Loading...
The Financial Express

নানা দেশের ইফতারনামা

| Updated: April 23, 2021 20:16:08


ছবিঃ ইন্টারনেট ছবিঃ ইন্টারনেট

বিশ্বের প্রায় ১৬০ কোটি মুসলমানের পরম আরাধ্য মাস রমজান। রমজানে রোজা পালনের মাধ্যমে ফুটে ওঠে ইসলামের অন্যরকম এক সৌন্দর্য। সাহরীর মাধ্যমে শুরু করে আর ইফতারে শেষ করার মাধ্যমে একজন রোজাদার ব্যক্তি স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করেন। হোক একটি খেজুর বা একগ্লাস পানি, ইফতারের মাধ্যমেই রোজাদাররা পান পরম তৃপ্তি।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) অধিকাংশ সময় ভেজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তা না থাকলে শুকনো খেজুর বা খুরমা, আর পানি দিয়ে ইফতার করতেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার করে থাকেন। সময়ের পরিক্রমায় দেশে দেশে ইফতারে এসেছে নানা পরিবর্তন।

বাংলাদেশে মুসলমানরা নানা ধরনের সুস্বাদু ও বাহারি খাবার দিয়ে ইফতার করেন। পৃথিবীর  অন্যান্য দেশের মুসলমানরাও ইফতারে করে থাকেন নানা আয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইফতারের খবর নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন।

সৌদি আরব

এটি মুসলমানদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর দেশ। যে কারণেই হয়তো দেশটিতে ইফতারে থাকে বিশেষ আয়োজন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিসরে ইফতার আয়োজন হয় এখানে। মসজিদ-আল-হারাম ও মসজিদ-এ নববীতে এ আয়োজন হয়।

লাখো মানুষ এ ইফতারে যোগ দেয়। ইফতারের সময় সৌদি আরবের সব দোকানপাট বন্ধ থাকে। সৌদি আরবের জনপ্রিয় ফল খেজুর। আর তাই ইফতারিতে তাদের খেজুর, খেজুরের বিস্কুট, পিঠা ইত্যাদি থাকবেই। সাথে কোনাফা, ত্রোম্বা, বাছবুচান্ডর নামক নানা রকম হালুয়া থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ফল ও ফলের শরবত, জাবাদি (দই), সরবা (স্যুপ), লাবান, বোরাক (মাংসের পিঠা), খবুজ (ভারি ছোট রুটি) বা তমিজ (বড় রুটি), মানডি (মুরগি ও ভাত দিয়ে তৈরী এক ধরনের খাবার), ভেড়া বা মুরগির মাংস দিয়ে তৈরি খাবসা, সালাতা (সালাদ) ইত্যাদি থাকে।

ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যার দেশ। ফলে রমজান মাসে ইফতারকে কেন্দ্র করে দেশটিতে থাকে নানা আয়োজন। এ দেশে ইফতারকে বলা হয় ‘বুকা’। ইন্দোনেশিয়ায় ইফতারের সময় বেদুক বাজানো হয়, যা অনেকটা আমাদের দেশের সাইরেনের মতো। এটি দেশটির নিজস্ব সংস্কৃতিরই একটি অংশ।

ইফতারে ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার কোলাক। দুধ ও চিনি দ্বারা তৈরী কোলাক মিষ্টি জাতীয় খাবার। এটি ছাড়া যেন ইন্দোনেশিয়ায় ইফতার অপূর্ণই থেকে যায়। ইন্দোনেশিয়ায় ইফতারে সাধারণত বিভিন্ন ফল এবং ফলের রস থাকে। এখানকার অধিবাসীরা সাধারণত তেল ও মসলা জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলেন। তাদের ইফতারে সেদ্ধ চাল দিয়ে তৈরী কিস্যাক, সোতো পাং কং, পাকাথ (সবজি বিশেষ) নামের খাবারগুলো থাকে।

মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়ানরা সাধারণত খেজুর বা শুকনো খাবার দিয়ে ইফতার শুরু করেন। তবে ইফতারে তাদের সবচেয়ে পরিচিত খাবার হলো আখের রস ও সয়াবিনের দুধে তৈরী বারবুকা পুয়াসা; যেটি এক ধরনের মিষ্টি খাবার। এর বাইরে তারা লেমাক লাঞ্জা, আয়াম পেরিক, পপিয়া বানাস, নাসি আয়াম ইত্যাদি স্থানীয় বিভিন্ন খাবার ইফতারে থাকে।

ইফতারে দেশটির মসজিদগুলোতে বিনামূল্যে নারকেল, দুধ, চাল, মাংস, ঘি দ্বারা তৈরি বুবুর ল্যাম্বাক নামের এক বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হয়। প্রায় ৫০ বছর ধরে এ খাবার বিতরণের সংস্কৃতি চালু আছে। এর শুরু হয়েছিল কুয়ালামপুরের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে।

পাকিস্তান

ইফতারে পাকিস্তানিদের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার রুটি ও মাংস। তবে খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার শুরু করার প্রচলন আছে। এছাড়াও ইফতারে তাদের উল্লেখযোগ্য খাবারগুলো হলোঃ বিভিন্ন ফল ও ফলের সালাদ, ফালুদা, জুস, রোল, টিক্কা, শামি কাবাব, ঘিলাফি কাবাব, নুডলস কাবাব, তান্দুরি কাটলেট, সফিয়ানি বিরিয়ানি, জিলাপি, সমুচা, নিমকি ইত্যাদি।

মিসর

মুসলিমপ্রধান দেশ মিশরে রোজার মাসে ইফতার নিয়ে মুসলমানদের মাঝে অন্যরকম আয়োজন লক্ষ্য করা যায়। সাধারণত পানি ও খেজুর দিয়ে শুরু করলেও ইফতারে মিসরীয়দের প্রধান খাবার হচ্ছে আটা, মধু, কিশমিশ ও বাদাম দিয়ে তৈরী কেকজাতীয় কোনাফা ও কাতায়েফ।

তাছাড়াও ইফতারে মিসরীয়রা ককটেল খুশাফ, মলোকিয়া, কামার আল দিনান্দ আরাসি ইত্যাদি খাবার খেয়ে থাকে। রমজান উপলক্ষে চাঁদ আকৃতির খাবোস রমজান নামের একটি রুটিও তারা খায়।

তুরস্ক

তুরস্কে ইফতারের জনপ্রিয় খাবার রমজান কিবাবি নামের এক ধরনের কাবাব। এছাড়াও আটা কাজুবাদাম, আখরোট ও মধু দিয়ে তৈরী সিলুলি নামের মিষ্টিরও বেশ কদর রয়েছে। এর বাইরে তুর্কিরা ইফতারে পাস্তিরমা, খেজুর, জলপাই, পাইড রুটি, পনির, সসেজ, ফলমূল, সবজি ও মধু, স্যুপ খেয়ে থাকেন।

আফগানিস্তান

পৃথিবীর অন্যতম যুদ্ধ কবলিত মুসলিম দেশ আফগানিস্তান। তারপরও রমজান ও ইফতার নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই তাদের। আফগানরা ইফতার শুরু করেন খেজুর দিয়ে। ইফতারে অনেক আফগান পুঁইশাক, আলু ও অন্যান্য সবজি দিয়ে ইফতার করে থাকে্ন। এছাড়াও তারা ইফতারে কাবাব, স্যুপ, রুটি, পেঁয়াজু, মাংস, বিভিন্ন সতেজ বা শুকনো ফল, জুস ও ফলের সালাদ খান।

ইরাক

ইরাকে মুসলমানদের বাড়ির খোলা আঙিনা বা ছাদে ইফতার করতে দেখা যায়। তারা গরু, মহিষ বা ছাগলের দুধ দিয়ে ইফতার শুরু করেন। পাশাপাশি খেজুর ও নানা ধরনের শরবত খেয়ে থাকেন। কাবাব, মুরগির মাংস দিয়ে তৈরী নাওয়াশিফ, বিস্কুট, ক্লেইচা খুবই জনপ্রিয়।

