন্ট" ইউক্রেনীয় স্যান্ড আর্টিস্ট কেসেনিয়া সিমোনোভা তৃতীয় স্থান অর্জন করেন যার মাধ্যমে তিনি সারা বিশ্বে সাড়া ফেলেছিলেন।  

স্যান্ড পেইন্টিংসের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন হয় একটি কাঠের তৈরি লাইটবক্সের। এর উপর স্বচ্ছ পৃষ্ঠের উপর বালু ব্যবহার করে ছবি আঁকা হয়। এক্ষেত্রে হাত অথবা টুথপিকের সাহায্যে এই চিত্রকর্মটি করা হয়ে থাকে।

বালুচিত্র অংকনের জন্য এক বিশেষ ধরনের মিহি বালু প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে স্যান্ড আর্টিস্টদের সংখ্যা খুবই কম। তবে বাংলাদেশে জীবন রায়কে স্যান্ড পেইন্টিং এর অগ্রদূত বলা হয়। তিনিই প্রথম ২০১৯ “আইসক্রিম” চলচ্চিত্রের সাহায্যে এই ধারার আর্ট সকলের সামনে তুলে ধরেন।

বাংলাদেশে স্যান্ড পেইন্টিং অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়। এর কারণ হচ্ছে বালুর দুষ্প্রাপ্যতা। স্যান্ড পেইন্টিংয়ের জন্য মিহি পলিমুক্ত বালু বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের বালুতে প্রচুর পরিমাণে পলি হয়ে থাকে।

স্যান্ড পেইন্টিংয়ের জন্য মরুভূমি ও মালদ্বীপের বালু সবচেয়ে বেধি উপযোগী। তাই বিদেশ থেকে এই বালু নিয়ে আসা একটি কঠিন কাজ। এতসব বাধার পরও জীবন রায় তার পছন্দের জায়গা থেকে এটিকে পেশা হিসেবে গ্রহন করেছেন এবং তার বিদেশি বন্ধুদের সহায়তায় তিনি এই কঠিন কাজটি সম্পাদন করে যাচ্ছেন। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে স্যান্ড আর্টিস্টদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

তরুণ-তরুণীরা তাদের আগ্রহের জায়গা থেকে ফেইসবুক, ইউটিউবের মাধ্যমে এই চিত্রকলাটি শিখছেন। এমনই একজনের সাথে কথা হয় যিনি জীবন রায়ের ফেইসবুক পেইজ থেকে এই আর্টটি শিখেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে এখনো চিত্রকলাটি এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি, তবে যদি প্রতি বছর কিছু প্রদর্শনী করা যায় তাহলে মানুষের মধ্যে এটি পরিচিতি হবে।” 

স্যান্ড পেইন্টিং হিসেবে সমুদ্রসৈকতে মানুষের চেহারা অংকন বেশ পরিচিত হলেও এনিমেশন স্যান্ড পেইন্টিং এর ধারণাটি একটু নতুন। সম্প্রতি বিরাট কোহলির জন্মদিনে একজন ভক্ত সমুদ্রসৈকতে বালু দিয়ে তার মুখচিত্র অংকন করেন যেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এছাড়াও বালুর সাথে আঠা ব্যবহার ব্যবহার করে নানান ভাস্কর্য, চিত্রকর্মও দেখা যায়।

ফুল, পাতা, পশুপাখির ছবি, দূর্গ এসবই তার বিষয়বস্তু। কিন্তু এই এনিমেশন স্যান্ড পেইন্টিংটি ব্যতিক্রম। অনেক সময় বালু আর্টিস্ট রঙিন বালুও ব্যবহার করে থাকেন। লাল,নীল, সবুজ রঙের এই বালুর দামও বেশি হয়ে থাকে এবং অঙ্কনের ক্ষেত্রে আলোর সামঞ্জস্য রক্ষার্থে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।

nawshinmushtary38@gmail.com