Loading...
The Financial Express

প্রকাশনা শিল্পে ভাইরাসের থাবা

বিক্রি কমে এক-তৃতীয়াংশ, বিপুলসংখ্যক ছাঁটাই


| Updated: March 04, 2021 21:08:44


প্রকাশনা শিল্পে ভাইরাসের থাবা

কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রকাশনা শিল্প শোচনীয় অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে বলে প্রকাশনীগুলোর বিক্রি কমেছে ৭০ শতাংশেরও বেশি।অনেকশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল মাধ্যমে শিক্ষা-কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও তাতেপ্রকাশনা শিল্পের তেমন সুবিধা হয়নি। 

সব ধরনের বইয়েরমোট বিক্রির পরিমাণ অন্য যেকোনো সময়ের বিক্রির তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম। সংশ্লিষ্টরা জানান,এই মন্দার প্রভাব পড়েছে এর সঙ্গে যুক্ত ছাপাখানা, বাঁধাই ও প্রাসঙ্গিক রসদ জোগানদাতা ব্যবসাগুলোর উপর। ছাপা ও প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত অনেককর্মী চাকরি হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে দক্ষরাও রয়েছেন। প্রকাশনীগুলোরস্বত্ত্বধিকারীরাও আনুষ্ঠানিক অর্থ-জোগানদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। 

প্রকাশক ও বই বিক্রেতাদের মতে, বিপুল সম্ভাবনাময় এ খাতে নানা মাত্রায় ২০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। নীলক্ষেতের বইয়ের বাজারে দ্যফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদকরা স্বল্পসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখতে পান, যেখানে সম্ভাব্য ক্রেতাদের নজর কাড়তে বিক্রেতারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। 

‘বই জগৎ’এর বিক্রয়কর্মী মফিজুর রহমানদ্যফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানান, নীলক্ষেতের বিক্রেতাদের জন্য এরকম দৃশ্য খুবই অস্বাভাবিক, বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির এই সময়ে। ফেব্রুয়ারিতেই সাধারণত বইয়ের দোকানগুলোতে সবচেয়েবিক্রি হয় বলে জানান তিনি। বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ায় এটি এখন স্বাভাবিক সময়ের বিক্রির এক-তৃতীয়াংশ। 

মফিজুর বললেন, “আগে আমরা রোজগড়ে ২৫,০০০ টাকার বই বিক্রি করতাম, যেটা এখন কমে তিন ভাগের এক ভাগ হয়েছে।”

তিনি আরো জানালেন,যারা বইমেলায় যেতে মনস্থ করতেন, তারাও অন্য বইয়ের জন্য নীলক্ষেতে ঢুঁ মারতেন,এ বছর যে বইমেলার আয়োজন হতে যাচ্ছে অস্বাভাবিক এক সময়ে। 

তিনি বললেন, “স্কুল থেকে নির্ধারিত পাঠ্যবই কিনতে এসে তারা অন্য বই, যেমনউপন্যাস ও ধর্মীয় বই কিনে ফেলতেন।” 

লকডাউন শিথিল করারপরের মাসগুলোর চেয়ে অবস্থা এখন যেভাবেই হোক অনেকটা ভালো। তবে, তাঁর মতে, স্বাভাবিক অবস্থা এখনো বেশ দূরে। 

ফজলুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা নিউ পল্টন স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলের জন্য পাঠসহায়িকা খুঁজছিলেন।জানালেন, এখনো স্কুল বন্ধ থাকলেওছেলের পড়াশোনায় যাতে কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে সেজন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। 

নীলক্ষেত-ভিত্তিক ইসলামিয়া মার্কেট বণিক বহুমুখী সমিতির বিদায়ী  পরিচালকও ‘লাইফ পাবলিশার্স’এর স্বত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদমিজানুর রহমান হেলাল জানালেন, প্রকাশনা ও বিক্রিসহ বইকেন্দ্রিকব্যবসাগুলো একমাত্র খাত যেটি এখনো মহামারীর প্রভাবে ভুগছে। তিনি বললেন, “অন্যান্য প্রায় সব ব্যবসা ধকলটা পুরোপুরি সামলে উঠেছে বা তাৎপর্যপূর্ণভাবে এগিয়েছে, সেখানে আমাদের ব্যবসায় নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে আমরা ততটা আশাবাদী হতে পারছি না।“ 

