Loading...
The Financial Express

যানজট কমাতে ৩১ কোটি টাকায় বানানো ইউ-টার্নগুলো যানজট আরও বাড়াচ্ছে

ভেঙে ফেলার কথা ভাবছে নগর কর্তৃপক্ষ


| Updated: May 15, 2022 11:36:41


যানজট কমাতে ৩১ কোটি টাকায় বানানো ইউ-টার্নগুলো যানজট আরও বাড়াচ্ছে

যানজট কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৩১ কোটি টাকা খরচ করে ঢাকার রাস্তায় বানানো ‘ইউ-টার্ন’গুলোর অধিকাংশই কাজে আসছে না; চালু হওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় এর কয়েকটি ভেঙে ফেলার কথা ভাবছে নগর কর্তৃপক্ষ।

ব্যস্ত বিমানবন্দর সড়কে গাড়ি ঘোরাতে গিয়ে জট পাকানোর সমস্যা কমিয়ে আনতে বানানো হয়েছিল ১০টি ইউ-টার্ন। বলা হয়েছিল, রাস্তার এক পাশ দিয়ে চলতে থাকা গাড়ি এই ইউ-টার্ন ব্যবহার করে ঘুরে অন্য পাশে যেতে পারবে, তাতে যানবাহনের স্বাভাবিক প্রবাহতে বিঘ্ন ঘটবে না। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না জানিয়ে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, কয়েকটি ইউ-টার্ন যানজট আরও বাড়াচ্ছে, এর কারণ মূলত নকশায় ত্রুটি এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাব। 

দশটির মধ্যে উত্তরার হাউজবিল্ডিং এবং জসিমউদ্দিন রোডের ইউ-টার্ন এরই মধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) নির্মাণ কাজের জন্য।

মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে এবং চেয়ারম্যানবাড়ির ইউ-টার্নের মহাখালীর দিকে ঘোরার অংশ ব্যবহার করছে না গাড়িগুলো। তেজগাঁও লাভ রোড, মহাখালীর আমতলী, বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি, সৈনিক ক্লাব এবং কাকলী সিগন্যালেই যানবাহন ঘোরানো হচ্ছে।

আনিসুল হক ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র থাকার সময় যানজট কমাতে রাজধানীর সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউ-টার্ন নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ২০১৫ সালের শেষে দিকে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠায় উত্তর সিটি।

কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর ২০২১ সালে কাজ শেষ হয়। ২০২১ সালের এপ্রিলে সাতরাস্তা, কোহিনূর কেমিকেল মোড়, মহাখালী বাস টার্মিনাল, মহাখালী ফ্লাইওভার, বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি, বনানী কবরস্থান, বনানী ওভারপাস, কাওলা, উত্তরার র‌্যাব-১ অফিসের সামনের সড়ক এবং জসিম উদ্দিন সড়কের সামনের ১০টি ইউ-টার্ন চলাচলের জন্য খুলে দেয় সিটি করপোরেশন। একটি ইউ-টার্ন আর নির্মাণ করা হয়নি।

এসব ইউ-টার্নের কার্যকারিতা যাচাইয়ে গত ১১ এপ্রিল একটি কমিটি গঠন করে দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। সেই কমিটির সদস্যরা গত ১৮ এপ্রিল ইউ-টার্নগুলো ঘুরে দেখেছেন, তবে এখনও প্রতিবেদন দেননি।

তবে কিছু ইউ-টার্ন যে বাতিলের খাতায় যাচ্ছে, উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের কথায় তা স্পষ্ট।

তিনি বলেন, “ইউটার্নগুলো কিছু জায়গায় কাজে আসছে না। যেসব জায়গায় সড়ক চওড়া সেখানে কাজ করছে।ইউ-টার্নের কারণে আমাদের কী বেনিফিট আসছে তা আমরা দেখছি এখন। যে ইউ-টার্নের বেনিফিট আছে, সেখানে সেটা থাকবে। যেগুলো কাজে আসছে না, সেগুলো আমরা ভেঙে ফেলব।”

ব্যস্ত কাকলী মোড়ে যানজটের মূল কারণ গুলশান-বনানীর গাড়ির চাপ। মহাখালীর দিক থেকে আসা উত্তরগামী গাড়ি সোজা চলে যেতে পারলেও গুলশান যেতে হলে কাকলী মোড়ে সিগন্যালে অপেক্ষা করতে হয়। আবার গুলশানের দিক থেকে আসা গাড়ি উত্তরার দিকে যেতে চাইলে সিগন্যালে এক পাশের রাস্তা বন্ধ রাখতে হয়। 

এই ঝামেলা এড়াতে চেয়ারম্যানবাড়ি এবং নেভি হেড কোয়ার্টারের সামনে দুটি ইউ-টার্ন বানিয়ে কাকলী ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সড়ক বিভাজক তুলে। মহাখালী থেকে বনানী, গুলশান যেতে নেভি হেড কোয়ার্টারের সামনের ইউ-টার্ন ব্যবহার করতে হত। আর বনানী থেকে উত্তরার দিকে যেতে চাইলে প্রথমে বাঁয়ে ঘুরে মহাখালীর দিকে এগিয়ে  তারপর চেয়ারম্যানবাড়িতে ইউ-টার্নে ঘুরে তারপর উত্তরার দিকে যেতে হত।

