Loading...
The Financial Express

অস্থির জীবনে ভারসাম্য আনার টোটকা

| Updated: March 02, 2021 18:56:51


অস্থির জীবনে ভারসাম্য আনার টোটকা

ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবন — উভয়ই একজন মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই দুটো ব্যাপারকে সমান অর্থবহ করে তোলার মাধ্যমেই ব্যক্তি নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের ফুসরত পায়। কিন্তু ব্যস্ততাময় পৃথিবীতে ব্যক্তিগত জীবন এবং কর্মজীবনের মধ্যে বিস্তর অসামঞ্জস্য থাকা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই অসম বণ্টন যে শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজ কিংবা বয়স ভেদে হয়, তা নয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রায় সব ধরনের মানুষই এর মধ্য দিয়ে যায়। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, পেশাদারি কর্মজীবনে নিয়োজিত এমন লোকজনের মধ্যে প্রায় ৯৪ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে কাজের পেছনে জীবনের ৫০ ঘণ্টা সময় খরচ করেন। পেশাদারি ব্যতিরেকে অন্যান্য মানুষদের মধ্যে প্রায় ৫০ ভাগ সপ্তাহে ৬৫ ঘণ্টারও বেশি সময় কাজ করে থাকেন।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, একজন মানুষ যখন অনবরত কেবলমাত্র তার কাজের দিকে অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়ে, তখন সে মানুষটি খুব স্বাভাবিকভাবেই তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বাস্থ্য এমনকি মানসিক সমস্ত শান্তি থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে।

আসুন কাজ এবং জীবনের মধ্যে সামঞ্জস্য আনয়নের উপায় নিয়ে আলোচনা করা যাক। 

 

পরিপূর্ণতা

আমরা সবাই স্ব স্ব অবস্থানে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চাই। বিষয়টি সত্যিকার অর্থেই সুন্দর। সফল ব্যক্তিদের অধিকাংশ ছোটবেলা থেকেই পরিপূর্ণতার প্রয়োজনে কাজ শুরু করে দেন। কিন্তু আমরা কেউই একটি ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করতে পারি না। সেটি হলো, একজন মানুষের শৈশব থেকে বয়সের সমস্ত ধাপে পারিপার্শ্বিক অবস্থা কিংবা দায়িত্ববোধের জায়গাটুকু ক্রমশ পরিবর্তিত হয়। ছোটবেলায় আমরা আমাদের আত্মকেন্দ্রিক বিষয়গুলোতে নিজেদের সময়কে যেভাবে ব্যবহার করতে পারি, প্রাপ্ত বয়সে এসে ঠিক একইভাবে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়া বরং আমাদের অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ার গতিকে ত্বরান্বিত করে মাত্র।

এ প্রসঙ্গে ‘দ্য অফিস সারভাইভাল গাইড’ বইয়ের লেখিকা মেরিলিন পিউডার ইয়র্কের মতামত হচ্ছে, ‘একজন মানুষের মানসিক শান্তির প্রয়োজনে পরিপূর্ণ হতে চাওয়া অন্যায় কিছু নয়, তবে সে যদি তার পরিপূর্ণতার চর্চার দিকে সচেতন না হয়ে অন্ধের মতো নিজেকে চালিয়ে নিতে যায়, তবে তা ধ্বংসাত্মক ফলাফল ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না’। তিনি আরও বলেন, ‘নিজেকে পরিপূর্ণভাবে গড়ে তুলবার চাইতে শ্রেষ্ঠতার দিকে আবিষ্কার করতে পারাটাই বিশেষ যোগ্যতা।’

 

প্রযুক্তি নির্বাসন

প্রযুক্তির উন্নয়ন আমাদের জীবনকে সহজ থেকে সহজতর করে দিয়েছে। ব্যাপারটিকে অস্বীকার করবার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু পরক্ষণে আমরা এও দেখতে পাই, প্রযুক্তি, ঘরোয়া আনন্দের বিষয়গুলোতেও চরমভাবে ভাগ বসিয়েছে। এখন একজন পেশাদার মানুষ তার অফিসকক্ষ ছাড়াও নিজের ঘরে বসে অফিস প্রধানের নানাবিধ ফরমাশ খাটেন।

