শৈশবের কথা মনে পড়লেই প্রথমে কী মাথায় আসে? কেমন ভাবে কেটেছে শৈশবের দিনগুলো? স্মৃতির ভান্ডারে শৈশবের সাথে কত কিছুই অতিযত্নে তোলা থাকে। যেমন, শৈশবের খেলাধুলা, মা-নানি-দাদির কাছ থেকে রাতের বেলা গল্প শোনা ইত্যাদি।

তবে এগুলো ছাড়াও আরেকটি বিষয় আমাদের শৈশবের সাথে ওতপ্রতোভাবে জড়িত সেটি হচ্ছে কার্টুন। শহর কিংবা গ্রামে বেড়ে উঠা যেকোনো শিশুই তার শৈশবের কোনো না কোনো সময় কোনো না কোনো কার্টুন দেখেছে।
সারাদিনের অনেকটা সময় কাটিয়েছে কার্টুনগুলো দেখে। কার্টুনের প্রতিটা চরিত্র, প্রতিটা সংলাপ সবকিছু যেন আমাদের স্মৃতির ডায়েরিতে আজও সতেজ। বিশেষ করে, ৯০ এর দশক কিংবা একুশ শতকের শুরুর দিকে যাদের জন্ম তাদের বেশিরভাগেরই শৈশব কেটেছে মিনা কার্টুন, ঠাকুরমার ঝুলি, টম অ্যান্ড জেরি, ডরেমোন দেখার মাধ্যমে।
শহুরে জীবনে বেড়ে উঠা একটি শিশু চাইলেই গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে উঠা একটি শিশুর মতো বাইরে গিয়ে খেলতে পারে না। তাই শহরে বেড়ে উঠা একটি শিশুর জন্য তার বিনোদনের মাধ্যম টেলিভিশন কিংবা কম্পিউটার গেইম। তাই দেখা যায়, শিশু তার শৈশব থেকেই বিভিন্ন ধরনের গেইম এবং কার্টুনের সাথে পরিচিত থাকে।
আবার গ্রামে বেড়ে উঠা একটি শিশু চাইলেই বাইরে গিয়ে খেলতে পারলেও টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হওয়া কার্টুনের প্রতি তার ঝোঁক মোটেও কিন্তু কম থাকে না।
আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের একটি সন্তানই হোক কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান শৈশবে কার্টুন দেখার শখ যেন সবার ক্ষেত্রে সমান।
বিখ্যাত একটি টেলিভিশন বিজ্ঞাপন হয়তো অনেকেরই মনে থাকবে, যেখানে একটি বাসায় টিভিতে টম অ্যান্ড জেরি সম্প্রচারিত হলে দুই ভাই-বোন প্রতিদিন লুকিয়ে লুকিয়ে জানালার বাইরে থেকে কার্টুনটি উপভোগ করে এবং একদিন হঠাৎ করে আরেকটি শিশু ভিতর থেকে জানালা লাগিয়ে দেয়। এই হৃদয় নাড়ানো বিজ্ঞাপনটি থেকে শৈশবে কার্টুন দেখার প্রতি শিশুদের কতটা ঝোঁক থাকে তার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়মিত সম্প্রচারিত হওয়া মিনা কার্টুনের প্রতিটি কাহিনী হয়তো অনেকেরই এখনও স্পষ্ট মনে আছে। প্রথম মিনা কার্টুন প্রচারিত হয় ১৯৯৩ সালে। এছাড়াও টিয়া পাখি মিঠুর কণ্ঠে “মাইয়্যাগো যত্ন নাও, মাইয়্যাগো যত্ন নাও”, মিনার “আমিও ইস্কুলে যাইতে চাই” এর মতো সংলাপ থেকে শুরু করে রিতা, লালি, গ্রামের মোড়ল, অসৎ দোকানদার, মুরগি চোর, দাদি, স্কুলের বড় আপাসহ সকল চরিত্র আমাদের এখনও স্মৃতির পাতায় অম্লান।
এমনকি মিনা কার্টুনের প্রতিটা পর্বই শিক্ষনীয় বিষয় নিয়ে তৈরি। প্রথমে শুধু কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিতে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে এই কার্টুন সম্প্রচারিত হলেও ধীরে ধীরে তা সকল শিশুর অধিকার, সমান সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তার দিকে দৃষ্টি দেয় এবং এই সংক্রান্ত পর্ব প্রচারিত হতে থাকে। মিনা কার্টুনের প্রতিটা পর্বেই শিশুর নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ও চিন্তা চেতনা জাগ্রত করার চেষ্টা করা হয়। এছাড়াও বাল্যবিবাহ ও যৌতুক এবং এটি প্রতিরোধেও নানা সচেতনতামূলক বিষয় এই কার্টুনে দেখানো হয়। মূলত শিশুদেরকে শৈশব থেকেই তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে এবং বিনোদনের মাধ্যমে হলেওনেতিবাচক বিষয় সম্পর্কে অবহিত করাই এই কার্টুনের উদ্যেশ্যে ছিল।
মিনা কার্টুনের মতো জাপানিজ কার্টুন ডোরেমনও অত্যন্ত বিখ্যাত একটি কার্টুন। ভীতু স্বভাবের নবিতার সাথে রোবট ডোরেমনের বন্ধুত্ব ছিল কার্টুনের একটি অত্যন্ত সুন্দর বিষয়। এছাড়াও কার্টুনটি তার গল্পের মাধ্যমে শিশুদের নানান ধরনের শিক্ষনীয় বিষয় সম্পর্কে অবগত করে। শিশুকে আত্নবিশ্বাসী করা এবং ইতিবাচক বিকাশে এই কার্টুনটি তৈরি করা হয়।
