Loading...
The Financial Express

বাংলাকে জীবিকার ভাষা করা হয়নি: আহমদ রফিক

| Updated: February 22, 2021 11:38:54


Evaly and Fianancial Express Mobile Evaly and Fianancial Express Desktop
ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক- ছবি: এফই ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক- ছবি: এফই

প্রায় সাত দশক পার হয়ে গেলেও ভাষা আন্দোলনের অনেক কাজ এখনো অসম্পন্ন রয়ে গেছে। বরং এই আন্দোলনের মূল চেতনা ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বিশিষ্ট ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক এমনটাই মনে করেন। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাথে আলাপকালে তিনি আরো বলেন যে বাংলাকে জীবন ও জীবিকার ভাষা না করে ভাষা শহীদ ও সংগ্রামীদের আত্মত্যাগকে খাটো করা হয়েছে। সেই সাথে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

আহমদ রফিক ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বাংলাকে উচ্চ শিক্ষার ভাষা করা হয়নি, উচ্চ আদালতের ভাষাও করা হয়নি। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করল। অথচ বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে আমরা ঔপনিবেশিক রাজভাষাকে গ্রহণ করলাম।’

প্রবীণ এই ভাষা সংগ্রামী, গবেষক ও লেখক আরো মনে করেন যে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন আনুষ্ঠানিকতায় গিয়ে ঠেকেছে। ‘আমরা প্রভাত ফেরীতে যাই, শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দেই, বইমেলায় যাই, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হওয়াও দিনটি নিয়ে গর্ব করি। কিন্তু বাংলাকে সত্যিকারভাবে ধারণ করি না, বাংলা ভাষাকে কাজের ভাষা, জীবিকার ভাষা হিসেবে নেই না।’

আহমদ রফিক ছিলেন ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে সক্রিয় একজন কর্মী। ১৯৫২ সালে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একজন ছাত্র। ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি ছিলেন রাজপথে, মিছিলে, সাংগঠনিক তৎপরতায়। ভাষা আন্দোলনের পটভূমি, ঘটনাপ্রবাহ, ফলাফল ও তাৎপর্য বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করে তিনি সবচেয়ে বেশি বই লিখেছেন।  এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে বদরুদ্দীন উমর ও বশীর আলহেলাল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে বড় কাজ করেছেন, বড় বই লিখেছেন। তাঁরা ঘটনার বিবরণীতে জোর দিয়েছেন, অনেকটা কাহিনীমূলক ইতিহাস লিখেছেন। তাঁদের কাজে অনেক তথ্য ও বিশ্লেষণ আছে। তবে  কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। আবার কেউ কেউ ইতিহাস রচনার নামে বিকৃতি ঘটিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, ‘বহু ঘটনা ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে আছে। আমি ডাল-পালা, শাখা-প্রশাখা ও ছোট-খাট বিভিন্ন ঘটনাকে যথাসম্ভব তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ভাষা আন্দোলন ঢাকায় ছাত্র-যুবাদের দ্বারা সংগঠিত ও পরিচালিত হলেও সারাদেশে এর প্রভাব পড়েছিল। আমি ”ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া” বইয়ে এরকম বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেছি। ভাষা সংগ্রামী আবদুল মতিনের সাথে মিলে লেখা ”ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য” বইয়ে আমরা একুশের বিভিন্ন ঘটনার প্রকৃত তথ্য ও বিবরণ যেমন তুলে ধরেছি, তেমনি প্রচলিত বহু ভুল ও বিকৃত তথ্যকে খণ্ডন করেছি। আবার ”একুশের দিনলিপি” বইতে আমি ভাষা আন্দোলনের পূর্বাপর বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করেছি। একটা দু:খজনক বিষয় হলো যে ভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ দলিলপত্র আজো প্রকাশিত হলো না। সরকার ১৫ খণ্ডে স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র প্রকাশ করেছে অনেক বছর আগে। পাঁচ খণ্ডে হলেও তো ভাষা আন্দোলনের দলিলপত্র প্রকাশ করা যেতো।’

আহমদ রফিক শহীদ মিনারের অসম্পূর্ণতা নিয়েও হতাশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ’হামিদুর রাহমান ও নভেরা আহমেদের মূল নকশা ও পরিকল্পনা অনুসারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ করা গেলে সেটা সারা বিশে^র পর্যটকদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণে পরিণত হতো।’ তিনি এ প্রসঙ্গে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, ’২৩ ফেব্রুয়ারি সকালে মেডিক্যাল ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণে কয়েকজন ছাত্র জমায়েত হয়ে আলাপ করছিল ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির ঘটনা প্রবাহ নিয়ে, শহীদদের নিয়ে। তাদেরই একজন তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তাব করল যে একটা শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের। সাথে সাথে বাকীরা সাড়া দিল। তবে ঠিক কে এই প্রস্তাবটি করেছিল, আমরা তা মনে রাখিনি। আমি পরে খুব আফসোস করেছি যে কেন তখন ওর নামটা ভালভাবে জেনে রাখলাম না।’

আহমদ রফিক ভাষা আন্দোলনকে দুই পর্যায়ে ভাগ করেন। প্রথম পর্যায় ছিল ১৯৪৮ সাল যখন ”রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” - এই স্লোগান ছিল মুখ্য। ১৯৫১ পর্যন্ত এটাই চলেছে। দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৫২ সাল। যখন এই স্লোগানের সঙ্গে  ”রাজবন্দিদের মুক্তি চাই” ও ”সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করো” স্লোগান দুটো যুক্ত হয়। এসব স্লোগান ছাত্ররা, মেধাবী ছাত্র নেতারা স্বত:স্ফূর্তভাবে তৈরি করেছিলেন, কেউ শিখিয়ে দেয়নি। এর মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ হলো। তিনি আরো বলেন যে ১৯৫৬ সালে উর্দুর পাশাপাশি বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলো। ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারি যুক্তফ্রন্টের ২১দফাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে জয়ী হয়, মুসলিম লীগ একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এটা পাকিস্তানের করাচীর শাসকগোষ্ঠী মেনে নিতে পারেনি। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ছয়-দফা দাবির আন্দোলন, ১৯৬৯-য়ের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০-য়ের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরংকুশ জয় এবং ১৯৭১ সালের নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হয়।

[email protected]

Share if you like

Filter By Topic