Loading...
The Financial Express

আফগান যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের ‘পাহাড় সমান’ অর্থ যোগাতে হয়েছে

| Updated: April 19, 2021 20:48:59


১৯৯৮ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে মার্কিন দূতাবাসে আল কায়দার হামলা। ১৯৯৮ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে মার্কিন দূতাবাসে আল কায়দার হামলা।

দীর্ঘ ২০ বছর পর আমেরিকান এবং ব্রিটিশ সৈন্যরা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

এ মাসেই প্রেসিডেন্ট বাইডেন ঘোষণা করেছেন যে প্রায় ২৫০০ থেকে ৩৫০০ মার্কিন সৈন্য আফগানিস্তানে এখনো রয়েছে, তারা ১১ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে যাবে। একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিটেন। তাদের অবশিষ্ট ৭৫০ জন সৈন্যও একই সময়ে আফগানিস্তান থেকে চলে আসবে।

সব সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য যে দিনটি ঠিক করা হয়েছে তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ২০ বছর আগে ঐ দিনই আল কায়েদা আমেরিকায় সন্ত্রাসী হামলা চালায় যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল আফগানিস্তানে। ঐ হামলার নেতৃত্বও দেয়া হয় সেখান থেকে।

ঐ সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এক কোয়ালিশন আফগানিস্তানে হামলা চালিয়ে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করে। আল কায়েদাকেও সাময়িকভাবে সেদেশ থেকে বিতাড়িত করে।কিন্তু গত ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে সামরিক এবং নিরাপত্তা তৎপরতার জন্য বিশেষ করে আমেরিকাকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।

এখন পর্যন্ত আফগান যুদ্ধের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের পাহাড় সমান, প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার, অর্থ যোগাতে হয়েছে।

তালেবানদের উৎখাত করতে ২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তারা জানায়, তালেবানরা ওসামা বিন লাদেন এবং অন্য আল-কায়েদা নেতাদের লালন করেছে যারা ৯/১১ এর হামলার সাথে জড়িত ছিল।

আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের সংখ্যা বাড়ে কারণ ওয়াশিংটন তালেবানদের অভ্যুত্থান ঠেকানোর জন্য এবং তহবিল পুনর্গঠনের জন্য হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করে।

মার্কিন সরকারের হিসাব বলছে, ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে দেশটিতে এক লাখ মার্কিন সেনা ছিল, যার কারণে বছরে যুদ্ধের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ বিলিয়ন ডলার।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের লক্ষ্য সরাসরি সামরিক অভিযান থেকে সরিয়ে আফগান বাহিনীকে প্রশিক্ষণে বেশি মনোনিবেশ করার পর ব্যয় বেশ কমে আসে।

২০১৬ থেকে ২০১৮ সালে বার্ষিক ব্যয় নেমে দাঁড়ায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাবে জানা যায়, এ বছর ব্যয় হয়েছে ৩৮ বিলিয়ন ডলার।

আফগান সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে মার্কিন সেনারা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের হিসাব মতে, ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক ব্যয় হয়েছে ৭৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এর সাথে, মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি এবং অন্য সরকারি সংস্থাগুলোর সাথে মিলে ৪৪ বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন ধরণের পুননির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় করেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী সব মিলিয়ে ২০০১ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৮২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়েছে।

কিন্তু এতে পাকিস্তানে যে ব্যয় হয়েছে তার হিসাব ধরা হয়নি যাকে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালানোর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির যুদ্ধ প্রকল্পের ব্যয় বা কষ্ট অব ওয়্যার প্রজেক্ট নামে এক স্বতন্ত্র গবেষণায় দাবি করা হয়, আফগান যুদ্ধে ব্যয়ের যে সরকারি হিসাব দেখানো হয়েছে তা যথেষ্ট কম দেখানো হয়েছে।

এতে বলা হয় যে, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের জন্য কংগ্রেস এক ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ তহবিল অনুমোদন করেছে।

এই প্রকল্পের সহ-পরিচালক নেটা ক্রফোর্ড বলেন, "এই ব্যয়ের মধ্যে যুদ্ধ ফেরত সেনাদের জন্য করা ব্যয়, যুদ্ধ সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য সরকারের বিভিন্ন বিভাগে যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে এবং সংঘর্ষে অর্থায়নের জন্য নেয়া ঋণের সুদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।"

এসব কিছু যোগ করা হলে ব্যয় অন্তত দুই ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়াবে, তিনি বলেন।

অর্থ কোথায় ব্যয় করা হয়েছে?

