Loading...
The Financial Express

রসিক রাজা গোপাল ভাঁড় কি সত্যিই ছিলেন?

| Updated: May 05, 2021 14:02:43


রসিক রাজা গোপাল ভাঁড় কি সত্যিই ছিলেন?

পণ্ডিতমশাই একবার মহারাজের কাছে তার ছেলের বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়ে বললেন- “আপনার ছেলে মোটেই লেখাপড়া করছে না! পড়ার সময় এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। আর লেখাপড়ায় মাথা একেবারেই ঘামায় না। তখন রাজা পণ্ডিতকে বলেন- “এরপর যখন ও পাঠশালায় যাবে, তখন বেশ কষে কান টানবেন। মহারাজের কথা শুনে গোপাল সঙ্গে সঙ্গেই বলল- “আপনি যথার্থই বলেছেন, কারণ কান টানলেই মাথা আসে।” একথা শুনে তখন রাজসভার সবাই উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। 

বলছি গোপাল ভাঁড়ের কথা। বর্তমানে দেশে যে কয়টি কার্টুন জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে, তার মধ্যে গোপাল ভাঁড় অন্যতম। এই কার্টুনের প্রধান চরিত্র হচ্ছে গোপাল, যাকে নিয়ে প্রচলিত আছে বহু গল্পকথা। যে কিনা একসময় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় ভাঁড় হিসেবে নিয়োজিত ছিল। রাজসভার যেকোনো সমস্যার সমাধান ও অন্য রাজ্যের রাজাদের ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে গোপাল যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিত, তার সাথে অন্য কারো্র জুড়ি মেলা কঠিন। তবে অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এই গোপাল শুধুই একটি কাল্পকাহিনী নয়, বরং এটি অষ্টাদশ শতকের একটি ঐতিহাসিক চরি্ত্র। 

কে এই গোপাল? 

তৎকালীন ভারতবর্ষের নদীয়া জেলার একজন প্রতাপশালী শাসক ছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। কৃষ্ণচন্দ্র ১৭২৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন এবং ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত প্রায় দীর্ঘ ৫৫ বছর তার রাজত্ব স্থায়ী হয়। যদিও তিনি ১৭৫৭ সালে ঐতিহাসিক পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের পক্ষে অবস্থান করার কারণে ইতিহাসে নিন্দিত, তবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহিত্যানুরাগী। ধারণা করা হয়, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজ্সভায় যে পাঁচজন গুণী ছিলেন, গোপাল তারই একজন। এ বিষয়ে অজিতকুমার ঘোষ তারবঙ্গসাহিত্যে হাস্যরসের ধারা’ বইতে লিখেছেন, “গোপাল রসিক চূড়ামণি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভার ভাঁড়  ছিলেন।” 

গোপালের বংশপরিচয়

কথিত আছে, গোপালের পুরো নাম গোপাল চন্দ্র নাই। তার পিতা দুলাল চন্দ্র নাই এবং প্রপিতা-মহ আনন্দরাম নাই। যেহেতুনাই’ মানে নাপিত, তাই ধারণা করা হয়, গোপাল ভাঁড়ের পূর্বপুরুষরা ছিলেন জাতিতে নাপিত। তবে দুলালচন্দ্র ছিলেন নবাব আলীবর্দি খাঁর শল্য চিকিৎসক। তৎকালীন শল্য চিকিৎসা নাপিত জাতির কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সুবাদে দুলাল চন্দ্র এ কাজের দায়িত্ব পান। আবার নবদ্বীপ কাহিনীতে নগেন্দ্রনাথ দাস বলেছেন, “গোপালরা ছিলেন দুই ভাই। ১ম জন কল্যাণ আর দ্বিতীয় জন গোপাল।” তবে গল্পে গোপালের মা ও স্ত্রীর বর্ণনা থাকলেও এ বিষয়ে ঐতিহাসিকরা কোনো প্রমাণ খুঁজে পাননি। 

পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি 

গোপাল ভাঁড় কি আসলেই ছিলেন, নাকি এটি শুধুই একটি কাল্পনিক চরিত্র; এ নিয়ে রয়েছে নানা তর্ক-বিতর্ক। 