এ প্রসঙ্গে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রবার্ট ব্রুকস বলেন, “জীবন অংশে এমন কিছু সময় থাকে, যখন ব্যক্তির উচিত তার মুঠোফোনটি বন্ধ রাখা, এবং সে মুহূর্তটি সর্বোচ্চ উপভোগ্য করে তোলা”। ব্রুকস আরও বলেন, পারিবারিক সময়ে নিয়োজিত থাকাকালীন কিংবা নিজের শিশুটিকে সময় দেওয়ার কালে কখনোই একজন মানুষের তার কর্মক্ষেত্রের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সমান গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার মাধ্যমেই একটি সময়কে সত্যিকার অর্থে কার্যকর এবং সর্বোপরি রোমাঞ্চকর করা সম্ভব”।

 

শরীরচর্চা এবং মেডিটেশন

মানুষের সমস্ত কাজের ফাঁকেই এমন কিছু মৌলিক প্রাকৃতিক চাহিদা থাকে যা করতে কারও বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় না। যেমন, খাদ্যগ্রহণ, পরিপাক ইত্যাদি। এই স্বাভাবিক চাহিদা বা প্রয়োজনগুলোর মতোই শরীরচর্চা কিংবা মেডিটেশনও একটি দরকারি বিষয়। কাজ এবং জীবনের মধ্যে ভারসাম্য আনয়নে শরীরচর্চা সত্যিকার অর্থেই আমাদের স্বস্তিকর অনুভূতিতে বিশেষ অবদান পালন করে।

এ প্রসঙ্গে নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও সাইকোথেরাপিস্ট ব্রায়ান রবিনসন বলেন, আমাদের দেহের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র মূলত দুটো শাখার ওপর টিকে আছে। প্রথম শাখাটির নাম সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম এবং দ্বিতীয় শাখাটির নাম প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম। সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম মূলত আমাদের দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপ গ্রহণ করে, অন্যদিকে প্যারাসিমপ্যাথেটিক প্রক্রিয়ার আমাদের দেহ বিশ্রাম নেবার অবকাশ পায়, পাশাপাশি মানসিক চাপগুলোকে সরিয়ে দিতে এই ব্যবস্থাটি আমাদের বিশেষভাবে সহায়তা করে।

ব্রায়ান আরও বলেন, যখন একজন মানুষ প্রতিদিন কিছুটা সময় শরীরচর্চা কিংবা ধ্যানমগ্নতায় ব্যয় করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্যারাসিমপ্যাথেটিক প্রক্রিয়াটি তার ভেতর ক্রমশ সক্রিয় হতে থাকে। যার ফলে সে তার সমস্ত মানসিক অবসাদগুলোকে খুব সহজেই শূন্য করে দিয়ে জীবন ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে পারে।

 

অপরিকল্পিত কার্যক্রম

পরিকল্পনা ছাড়া যেকোনো মূল্যবান পদক্ষেপও ধীরে ধীরে উল্টো রথের সারথি হয়। একজন মানুষ যদি তার কর্মজীবন এবং ব্যক্তিজীবনের মধ্যে সুষমা আনতে চায়, সে ক্ষেত্রে প্রথমেই তাকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে শনাক্ত করা শিখতে হবে। শনাক্তকরণ শেষে, গুরুত্বভেদে কাজ করতে হবে; অর্থাৎ, যা আগে দরকার, তা আগে করা এবং কম গুরুত্বের কাজগুলো তালিকার শেষে রাখা এবং সময়মতো সেগুলোও সম্পন্ন করাই হচ্ছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের সূত্র।

 

পরিবর্তন

অনেক সময় আমাদের অভ্যাসগুলো এত বেশি মজবুত হয়ে পড়ে যে, আমরা নিজেরাই তা বুঝে উঠতে পারি না। ভালো অভ্যাস বরাবরই গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যখন কোনো অভ্যাস আমাদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তখন অবশ্যই আমাদের বিষয়টিতে গভীর দৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হয়।

ক্ষুদ্র লক্ষ্য

রাতারাতি সবকিছু পাল্টে না ফেলে ছোট ছোট লক্ষ্য স্থির করলে দিন শেষে ফলাফলটা ভালো হয়। এ সম্পর্কে মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক ব্রুকসের অভিমত হচ্ছে, খুব দ্রুত কিছু হাসিল করার লক্ষ্য বরং আমাদের পরাজয়ের মাত্রাকেই গাঢ় করে। তাই কাজ এবং জীবনে সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব্যক্তির অবশ্যই ক্ষুদ্র লক্ষ্যে এগোনো উচিত।

Share if you like

Filter By Topic

-->