Loading...
The Financial Express

পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনাম বাংলাদেশকে টপকে গেলেও খেলা শেষ হয়নি

| Updated: August 24, 2021 06:52:05


পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনাম বাংলাদেশকে  টপকে গেলেও খেলা শেষ হয়নি

ঘটনাটি বিস্ময়কর নয়। অনেক দিন ধরেই তো এ-ধারা চলছিল। পোশাক খাতের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গত প্রায় এক দশক ধরে ভিয়েতনাম আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিল। গত বিশ বছর ধরে বাংলাদেশ ছিল পোশাক রপ্তানিতে চীনের পরের অবস্থানে, অর্থাৎ দ্বিতীয়। কিন্তু, প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানের দেশ দুটির মধ্যে ফারাক প্রচুর। পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যেখানে বিশ্ববাজারের সাড়ে ছয় শতাংশ দখল করে রেখেছে, সেখানে চীন প্রায় ৩৫ শতাংশ বাজার নিজ আয়ত্তে রেখে বিপুলভাবে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে।

চীনের বাজার এখন ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে । অন্যদিকে, একুশ শতকে রপ্তানির দিক থেকে বিশ্বের ‘শক্তি কেন্দ্র’ হিসেবে আবির্ভূত ভিয়েতনামের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে বৈচিত্র্য বিপুল। তা সত্ত্বেও, দেশটি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের ঠিক পরের অবস্থানে চলে এসেছিল। ২০২০ সালে গোটা বিশ্বে পণ্য রপ্তানি কমে গিয়েছিল প্রায় ৭.৮ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রপ্তানি-হ্রাসের হার ছিল ১৭ শতাংশ। অথচ, এই ২০২০ সালেই ভিয়েতনামের মোট পণ্য রপ্তানি ৬.৪ শতাংশ বেড়ে ২৮ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়। (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা)।

প্রকৃতপক্ষে, কোভিড মহামারী শুরুর বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালে বিশ্বের রপ্তানি বাজারে ভিয়েতনামের হিস্যা বরং বেড়েছে। উৎপাদন-পরবর্তী জোগানের ব্যবস্থাপনার যে শৃঙ্খল তাতে দেশটির সক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় আরো সমৃদ্ধ হচ্ছে তারা। পোশাক রপ্তানি বেড়ে দুই হাজার ৯০০ কোটি ডলার (দুই লাখ ৪৬ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা) হওয়ায় দেশটি চীনের পরের অবস্থান, অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে। এ-সময় বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল দুই হাজার ৮০০ কোটি ডলার (দুই লাখ ৩৭ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা)। 

ভিয়েতনামের এই এগিয়ে যাওয়া কি ক্ষণস্থায়ী? নাকি দীর্ঘমেয়াদে এটি আমাদের জন্য খারাপ খবর হিসেবেই থেকে যাবে? উপসংহার টানার আগে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার।