গোপাল ভাঁড় একটি বাস্তবিক চরিত্র- এ বিষয়ে একটি যুক্তি প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালে হোমশিখা পত্রিকায়। সেখানে অধ্যাপক মদনমোহন গ্বোসামীগোপাল ভাঁড়ের নামে প্রচলিত গল্পসমগ্র’ নামক একটি লেখনীতে বলেন, “শোনা যায়, মহারাজের (কৃষ্ণচন্দ্র) সভায় আরেকটি রত্ন ছিলেন- তিনি স্বনামধন্য রামসাগর গোপাল।” 

তবে এ বিষয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি দাঁড় করান নগেন্দ্রনাথ দাস। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত তাঁরনবদ্বীপ কাহিনী’ পুস্তকে তিনি নিজেকে গোপালের বংশধর দাবি করেন। তিনি তার গ্রন্থে বলেন, “মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র গোপালের গুণে মুগ্ধ হইয়া তাঁহাকে গোয়াজী কৃষ্ণনগরে নিয়ে যান। গোপাল অতি সুপুরুষ ও বাল্যকাল হইতে সুচতুর ও হাস্যোদ্দীপক বাক্যাবলী প্রয়োগে বিশেষ পটু ছিলেন। মহারাজ বিক্রমাদিত্যের ন্যায় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রেরও একটি পঞ্চরত্নের সভা ছিল। মহারাজ কৃষ্ণ গোপালের প্রত্যুৎপন্নমতি ও বাকপটুতা দেখিয়া তাঁহাকে স্বীয় সভার অন্যতম সদস্য পদে নিযুক্ত করেন।” 

তিনি আরো বলেন, “গোপালের দুই পুত্র ও এক কন্যাসন্তান ছিল। দুই পুত্র হচ্ছেন রমেশ ও উমেশ এবং কন্যার নাম ছিল রাধারানী। তবে বহুদিন হল সেই বংশ লোপ পেয়েছে।” শেষে নগেন্দ্রনাথ বলেন, গোপালের বংশ লোপ পেলেও তিনি তার ভাই কল্যাণের নবম অধস্তন। 

নগেন্দ্রনাথের এমন বক্তব্যের পর পন্ডিতরা অনেক প্রশ্নই তুলেছেন। যেমন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র 

তাঁর সভার অন্যতম ব্যক্তিদ্বয় কবি ভারতচন্দ্র ও সংগীতজ্ঞ রামপ্রসাদ; এই দু’জনকে জমি দান করলেও গোপালকে করেননি কেন? এ প্রসঙ্গে আরেকটি যুক্তি হলো, কবি ভারতচন্দ্র তার বিখ্যাত অন্নদামঙ্গল কাব্যে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর রাজসভার অন্য সবাইকে নিয়ে লেখলেও গোপাল সম্পর্কে কেন কিছু লেখলেন না? এছাড়া পণ্ডিতরা আরো প্রশ্ন তোলেন, গোপালদের বংশনাই’ হলে নগেন্দ্রনাথ সেই বংশের উত্তরাধিকারী হয়ে তার পদবীদাস’ কেন? 

এতসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ২০১৪ সালে লেখক সুজিত রায় ৩০০ পৃষ্ঠার একটি বই লেখেন, ‘গোপাল ভাঁড়ের সন্ধানে’ নামে। বইটিতে তিনি গোপাল ভাঁড়ের সম্পত্তির বিষয়ে বলেন, “গোপাল সম্ভবত হাত পাততে জানতেন না। হয়তো সে কারণেই গোপাল মহারাজের দাক্ষিণ্য বঞ্চিত হয়েছেন।” তিনি আরো বলেন, “রমেশ-উমেশের মৃত্যুর মাধ্যমে যেহেতু গোপালের প্রত্যক্ষ বংশধররা লুপ্ত হয়ে যায়, সুতরাং জমিজমার নথিপত্র কী হয়েছে, তা কে বলতে পারে?” এছাড়াও তিনি ভারতচন্দ্রের লেখায় গোপালের উল্লেখ না থাকা প্রসঙ্গে বলেন, “ঈর্ষা আর আত্মপ্রচারের বাগাড়ম্বরে তিনি (ভারতচন্দ্র) গোপাল ভাঁড়ের মতো বিরল প্রতিভাকে নিঃশব্দে বর্জন করেছেন।” 