বেশকিছু ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে এ ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন, বাকিদের বেশিরভাগই অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া, এই ব্যবসায়ীরা, যারা মূলত ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র, তারা আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের জন্য উপযুক্ত নন। 

বস্তুত, প্রায় ১০০টি প্রকাশনী প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সিলেবাসের পাঠ্যবই, সিলেবাস ও পাঠসহায়িকা বা গাইড বই প্রকাশ করে। কিন্তু এদের মধ্যে মাত্র পাঁচটি প্রকাশনী, লেকচার, পাঞ্জেরী, অনুপম, পুঁথিনিলয় এবং জুপিটার ৭০ শতাংশ বাজার দখল করে রেখেছে। পাঞ্জেরীপাবলিকেশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকএক কর্মকর্তা জানান, শুধু ঢাকা মহানগরেই পাঞ্জেরীর বিক্রির আর্থিক মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। তবে কোভিড-১৯এর ধাক্কায় তাদের বিক্রি কমেছে ৭৫ শতাংশ। তিনি আরো জানালেন, বিক্রয়ে এই ধস নামার ফলে কমপক্ষে ২০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। 

ইউনিভার্সাল পাবলিকেশনের প্রকাশক কাজী শাহ আলম বলেন, গত মৌসুমে ব্যবসায় এমন মন্দার পর প্রকাশকরা ভেবেছিলেন নতুন বছরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললে অবস্থার উন্নতি হবে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটাও হচ্ছে না। তিনি বলেন, “এর মানে টানা দুটো সর্বোচ্চ বই বিক্রির মৌসুম হারিয়ে বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়েছি আমরা। বাজারে এখন আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে সত্যিকারের শঙ্কার মধ্যে রয়েছি।” 

নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের করুণ দশার কথা জানান কাজী শাহ আলম, মাস কয়েক আগেও তাঁর প্রকাশনীতে কর্মীর সংখ্যা ছিল পঞ্চাশের কাছাকাছি। বিক্রিতে বিরাট ধসের ফলে সংখ্যাটি কমিয়ে মাত্র দুইয়ে আনতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। আরও বললেন, “সমিতির অফিসে বসে এখন বেকার সময় কাটাই। অন্যান্য প্রকাশকদেরও প্রায় একই দশা।”  

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস)সাবেক সহকারী-সভাপতি কাজী জহরুল ইসলাম বুলবুল বললেন, সরকার সম্প্রতি সিলেবাস পরিমার্জনা করেছে যেটি কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেবার কাজ করেছে, কারণপুরনো বইগুলোতে কিছুটা পরিবর্তন এনে নতুন রূপে সাজিয়ে আবার প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন তাঁরা। তিনি জানালেন, এবার নতুন শিক্ষাবর্ষে বইবিক্রেতারা প্রকাশকদের কাছে অবিক্রিত বইয়ের বিশাল স্তূপ ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছেন। 

তিনি আরো বললেন,“এসব অবিক্রিত বই কেজি দরে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা ছাড়া উপায় ছিল না।” 

মহামারীর বিরূপ প্রভাব থেকে ব্যবসায়-বাণিজ্যের সুরক্ষার জন্য সরকার-প্রদত্তপ্রণোদনা প্যাকেজের বিষয়ে কাজী জহরুল ইসলাম জানালেন, যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং লেনদেন করেছেকেবল সেগুলোই এ সুবিধা পাবার উপযুক্ত। তিনি যোগ করলেন, “বেশিরভাগ প্রকাশক কিন্তু ব্যাংকগুলোর সঙ্গে এ-ধরনের ঋণ-কার্যক্রমে যুক্তনন। প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ নিয়ে ব্যবসায় চালিয়েছে হাতেগোনা কিছু প্রকাশনী এবং ব্যাংকগুলো এখনতাদের সঙ্গে ব্যবসায় চালাতে অনিচ্ছুক।” 

[email protected] 

[email protected]

Read the English version of the report: Virus hits publishing industry

Share if you like

Filter By Topic

-->