Loading...
The Financial Express

করোনাকালে অন্দরের পূজা

| Updated: October 13, 2021 18:04:59


ছবি -  সংগৃহীত ছবি - সংগৃহীত

‘পূজো, পূজো, পূজোয় প্রেমের গন্ধ লেগেছে’ এ গানটি কানের কাছে বেজে ওঠার সাথে সাথেই মনে হয় পূজা কবে আসবে। পূজাকে ঘিরে সবার জল্পনা কল্পনা শুরু হয় আরো মাসখানেক আগে থেকেই।

বাঙালির সবচেয়ে বড় পূজা শারদীয় দুর্গোৎসব; নিঃসন্দেহে এটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় পুজা হলেও কালের পরিক্রমায় নানা ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এটি সার্বজনীন রুপ লাভ করেছে।

পূজার প্রস্তুতি নিয়ে করোনা অতিমারীর আগের এবং বর্তমানের চিত্রে বেশ বড়সড় পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। করোনাবিহীন জীবনে শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা, জনসমাগম ও শোভাযাত্রা করা হতো। সেই সাথে মন্ডপে মন্ডপে গান, চন্ডীপাঠ, আরতি, ভক্তদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন আর কোলাকুলি, প্রণাম, আশীর্বাদ, ইত্যাদি দুর্গাপূজাকে আরো আনন্দঘন ও রোমাঞ্চকর করে তুলতো।

কিন্তু এখন পূজার অনুষ্ঠানাদি সীমিত পরিসরে যথাযথ নির্দেশনা মেনে করা হচ্ছে। চিরচেনা পূজার রূপ এখন ভিন্ন। প্রিয় মানুষজনের সাথে হুট করেই মন্ডপে দেখা, মূহুর্তগুলোকে ক্যামেরাবন্দী করা, খাওয়া দাওয়া, রাত পর্যন্ত ঘোরাঘুরিটা হচ্ছে না আর।  

পূজার সাথে যেমন অনেক আবেগ জড়িয়ে থাকে, তার সাথে জড়িয়ে থাকে অনেক মানুষের জীবিকা। প্রতিমাশিল্পী ও কারিগরদের মাঝেও চরম হতাশা তাই। কারণ আগের মতো প্রতিমার জন্য বায়না আসে না, যা আসে তা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা কষ্টসাধ্য। বর্তমানে জীবনযাপনের সর্বক্ষেত্রেকরোনা’ও‘লকডাউন’- এ শব্দ দুটো যুক্ত হয়েছে।

২০২০ সালের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় সংক্রমণ থেকে বাঁচতে অনেকেই ঘরোয়া পরিবেশে পূজার আয়োজন করেছে। তাও সেখানে মানুষের সংখ্যা সীমিত। পূজার আগে গিয়ে ঘুরে ঘুরে শপিং করা সবাই মিলে- সেটাও হয়ে ওঠেনি। সব কেনাকাটা অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়েছে।

যেখানে পূজার দিনগুলো ঘটা করে সেজেগুজে পরিবার বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে সন্ধ্যা থেকে রাতগুলো জমে যেতো, সেই উদযাপন কিছুটা মলিন এখন। সেই সাথে কমেছে আলোর রোশনাই আর জাঁকজমকপূর্ণ সাজসজ্জা।

করোনার কারণে পূজায় যেটির অনুপুস্থিতি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় সেটি হলো ঢাকের শব্দ আর ধুনুচি নাচ। এ দুটো আয়োজন ছাড়া পূজা যেন উৎসব বলেই মনে হয় না।

ঘরে বসে তাই ঢাক ও শাঁখের শব্দের স্বাদ পেতে ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত কিছু গান  সাউন্ডবক্সে চালিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর চেষ্টা করেন অনেকে। কিন্তু ধুনুচি তো আর করা হয়না, সেই সাথে ধূপের গন্ধটাও পাওয়া হয়না। ষষ্ঠী থেকে দশমীর জন্য কার সাথে কার সাথে ঘোরা হবে সেই পরিকল্পনাও করা হয়ে ওঠে না।

ঘরোয়াভাবে সবাই মিলে নতুন জামা-কাপড় পড়ে ঠাকুরকে আর গুরুজনদের প্রণাম জানানো হয় অন্দরেই। তারপর সবাই যে যার মতো ঘরোয়া পূজার সাজে, ঘরেই সকলের সাথে কয়েকটা ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে ক্যাপশন দিয়ে দেওয়া হয়করোনাকালীন বা লকডাউনময় পূজা।’

পূজার আরো কিছু সুন্দর বিষয় আছে যা করোনার মাঝে করা হয়ে ওঠেনি। যেমন, দশমীতে মন্ডপে লাল পাড় সাদা শাড়ি পড়ে আর যাওয়া হয়না, অঞ্জলি নেওয়া হয়না। অঞ্জলি নেওয়াটাও এখন ঘরে বসে অনলাইনে সম্পন্ন হয়। অঞ্জলি নেওয়া হয়ে গেলে আবির খেলাটাও যেন নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে মনের কোণে উঁকি দেয়।

একুশ শতকে এসেও বাঙালি নিজের ঐতিহ্যকে ভুলে যায়নি, বিজয়ার দিনে বড়দেরকে প্রণাম করতেও তাই ভুল হয় না। করোনাকালীন সময়ে সকলেই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, টুইটারে সবার সাথে কুশল বিনিময়ে মেতে উঠেছে ঘরে বসেই। এ যেন করোনাকালীন সময়ে কুশল বিনিময়ের নতুন মাত্রা।

সবার মনেই চাপা একটা দুঃখ- কবে আবার পূজা ফিরবে তার আসলে রুপে। ঢাক বাজবে,কাসর বাজবে, মন্ডপে ধুনুচি নাচ হব আর মায়ের আরতি হবে সবাই মিলে। করোনার কারণে পূজার সব রং যেন মলিন হয়ে গেছে ভক্তদের কাছে। সকল মনে একই আশা, আসছে বছর পূজা ফিরবে তার চিরচেনা রূপে।

লাবণ্য ভৌমিক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ৪র্থ বর্ষে অধ্যয়নরত

[email protected]

Share if you like

Filter By Topic