 আর নগেন্দ্রনাথের বংশপরিচয়দাস’ কেন, এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন নগেন্দ্রনাথের বর্তমান প্রজন্ম, যারা বাস করেন কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিটের রাধাপ্রসাদ লেনে। তারা বলেন, “নগেন্দ্রনাথ নিজেই তার পারিবারিক পদবী পরিবর্তন করেছিলেন।” 

গোপালের অস্তিত্ব একসময় ছিল, এ বিষয়ে আরেকটি যুক্তি হলো, কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সাথে গোপালের একটি তৈলচিত্র ঝোলানো আছে। যদিও সেটি নিয়ে পণ্ডিতরা অনেক সন্দেহ ব্যক্ত করেছেন। 

কিছু কিছু ঐতিহাসিকের মতে, গোপাল ভাঁড় তার অসামান্য বুদ্ধিমত্তা দিয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে নবাব সরকারের অনেক বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। এছাড়াও গোপাল ছিলেন বিদ্যাচর্চায় খুবই তুখোড়। ভগবত ও পুরাণে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। রামায়ণ-মহাভারত ছিল তার পুরোপুরি মুখস্থ। তখনকার সমসাময়িক বিষয়গুলোতেও গোপাল অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। গোপাল ছিলেন চরিত্রবান ও ধর্মপরায়ণ একজন ব্যক্তি। আর গোপালের বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে ভাণ্ডারী উপাধি দেন। পরে এইভান্ডারী’ কথাটিই অপভ্রংশের মাধ্যমে একসময় ভাঁড় হয়ে যায় এবং গোপাল ভাঁড় নামে পরিচিতি পায়। 

গোপালকে নিয়ে প্রচলিত কিছু গল্প 

এতসব তর্ক-বিতর্ক ছাড়াও গোপালকে নিয়ে প্রচলিত আছে কিছু ঐতিহাসিক গল্প। এমনই একটি গল্প হচ্ছে, ১৭৫৭ সালের দিকে যখন সবাই নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। আর তখন এতে যোগ দেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রও। যদিও গোপাল অনেককবার রাজাকে ইংরেজদের পক্ষে যেতে নিষেধ করেছেন, কিন্তু রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একটি শর্তে তা মানার ঘোষণা দেন। আর সেটি হল গোপাল যদি মুর্শিদাবাদে গিয়ে নবাবকে মুখ ভেংচি দিয়ে আসতে পারেন, শুধুমাত্র তখনই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তার অবস্থান থেকে সরে আসবেন। রাজা ভেবেছিলেন, গোপাল এমনটা করতে পারবেন না। কিন্তু গোপাল ঠিকই রাজি হয়ে যান। আর নিজের কথা রাখতে গোপাল যখন মুর্শিদাবাদে নবাবের প্রাসাদের সামনে গিয়ে উপস্থিত হন, সেসময় প্রহরীরা তাকে আটকায়। কিন্তু অনেক কষ্টে গোপাল ভেতরে ঢোকার অনুমতি পান। আর ভেতরে ঢুকেই নবাবকে মুখ ভেংচি দেন। এতে স্বাভাবিকত নবাব খুবই ক্ষেপে যান এবং গোপালকে ফাঁসির আদেশ দেন। পরদিন ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় গোপাল নবাবকে পুনরায় মুখ ভেংচি দেয়। আর এতে নবাব মনে করেন, গোপাল মানসিক ভারসাম্যহীন। অতঃপর তিনি গোপালকে ছেড়ে দেন। এরপর কৃষ্ণনগরে গিয়ে গোপাল রাজাকে সব খুলে বললেও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ইংরেজদের পক্ষে থাকবেন বলেই ঘোষণা দেন।

 বর্তমান যুগে গোপাল 

যুগ যুগ ধরে ইতিহাসবিদরা এই একটি চরিত্রের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তি দেখালেও একটি মজার বিষয় হলো, গোপালের জন্মভূমি হিসেবে কথিত কৃষ্ণনগরে প্রত্যেক বছর চৈত্র মাসে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক বামদলের মেলা। এ মেলা উদ্বোধন করেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র নিজেই। আর এ মেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে থাকে গোপালকে নিয়ে নানা আয়োজন, যা যুগ যুগ ধরেই বাংলার মানুষের কাছে অত্যন্ত আগ্রহের একটি জায়গা। 

তানজিম হাসান পাটোয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

[email protected]

Share if you like

Filter By Topic

-->