
Published :
Updated :

৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে যখন জার্মানরা রোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে যুদ্ধ করছিল, মধ্য আমেরিকায় তখন মায়ান সাম্রাজ্যের বিকাশ ঘটছিল, ঠিক তখনই জাপানে জন্ম নেয় একটি প্রতিষ্ঠান যেটি এখনো টিকে আছে পৃথিবীর বুকে।
প্রিন্স শোতোকু তাইশি যখন ৫৭৮ সালে জাপানের প্রথম বৌদ্ধ মন্দির, শিতেনো-জি নির্মাণের কথা ভাবছিলেন, তখন জাপানে বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণের শিল্পে প্রশিক্ষিত কেউ ছিল না। তাই মন্দির নির্মাণে সহায়তা করার জন্য বায়েকজে (বর্তমান দক্ষিণ-পশ্চিম কোরিয়া) থেকে তিনজন মন্দির নির্মাণ কারিগর নিয়ে এসেছিলেন তিনি। কাঠমিস্ত্রিদের দলের মধ্যে ছিলেন কংগো গুমির প্রতিষ্ঠাতা শিগেমিতসু কংগো, যিনি মন্দিরটি সম্পূর্ণ হওয়ার পর এটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শিতেনোজিতে থেকে যান। পরবর্তীতে তারই হাত ধরে কংগো গুমি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
কংগো গুমি একটি বিশ্বের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত মন্দির, দুর্গ এবং সাংস্কৃতিক ভবনের নকশা, নির্মাণ, এবং মেরামতের কাজ করে।
কংগো গুমির সদর দপ্তর জাপানের ওসাকায় অবস্থিত। ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি একটি পারিবারিক মালিকানাধীন নির্মাণ সংস্থা। একটি প্রায় ১০ ফুট কাগজের স্ক্রলে ৪০টিরও অধিক প্রজন্মের কথা বলা আছে।
উত্তরাধিকারসূত্রে বংশধরদের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলমান আছে। অনেক স্বনামধন্য জাপানি পরিবারেই এই রীতি রয়েছে যে, কোনো প্রজন্মে যদি পুত্র সন্তান জন্ম না নেয় তাহলে কন্যা সন্তানের স্বামী ওই বংশে যোগ দেয় এবং পরিবারের শেষ নাম গ্রহণ করে। কংগো বংশেও একই কাজটি করা হয়েছে যার ফলে কোনো পুত্র সন্তান জন্ম না হলেও একই নামে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানটি কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছে।
প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘায়ুর আরেকটি কারণ হলো বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণ করা। যেহেতু জাপানে প্রচুর পরিমাণে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী রয়েছে যাদের জন্য প্রচুর মন্দির নির্মাণ করা হয় এবং কাঠের তৈরী হওয়ায় নিয়মিত মেরামতও করতে হয়, তাই কংগো বংশের জন্য মন্দির নির্মাণ ও মেরামত একটি নির্ভরযোগ্য পেশায় পরিণত হয়। কয়েক শতাব্দী ধরে কংগো গুমি ১৬ শতকের বিখ্যাত ওসাকা দুর্গসহ অনেক বিখ্যাত ভবন নির্মাণে অংশ নিয়ে আসছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বৌদ্ধধর্মের উপর সরকারি বিধিনিষেধ এবং জাতীয় ধর্ম হিসেবে শিন্টোকে প্রচার করায় কংগো গুমি ঝুঁকির মুখে পরে। সরকার তখন কংগো গুমিকে বন্ধ করে দেয়া কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অধীনে যাওয়ার কথা বললে প্রতিষ্ঠানটি তখন সামরিক বাহিনীর জন্য কাঠের বাক্স ও অন্যান্য সামগ্রী প্রস্তুত করতে শুরু করে। এতে করে সরকারের কাছে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম বজায় রাখে এই প্রতিষ্ঠান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে কংগো গুমি ১৯৫৫ সালের মধ্যে এর ৩৯ তম প্রজন্ম রিতাকা কংগোর নেতৃত্বে একটি সার্বজনীন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। ধর্মীয় ভবন থেকে সাধারণ স্থাপত্য, সব জায়গাতেই তাদের কাজ সম্প্রসারিত হতে থাকে।
কংগো গুমি একটি শক্তিশালী কংক্রিট নির্মাণ পদ্ধতি তৈরি করে যা কাঠের মতো দেখতে কিন্তু আগুন এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধী। শিতেনোজি মন্দিরের পুনর্নির্মাণে এই কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছিল।
জাপানের ইতিহাস জুড়ে কংগো গুমির অধীনে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা স্থাপিত হলেও সময়ের সাথে আর সবকিছুর মতোই কংগো গুমির পারিবারিক মালিকানার ইতি ঘটে।
২০০০ সালের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি কঠিন সময়ে পড়ে এবং ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে তাকামাতসু কনস্ট্রাকশন গ্রুপ কংগো গুমিকে কিনে নেয়। বিক্রির সময় তাদের অধীনে মাত্র ১০০ জনেরও কম কর্মচারী ছিল। তবে কংগো গুমি এখনো টিকে রয়েছে, এখনো তারা বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ স্বাধীন প্রেসিডেন্ট ছিলেন মাসাকাজু কংগো, যিনি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বদানকারী ৪৭ তম কংগো ছিলেন।
samiulhaquesami366@gmail.com

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.