বেশিরভাগ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে জঙ্গি বিরোধী অভিযানে এবং মার্কিন সেনাদের জন্য বিভিন্ন ব্যয় যেমন খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা সেবা, বিশেষ ভাতা এবং অন্য সুবিধার যোগান দিতে।

সরকারি তথ্যে দেখা যায়, গত ১৭ বছরে আফগানিস্তানে যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে তার ১৬ শতাংশ বা প্রায় ১৩৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে পুননির্মাণ প্রচেষ্টায়।

এবং এর অর্ধেক ব্যয় করা হয়েছে আফগান নিরাপত্তা বাহিনী বাহিনী যেমন আফগান জাতীয় সেনাবাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর পুনর্গঠনে।

বাকি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে মূলত শাসন এবং অবকাঠামো বিনির্মাণ, অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তা এবং মাদক বিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণে।

২০০২ সাল থেকে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাদক বিরোধী প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গড়ে দিনে ১.৫ মিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্র ব্যয় করেছে।

কিন্তু জাতিসংঘের হিসাব বলছে, ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি এলাকা জুড়ে আফিমের পপি চাষ করা হয়েছে।

২০১৭ সালে, পুনর্নির্মাণ প্রকল্প পর্যবেক্ষন করে এমন মার্কিন সংস্থাসমূহ বলছে, গত ১১ বছরে ১৫.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নষ্ট হয়েছে, "অপচয়, জালিয়াতি এবং অপব্যবহারের কারণে"।

তবে এই সংখ্যাটিও অপচয় হওয়া অর্থের "একটি অংশ মাত্র" বলে উল্লেখ করেছে তারা।

তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ "প্রায় ক্ষেত্রেই সংঘাত বাড়িয়েছে, দুর্নীতির জন্ম দিয়েছে এবং জঙ্গিবাদে সমর্থন জুগিয়েছে।"

এখন পর্যন্ত ২৩০০ মার্কিন সেনা আফগানিস্তানে মারা গেছে। জখম হয়েছে ২০,০০০। সেই সাথে ৪৫০ জন ব্রিটিশ সৈন্য মারা গেছে। আরো কয়েকটি দেশের কয়েকশ সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে দুই দশকের এই যুদ্ধে।

তবে এই যুদ্ধে বহুগুণ বেশি হতাহত হয়েছে আফগানরা। আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর ৬০ হাজারেরও বেশি সদস্য মারা গেছে। সাধারণ বেসামরিক আফগানের মৃত্যুর সংখ্যা তার দ্বিগুণ।

সুতরাং অপ্রিয় হলেও এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে এই প্রাণহানি আর বিপুল অর্থ খরচের আদৌ কি কোন প্রয়োজন ছিল? তবে এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর মেলা শক্ত।

প্রথমত দেখতে হবে যে কেন পশ্চিমা দেশগুলো আফগানিস্তানে গিয়েছিল? কি লক্ষ্য তারা অর্জন করতে চেয়েছিল?

১৯৯৬ থেকে পরের পাঁচ বছর ধরে ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে আল কায়েদা আফগানিস্তানে গেড়ে বসেছিল। সেখানে তারা সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তোলে। কুকুরের ওপর বিষাক্ত গ্যাসের পরীক্ষা শুরু করে। বিভিন্ন দেশ থেকে কম-বেশি ২০,০০০ জিহাদি স্বেচ্ছাসেবী জোগাড় করে আফগানিস্তানে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়। ১৯৯৮ সালে আল কায়েদা কেনিয়া এবং তাঞ্জানিয়াতে মার্কিন দূতাবাসে সন্ত্রাসী হামলা চালায় যাতে ২২৪ জন নিহত হয়।

আল কায়েদা সে সময় আফগানিস্তানে কোনো বাধা ছাড়াই তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারছিল, কারণ তাদের পেছনে সমর্থন ছিল ক্ষমতাসীন তালেবানের যারা সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পর শুরু হওয়া রক্তাক্ত এক গৃহযুদ্ধে জয়ী হয়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে।

যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র সৌদি আরবের মাধ্যমে তালেবানকে রাজী করানোর চেষ্টা করে তারা যেন আল কায়েদাকে আফগানিস্তান থেকে তাড়ায়। কিন্তু তালেবান তা প্রত্যাখ্যান করে। ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর সন্দেহভাজনদের ধরে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আমেরিকা এবং তার মিত্র দেশগুলো তালেবানকে চাপ দেয়। তখনও তা মানতে অস্বীকার করে তারা।

এরপর আমেরিকান এবং ব্রিটিশ সৈন্যদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় নর্দার্ন আ্যালায়ান্স নামে তালেবান বিরোধী একটি আফগান মিলিশিয়া গোষ্ঠী অভিযান চালিয়ে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করে। আল কায়েদা পালিয়ে পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে আশ্রয় নেয়।

নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা সূত্রগুলো এ সপ্তাহে বিবিসিকে বলেছে তারপর থেকে বিশ্বের কোথাও একটিও সফল কোন সন্ত্রাসী হামলা হয়নি যার পরিকল্পনা হয়েছে আফগানিস্তানে। ফলে, শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস-বিরোধী তৎপরতার বিবেচনায় আফগানিস্তানে পশ্চিমা সামরিক এবং নিরাপত্তা তৎপরতা কাজে দিয়েছে।

Share if you like

Filter By Topic

-->