বিদেশি বিনিয়োগ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি 

প্রথমত, ২০২০ সালের বড় একটা সময় ভিয়েতনাম মহামারী নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে লক্ষ্যণীয়ভাবে। এতে রপ্তানিভিত্তিক উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পেরেছে তারা। দ্বিতীয়ত, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার বাণিজ্য-যুদ্ধের এ-যাবতকালের সবচেয়ে বড় সুফলভোগী হল ভিয়েতনাম। কারণ, এই লড়াইয়ের পর সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) বিপুল প্রবাহ চীন থেকে ভিয়েতনামের দিকে ধাবিত হয়েছে। একই সঙ্গে, আবার চাঙ্গা হয়েছে মার্কিন ক্রেতাদের চাহিদাও। সাম্প্রতিক প্রবণতা থেকে দেখা যায়, চীন থেকে ভিয়েতনামে ক্রমবর্ধমান হারে ক্রয়াদেশ স্থানান্তরিত হচ্ছে। এর ফলে, ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনামের মোট রপ্তানি ২৬ শতাংশ বেড়েছে। তাছাড়া, ভিয়েতনাম ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির এক দশমিক ৯০ শতাংশের জোগান দিলেও, ২০২০ সালে সেই হার বেড়ে হয়েছে দুই দশমিক ৭০ শতাংশ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজারে ভিয়েতনামের রপ্তানির হিস্যা বাড়ছে। তৃতীয়ত, বহির্বিশ্বে ভিয়েতনামের সুখ্যাতি বাড়ায় দেশটি বেশকিছু মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তি (ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট, সংক্ষেপে এফটিএ)  করতে পেরেছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর বাণিজ্য চুক্তি ‘সিপিটিপিপি’ (কমপ্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ এগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ), ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ‘ইভিএফটিএ’ (ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন-ভিয়েতনাম ফ্রি-ট্রেড এগ্রিমেন্ট) এবং এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহের মধ্যেকার মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তি ‘আরসিইপি’ (রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ)। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তি (বিএফটিএ)। এসব চুক্তির ফলে, ৫০ শতাংশের বেশি বিশ্ববাজারে ভিয়েতনাম প্রায় শূন্য শুল্ক নিয়ে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। অর্থাৎ, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তি (এফটিআই), এ-দুটোর সম্মিলনের ফলে ভিয়েতনামকে দীর্ঘমেয়াদে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

তবে, বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনামের পোশাক শিল্পের কাঠামো ও রপ্তানি-সক্ষমতার দিক থেকে পুরোদস্তুর ভিন্নতা রয়েছে । বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। ভিয়েতনামের পোশাক খাত দুটো অংশে বিভক্ত। একটি অংশ হলেন স্থানীয় উৎপাদকরা -- পণ্য রপ্তানিতে যাঁদের বলতে গেলে কোনো আগ্রহই নেই। অন্য অংশে রয়েছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা- - যারা পুরোপুরি রপ্তানিমুখী। স্থানীয় উৎপাদনের বেশিরভাগই রপ্তানিযোগ্য মানের নয়। স্থানীয় এই উৎপাদকরা পোশাকের মোট দেশীয় চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশের জোগান দেন। ওদিকে, রপ্তানিযোগ্য পোশাকের ৯০ শতাংশের বেশি তৈরি হয় বিদেশি উৎপাদকদের দ্বারা। এরা আবার নিজেদের বৈশ্বিক যোগসূত্রের মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানি করে থাকেন। সেক্ষেত্রে, এই শিল্পের পশ্চাৎমুখী সংযোগ হয় ন্যূনতম। বিদেশি এই উৎপাদকদের বিক্রয়ের কাজের সমন্বয় করে ভিন্ন দেশে অবস্থিত প্রধান কার্যালয়গুলো। 

বাংলাদেশি পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিক

পণ্য বৈচিত্র্য ও শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা

ভিয়েতনামে শুধু পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে নয়, অন্যান্য আরও শিল্প, যেমন, ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ফুটওয়্যার ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশের উৎপাদনের বেলায়ও একই ঘটনা সত্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিয়েতনামের ইলেকট্রনিক পণ্য ও মোবাইল ফোনের রপ্তানি-প্রবৃদ্ধি বেড়েছে বিস্ময়কারভাবে। প্রায় পাঁচ হাজার কোটি ডলারের (৪,২৪,৯০৩ কোটি বাংলাদেশি টাকা) মোবাইল ফোন রপ্তানি করে চীনের পরই এখন ভিয়েতনামের অবস্থান, অর্থাৎ বিশ্ববাজারে তারা এখন দ্বিতীয় অবস্থানে। ব্রাজিলের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কফি রপ্তানিকারক ভিয়েতনাম। তবে, কফি উৎপাদন ও রপ্তানিতে শীর্ষস্থানটি দখল করার সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে তাদের। ভারতের পর তারাই এখন চাল রপ্তানিতে দ্বিতীয় সেরা। কৌতূহল-উদ্দীপক বিষয় হল, ভিয়েতনামের ঝুড়িতে এখন রপ্তানি পণ্যের যে বিচিত্র-বিপুল সম্ভার দেখা যাচ্ছে তার ফলে শুধু তৈরি পোশাক নয়, অন্য বেশ কয়েকটি পণ্যের ক্ষেত্রে এই দেশ বিশ্বের প্রধান দুটি রপ্তানিকারক দেশের অন্যতম দেশে পরিণত হয়েছে। এসব প্রবণতা থেকে বলা যায়, একাধিক পণ্যের রপ্তানির ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম প্রথম স্থানটি দখল করতে যাচ্ছে।    