বৃহস্পতিবার সেখানে গিয়ে দেখা গেল, দুটি ইউ-টার্ন আর ব্যবহার করা হচ্ছে না। কাকলী, চেয়ারম্যানবাড়ি এবং সৈনিক ক্লাব সিগন্যালের সড়ক বিভাজক তুলে নেওয়া হয়েছে। আগের মতই কাকলী ক্রসিং দিয়ে বিমানবন্দর সড়ক থেকে যানবাহন চলে যাচ্ছে গুলশান, বনানীর দিকে।

সেখানে দায়িত্বরতে ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট মোহাম্মদ মুসা বললেন, গুলশানগামী যানবাহনের চাপ অনেক বেশি থাকে। নেভি হেডকোয়ার্টারের সামনের ইউটার্ন ঘুরে এলে সেখানে গাড়ির ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। এ কারণে গত রোজায় ওই তিন জায়গায় বেড়া তুলে নেওয়া হয়েছে।

“যতদূর শুনেছি ইউ-টার্নগুলো তুলে নেওয়া হবে। এগুলো যানজট নিয়ন্ত্রণে খুব একটা কাজে আসেনি।”

একই সুরে কথা বললেন এ সড়কে চলাচলকারী সদরঘাট-কোনাবাড়ী রুটের আজমেরী গ্লোরি পরিবহনের চালক মো. হারুনুর রশিদ। তার ভাষায়, ইউ-টার্ন হওয়ার পর যানজট আরও বেড়েছে।

“দেখেন, ওইখানে গিয়া রাস্তা বাম দিকে চাইপা গেছে। আর বাম দিক থেইকা গাড়ি আইসা ডান দিকে ইউ টার্ন নিতে চায়। ওই সময় সোজা যারা যামু, তারা যাইতে পারি না। গাড়ির জট লাইগা যায়।”

ঢাকায় অনস্ট্রিট পার্কিং ব্যবস্থা উপযুক্ততার সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ডিএনসিসি নির্মিত ইউটার্নগুলো কার্যকর হচ্ছে কিনা তা পরীক্ষায় গঠিত কমিটির সভা হয় গত ১১ এপ্রিল। স্থানীয় সরকার বিভাগে ওই সভায় ঢাকা উত্তর সিটি, রাজউক, ঢাকা মহানগর পুলিশ, বুয়েট, সওজ, দক্ষিণ সিটির প্রতিনিধিরা ছিলেন।

সভার কার্যপত্রে বলা হয়েছে, রাজউক, বুয়েট এবং পুলিশের প্রতিনিধিরা ইউ-টার্নের নকশায় ত্রুটি, ব্যাসার্ধ কম থাকাসহ নানা কারণে সেগুলো যানজট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মত দিয়েছেন।

ইউ-টার্নগুলো কার্যকর হচ্ছে কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানাতে একটি উপকমিটি গঠন করা হয় সভায়। ওই উপ কমিটি গত ১৮ এপ্রিল ইউ-টার্নগুলো পরিদর্শন করে।

কমিটির সদস্য বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ইউ-টার্নগুলোর নকশায় ত্রুটি আছে। ইউ-টার্নের এলাকায় সড়ক যতটা প্রশস্ত হওয়া দরকার, এখানে তা নেই।

“সাধারণ নিয়মে ইউ-টার্নের আগে রাস্তা দুই লেইনের হলে ইউ-টার্নে এসে তিন লেইন হবে। যে গাড়িগুলো ইউ-টার্ন করবে, ওই অতিরিক্ত লেইন দিয়ে সেগুলো আলাদা হয়ে যাবে। ফলে ইউ-টার্নে ঘোরার পর সেগুলো অন্য গাড়ির চলাচলে সমস্যা করবে না।

“কিন্তু আমাদের এখানে যে ইউ-টার্নগুলো করা হয়েছে, সেখানে বাড়তি একটা লেইন রাখা হয়নি। তাতে ইউ-টার্নে গাড়িগুলো ঘুরে বেরিয়ে এসে সোজা রাস্তা ধরে চলা যানবাহনের সামনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।”

সাইফুন নেওয়াজ বলেন, মিডব্লক ইউ-টার্নের নিয়মে দুই লেইনের রাস্তায় মেজর লেনের সঙ্গে আলাদা একটা লেন থাকে। কারণ ইউ-টার্নে যারা ঢুকবে, তারা অন্য কোনো গাড়ির চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করে ডানে চলে যাবে। তবে ঢাকায় তা করা হয়নি।

“ঢাকার প্রতিটি ইউ-টার্নে দেখা যাচ্ছে, রাস্তা ওই জায়গায় এসে সরু করে ফেলা হয়েছে। রাস্তা ভেতরের দিকে না দিয়ে বাইরের দিকে, পেটটা মোটা করে ফেলা হয়েছে। এটা করতে গিয়ে বাঁ পাশের ফুটপাত ছোট করা হয়েছে। এ কারণে গাড়িগুলো প্রথমে বাঁয়ে টার্ন নিয়ে পরে আবার ডানে যেতে হচ্ছে। যারা সোজা যাবে, তাদের আরও বাঁয়ে চাপিয়ে দিচ্ছে ইউ-টার্ন নেওয়া গাড়িগুলো, তাতে চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।”

 

Share if you like

Filter By Topic