ইফতারে ইরাকের মুসলমানরা বিশেষ ধরনের দুধের তৈরী মাহলাবি নামের মিষ্টান্ন খেতে পছন্দ করেন। এ তো গেল বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান দেশের ইফতারের খবর। এবার আসা যাক অন্যান্য ধর্মপ্রধান দেশের ইফতারের গল্পে।

ভারত

বিশাল জনসংখ্যার দেশ ভারত হিন্দুপ্রধান হলেও দেশটিতে মুসলমানদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। প্রায় সব রাজ্যেই রয়েছে মুসলমানরা। ফলে আলাদা আলাদা রাজ্যে ইফতার নিয়ে রয়েছে পৃথক পৃথক সংস্কৃতি। যেমন, পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতার ইফতার অনেকটা বাংলাদেশের মতোই। ছোলা বুট, আলুর চপ, পেয়াজু, বিভিন্ন ধরনের ফল ও ফলের জুস, খেজুর, চিকেন শর্মা, বটি কাবাব, কাটলেট ইত্যাদি দিয়ে কলকাতায় ইফতার হয়। এর বাইরে কলকাতায় ইফতারে কাবাবের প্রচলন আছে।

এছাড়া কেরালা ও তামিলনাড়ু রাজ্যের মুসলমানরা ননবো কাঞ্জি নামক একটি খাবার দিয়ে ইফতার করেন। ভাত, খাসির মাংস, সবজি ও মসলা দিয়ে তৈরী এই খাবার অত্যন্ত সুস্বাদু। এর সাথে তারা বন্ডা, পাকুড়া খেয়ে থাকেন। হায়দ্রাবাদে ইফতারের প্রধান খাবার হালিম।

আমেরিকা

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তার শাসনের সময় রমজান মাসে হোয়াইট হাউসে ইফতারের আয়োজনের প্রচলন শুরু করেন। তা এখনো প্রচলিত আছে। এই ইফতারে বিভিন্ন দেশের মুসলমান প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। আমেরিকায় ইফতারে মুসলমানরা খুরমা-খেজুর, রুটি, পনির, সালাদ, মাংস, ইয়োগার্ট, হট বিনস, ডিম, স্যুপ, চা ইত্যাদি গ্রহণ করে থাকেন।

স্পেন

স্পেন একসময় মুসলমান অধ্যুষিত দেশ ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেখানে মুসলমানের সংখ্যা পাঁচ শতাংশেরও কম। দেশটিতে মুসলিমরা ইফতারে লাম্ব কোফতা, হামাস, শর্মা, কাবাব, আলা তুরকা, আনারস, সালাদ ইত্যাদি খেয়ে থাকেন।

এছাড়াও যুক্তরাজ্যে রোজাদাররা ইফতারে খেজুর, বিভিন্ন ধরনের ফল ও ফলের জুস, স্যুপ, রুটি, ডিম, মাংস, চা-কফি ইত্যাদি খেয়ে থাকেন। বার্গার জাতীয় খাদ্য, বিভিন্ন ধরনের ফল দিয়ে ইফতার করেন ইতালির মুসলমানরা। অস্ট্রেলিয়ায় মুসলমানরা ইফতার করেন পনির, মাখন, স্যান্ডউইচ, দুধজাতীয় খাবার, নানাবিধ ফল ও ফলের জুস দিয়ে। জাপানে জুস, স্যুপ, মাশি মালফুফ (আঙুর, বাঁধাকপির পাতা ও চাল দিয়ে তৈরি), কিবদা (মটরশুঁটি ও গরুর কলিজা দিয়ে তৈরি), মাংসের কিমা ইত্যাদি দিয়ে ইফতারের কথা শোনা যায়।

ফরহাদুর রহমান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত।

[email protected]

Share if you like

Filter By Topic

-->