বস্ত্রবুনন (টেক্সটাইল) ও তৈরি পোশাক শিল্প ধারাবাহিকভাবে ভিয়েতনামের প্রধানতম রপ্তানি খাত হয়ে রয়েছে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম প্রধান পূর্বাভাষদানকারী ও বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ‘অক্সফোর্ড ইকোনমিকস’-এর মতে, ভিয়েতনামে বর্তমানে ছয় হাজারের বেশি বস্ত্রবুনন ও তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক কোম্পানির সদম্ভ পদচারণা রয়েছে। এখানে যুক্ত রয়েছেন ২৪ লাখ শ্রমিক এবং সংখ্যাটি ক্রমবর্ধিষ্ণু। তৈরি পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধি বেশ বিস্ময়-জাগানিয়া। গত দশ বছর বা এরকম সময়ের মধ্যেই তারা বাংলাদেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে।

ভিয়েতনামের এক পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিক

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিসংখ্যান থেকে আমরা দেখছিল যে, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে কোম্পানির সংখ্যা সাড়ে চার হাজার। এর মধ্যে, হাজার খানেক বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকতে পারে অথবা সেগুলো অনিয়মিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের উপাত্ত জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন। তবে, দেখা যায়, তাদের সংখ্যা ৪০ লাখের কাছাকাছি থাকে। এই একটি তথ্য দিয়েই ভিয়েতনামের শ্রমিকদের উৎপাদন-সক্ষমতার অবস্থাটা বোঝা যায়। আমাদের চেয়ে ১৫ লাখ কম শ্রমিকের সাহায্যেও দেশটি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানির দিক থেকে আমাদের সমকক্ষতা অর্জন করেছে। দৃশ্যত, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে তারা যে বিনিয়োগ করেছে সেটি শ্রমিকদের উৎপাদন-সক্ষমতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। 

প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় দ্রুত এগিয়ে যাওয়া

তবে, এ-মূহূর্তের পরিস্থিতি থেকে মনে হয় না যে খেলাটা এখনই শেষ হয়ে গিয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিসহ বাংলাদেশের রপ্তানির ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টি সঠিক পথেই এগুচ্ছে। আগামী দু’বছরে নিরেট বৈশ্বিক উৎপাদন ও বাণিজ্য-প্রবৃদ্ধির যে অভিক্ষেপ, সেটি বিবেচনায় নিলে, আমাদের ২০২২ সালের প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যতও যথাযথ বলেই পরিদৃশ্যমান। এই খাতের নেতৃস্থানীয়রা জানাচ্ছেন যে, রপ্তানির জন্য তাদের ক্রয়াদেশ পাবার সংখ্যা এখন বাড়ছে। ২০২১ সালের পূর্বাভাষ থেকে এটাই মনে হয় যে, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি মহামারী-পূর্ববর্তীকালের মতো তিন হাজার ৩০০ কোটি থেকে ৩,৪০০ কোটি মার্কিন ডলারে (প্রায় ২.৮ থেকে ২.৯ লাখ কোটি টাকা) পৌঁছে যেতে পারে। ভিয়েতনামের পক্ষে মাত্র এক বছরের মধ্যে এই পর্যায়ে পৌঁছা সম্ভব নয়। তাই আরো এক কী দু’ বছরের জন্য বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থানটি ফিরে পেতে পারে। তবে, দীর্ঘমেয়াদের জন্য নয়। কারণগুলো ব্যাখ্যা করছি।