ডোরেমন কার্টুনের সিজুকা, বুদ্ধিমান ডেকিনস্কি চরিত্র নিশ্চয়ই এখনও অনেকে মনে রেখেছেন। ডোরেমনের “এনিহোয়ার ডোর”এর মাধ্যমে যেকোনো জায়গায় মুহুর্তেই চলে যাওয়ার দৃশ্য কিংবা “বেম্বোকাপ্টার” লাগিয়ে যেকোনো জায়গায় ওঠে চলে যাওয়ার মতো বিস্ময়কর ব্যাপার শৈশবে প্রত্যেক শিশুকে একবার হলেও তা উপভোগ করার ইচ্ছা জাগিয়েছে।
এই কার্টুনের প্রভাব ঠিক কতটুকু ছিল তা তখনকার সময়ে প্রত্যেকটি ঘরে ঘরে “বাম্বোকাপ্টার” খেলনাটি দেখেই উপলব্ধি করা যায়।
এই কার্টুনগুলোর পাশাপাশি ঠাকুরমার ঝুলি ঝুলির লাল পাড়ের সাদা শাড়ি, কপালে লাল টিপ আর শাখা সিদুঁর পরা সেই ঠাকুরমার ঝুলি কথা অনেকেরই নিশ্চয়ই মনে আছে। প্রতিদিন নতুন নতুন কাহিনী নিয়ে আসতেন গোলগাল চেহারার হাসিখুশি ঠাকুরমার আর অত্যন্ত নাটকীয়তার সাথে গল্প বলতেন তিনি নাতিপুঁতিদের। আর গল্পের শেষের “আমার গল্প ফুরালো, নটে গাছটাও মরলো” এই কথাটা যেন আজও কানে বাজে অনেকেরই। ভূত, শাকচুন্নি, মেছোভূতসহ আরও নানান চমকপ্রদ গল্প নিয়ে আসতেন শৈশবের প্রিয় এই ঠাকুঁমা।
শৈশবের আরেক জনপ্রিয় কার্টুন টম অ্যান্ড জেরি। কোনো প্রকার কথা ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা যেত এই কার্টুন চালিয়ে। বিড়াল আর ইঁদুরের চিরাচরিত শত্রুতা আবার প্রয়োজনে বন্ধু হয়ে যেকোনো প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে উঠা আবার কুকুর ও তার ছানার স্নেহের দৃশ্যগুলো আজও অনেককেই বিমোহিত করে।
উপরে কার্টুনগুলোর প্রতিটা দৃশ্য, প্রতিটা মুহূর্ত ৯০ দশকে কিংবা একুশ শতকের শুরুতে জন্ম নেয়া ছেলে-মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি অনুভব করতে পারবে। কেননা, সেই সময়ে বাংলাদেশে এতো বেশি টেলিভিশন চ্যানেল ছিল না এবং স্বাভাবিক ভাবেই হাতে গোনা কয়েকটি কার্টুন সম্প্রচারিত হতো।
তখনকার সময়ে বাইরে খেলাধুলার পাশাপাশি বিনোদন ও সময় কাটানোর জন্য এই কার্টুনগুলো চাহিদার শীর্ষে থাকতো। তবে এখন যুগ অনেক পালটেছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে সারা বিশ্বের অসংখ্য কার্টুন এখন শিশুদের সামনে। তারা অতি সহজেই টেলিভিশন, ইউটিউব, নেটফ্লিক্সের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে তৈরি হওয়া কার্টুন তাদের পছন্দমতো তালিকায় আনতে ও দেখতে পারে। বিশেষ করে জাপানিজ অ্যানিমেশন মুভি ও সিরিজগুলো বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ক্ষেত্র।
বর্তমানে শিশুদের মধ্যে ডিজনি, ফ্রোজেনসহ গিবলি স্টুডিওজের সিরিজ ও মুভিগুলোই বেশি জনপ্রিয়। বাংলা কার্টুন তাদের তালিকায় নেই বললেই চলে। এমনটাই বলেছেন ছয় বছর বয়সী নুসরাত। তাকে তার পছন্দের কার্টুন কোনটা জিজ্ঞেস করা হলে সে বলে, তার প্রিয় কার্টুন “ডোরা, দ্যা এক্সপ্লোরার”।
ডোরেমন ও টম অ্যান্ড জেরির সাথে সে কিছুটা পরিচিত হলেও ঠাকুরমার ঝুলি কিংবা মিনা কার্টুন সে চেনে না বললেই চলে।
আট বছরের নাওয়ার জানান, তার প্রিয় কার্টুন “বেন টেন” এবং ঠাকুরমার ঝুলির কথা জিজ্ঞেস করা হলে এ বিষয়ে কিছুই জানে না বলে জানায় সে।
বাংলাদেশে মিনা কার্টুন কিংবা ঠাকুরমার ঝুলির মতো কার্টুনগুলোর সম্প্রচার বর্তমানে কমে গিয়েছে। এমনকি ২০১২ সালে ডোরেমনের হিন্দি সম্প্রচারও বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে, বর্তমান আলফা প্রজন্ম এই কার্টুনগুলোর সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। এর পরিবর্তে বিভিন্ন দেশের অ্যানিমেশন মুভি কিংবা সিরিজের প্রতি ঝুঁকেছে তারা।
নাওশিন মুশতারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী।
nawshinmushtary38@gmail.com