পোশাক ও ইলেকট্রনিকস খাতে ভিয়েতনাম অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজনের বিষয়টি নিয়ে না ভেবে বরং বিপুল অঙ্কের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ অনুসরণ করেছে। এর ফলে, ২০২০ সালে তাদের দেশে বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে ২,৮০০ কোটি মার্কিন ডলার (২ লাখ ৩৭ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা) যা তাদের জিডিপির ১১ শতাংশ। এই পন্থা অনুসরণের ক্ষেত্রে বরাবরই তাদের উদ্দেশ্য থাকে রপ্তানি সম্প্রসারণ ও বিশ্ববাজার ধরার মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। পোশাক খাতের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ কাঁচামাল (যেমন, বস্ত্র ও আনুষঙ্গিক উপকরণ) তারা আমদানি করে থাকে। ইলেকট্রনিকসের ক্ষেত্রে আমদানিকৃত কাঁচামালের পরিমাণ শতাংশের হিসাবে বরং আরো বেশি। ভিয়েতনামের দেশীয় উৎপাদন থেকে মূল্য সংযোজন যে অত্যন্ত কম পরিমাণে হয়ে থাকে তার সাক্ষ্য মিলছে এই তথ্য থেকে যে, দেশটির ২০২০ সালের রপ্তানি ২৮ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার (২৩,৮৭,৯৫৭ কোটি টাকা) যা তাদের মোট জিডিপির (২৬ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বা ২২ লাখ ৯ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা) চেয়ে বেশি। যেসব দেশের অর্থনীতি অনেক বেশি বাণিজ্যনির্ভর, সেসব দেশে এ-ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রেও যেমনটি সত্য।

ভিয়েতনাম ক্রমবর্ধিষ্ণু হারে বিনিয়োগ-বান্ধব হয়ে ওঠার কৌশল গ্রহণ করেছে। এজন্য তারা উদারভাবে আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে, ব্যবসায়ের বিধিনিয়মের ক্ষেত্রে সুশৃঙ্খলা এনেছে এবং শ্রমশক্তির মানের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। একুশ শতকের প্রথম দশক থেকেই ভিয়েতনাম সরকার সেদেশে বিনিয়োগে ইচ্ছুক কোম্পানিগুলোকে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে। সেই সঙ্গে দিয়েছে বিদেশে প্রেরিত লভ্যাংশের ওপর শূন্য শতাংশ প্রত্যাহৃত কর এবং নিম্ন করপোরেট আয়করের (মাত্র ২০ শতাংশ) সুযোগ। সবচেয়ে বড় সুবিধা যেটি দিয়েছে তা হল, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগে ‘লোক্যাল কনটেন্ট রিকোয়্যারমেন্ট’ (এলসিআর) ন্যূনতম রাখা। ‘এলসিআর’ সাধারণত বৈদেশিক বিনিয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এ কারণে যে, এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলোকে ব্যবসায় চালাতে গিয়ে অভ্যন্তীরণভাবে উৎপাদিত ও জোগান দেওয়া পণ্য ও সেবা ব্যবহার করতে হয়। এই বিষয়গুলোই ভিয়েতনামকে অনেক কোম্পানির চোখে একটি প্রধানতম ‘সোর্সিং ইকোনমি’-তে পরিণত করেছে।

এর ফলে, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ থেকে ভিয়েতনামে অঢেল পুঁজির জোগান যেমন এসেছে, তেমনি সেখানে সৃষ্টি হয়েছে দক্ষতা-ভিত্তিক কর্মসংস্থানের, ব্যাপ্তি ঘটেছে উদ্ভাবনের, উন্নতি হয়েছে ব্যবস্থাপনায়, সম্ভব হয়েছে উন্নত দেশগুলোর বাজারে রিটেইল উইন্ডো স্থাপন এবং মানের উন্নতির ফলে তৈরি হচ্ছে অধিকতর মূল্য-সংযোজনকারী পোশাক (কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি) ও ইলেকট্রনিক পণ্য। এরকম আরো অনেক কিছুই ঘটছে সেখানে। এত বিপুল পরিমাণের বৈদেশিক বিনিয়োগের বাড়তি প্রভাব এ-যাবত দেশীয় ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান না হলেও, এ-থেকে স্থানীয় উদ্যোগসমূহের গুণমান, ব্যবস্থাপনা ও উদ্ভাবনে বহুবিস্তৃত উন্নয়ন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটাই দৃশ্যমান যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে আরো বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়ে ওঠার মতো সুবিধাজনক অবস্থানেই রয়েছে ভিয়েতনাম।

বাংলাদেশের করণীয়

বিপরীতভাবে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দিক থেকে অত্যধিক পরিমাণে স্বদেশজাত। শুধুমাত্র রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকাতেই (ইপিজেড) সামান্য সংখ্যক বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শুরুর দিকে এই শিল্পটি শ্রমঘন রপ্তানি পণ্যের তুলনামূলক সুবিধা পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার মতো জুতসৎ সব নীতি আয়ত্ত করে নিয়েছিল। এর ফলে, দীর্ঘদিন ধরে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থানটিও ধরে রাখতে সফল হয়।

কিন্তু, ভিয়েতনামের চেয়ে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে হলে বাংলাদেশকে এখন দুটো কাজ করতে হবে। প্রথম কাজটি হল, নীতিগতভাবে ও বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবেও বাংলাদেশকে তার প্রধান উৎপাদন খাত তৈরি পোশাক শিল্পে নিঃশর্তভাবে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহের পথটি সুগম করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ২০২৬ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশের (এলডিসি) তকমা ঝেড়ে ফেলার আগেই এদেশকে বেশকিছু মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে নিতে হবে।

নিজেদের অস্ত্রসম্ভারে এ দুটো অতিরিক্ত হাতিয়ার যোগ করে নিতে না পারলে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ যে আগামী পাঁচ বছর বা তার কিছু সময়ের মধ্যেই তৃতীয় স্থানে পিছলে চলে যাবে তেমন লক্ষ্মণই দেখা যাচ্ছে।

শেষ কথা

উন্নয়নের ক্ষেত্রে সফল পরীক্ষার কারণে বাংলাদেশকে যেমন চেনা যায়, ভিয়েতনামও তেমনি রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির মডেলে নতুন বাঁক এনেছে। উনিশ শতকের সত্তরের দশকে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যুগান্তকারী উন্নয়নের এই মডেল রপ্তানিনির্ভর দ্রুত প্রবৃদ্ধির সাফল্যের গল্পগুলো সবার সামনে তুলে ধরেছে। দেং জিয়াও পিংয়ের অধীনে চীন ১৯৮০-এর দশকে বাণিজ্য উদারীকরণ ও বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর পথে ফেরার দিকে মনোযোগী হয়। সেজন্য তারা নিজস্ব ধাঁচের সমাজতন্ত্রকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় বাজারের সঙ্গে অভিযোজিত করে কাজটি এগিয়ে নেয়। অতিদ্রুত একই পন্থা অনুসরণ করে ভিয়েতনাম-- ১৯৮৪ সালে ‘দই মই’ সংস্কার গ্রহণ করার মাধ্যমে। বাণিজ্য উদারীকরণ ও রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্ত করে এটিও বাজারমুখী সমাজতন্ত্রের নতুন আরেকটি রূপ হয়ে ওঠে। সনাতন পূর্ব এশীয় কাঠামোর বদলে ভিয়েতনাম গ্রহণ করে প্রধানত সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে অগ্রসরমান রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির নতুন সংস্করণ। এই সংস্করণ আরো বেগবান হয়েছে অসংখ্য মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে— যেসব চুক্তি বিশ্ববাজারে ভিয়েতনামের রপ্তানির বড় অংশ, অর্থাৎ ৫০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে মুক্ত-বাণিজ্য বাজারে প্রবেশের সুবিধা দিয়েছে তাদের।

বাণিজ্য নীতির জগতে এটি ছিল অদ্বিতীয় এক ঘটনা। বাংলাদেশের জন্য তাহলে শিক্ষাটা কী হতে পারে?

[ড. জাইদী সাত্তার, বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ এবং পলিসি রিসার্চ ইন্সিটিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান। মূল ইংরেজি  লেখাটি গত ১৮ আগস্ট দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত হয়। সেটি বাংলায় রূপান্তর করেছেন ফারহানা মিলি]

Share if you like