Loading...
The Financial Express

বাংলাদেশে পুরুষদের চাইতে নারীদের গড় আয়ু বেশি কেন

| Updated: April 24, 2021 15:14:14


বাংলাদেশে পুরুষদের চাইতে নারীদের গড় আয়ু বেশি কেন

বাংলাদেশে নারীদের গড় আয়ু পুরুষদের তুলনায় ৪ বছর বেশি। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এর 'বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২১' প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

গত সপ্তাহে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীদের গড় আয়ু ৭৫ বছর, যেখানে পুরুষদের গড় আয়ু ৭১ বছর।

এছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে নারীদের গড় আয়ু ৭৪.২ বছর। আর পুরুষদের ৭১.১ বছর।

অর্থাৎ নারীদের গড় আয়ু পুরুষদের তুলনায় প্রায় তিন বছর বেশি।

নারীর গড় আয়ু বেশি বা কম হওয়ার পেছনে নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কাঠামো জড়িত বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম নূর-উন-নবী বলেছেন যে, বিশ্বব্যাপী নারীরা জৈবিকভাবে পুরুষদের তুলনায় এগিয়ে আছে এবং উন্নত বিশ্বেও নারীর গড় আয়ু পুরুষদের চেয়ে বেশি।

কিন্তু বাংলাদেশে নারীর এই গড় আয়ু নব্বইয়ের দশকেও পুরুষের চাইতে কম ছিল বলে তিনি জানান।

এর পেছনে দারিদ্র্য, নারীর শিক্ষার হার কম হওয়া, নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাব, অপুষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন না থাকা, মর্যাদাগত অবস্থানকে তিনি দায়ী করেন।

তার মতে, প্রায় দুই থেকে তিন দশক আগেও নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি ভীষণ অবহেলিত ছিল।

নারীরা অপুষ্টিতে ভুগতেন, নারীর স্বাস্থ্যসেবা বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।

যার কারণে নারীদের গড় আয়ু ছিল কম। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে।

মি. নবী বলেন, "আগে তো নারী ঠিকমতো খাবার পেতো না। সবাইকে দেয়ার পর কিছু থাকলে, সেটা খেতো। এখন তারা খেতে শিখেছে এবং খেতে পারছে। নারী এখন আর হাঁড়ির তলা থেকে কুড়িয়ে খায় না।"

একই মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক নাসরিন সুলতানার।

তিনি জানান, সত্তর ও আশির দশকের পর থেকে নারী শিক্ষার হার ক্রমান্বয়ে বাড়তে শুরু করেছে। যার ফলে নারীরা নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পুষ্টির ব্যাপারে সচেতন হয়েছেন।

এছাড়া অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় নারীরা নিজেদের খাবার কিনে খাওয়া, ডাক্তার দেখানো বা জন্মনিয়ন্ত্রণের মতো সিদ্ধান্তগুলো স্বাধীনভাবে নিতে পারছে।

এই স্বাধীনতা ও সক্ষমতা নারীর আয়ু বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ বলে তিনি মনে করেন।

মিস সুলতানা বলেন, "একজন নারীর যখন শিক্ষা থাকে, আর সেই সঙ্গে তিনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হন - তখন তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি কী খাবেন, তার শরীরে কতোটুকু পুষ্টি দরকার, তিনি পরিবার পরিকল্পনা করেন। নারী যখন পুরুষের ওপর নির্ভরশীল ছিল তখন অনেক নারী খাবার পেতো না।"

বাংলাদেশে তিন থেকে চার দশক আগেও একটি পরিবারে ছেলে ও মেয়ে অসুস্থ হলে ছেলের প্রতি বেশি যত্ন নেয়া হতো।

অনেক সময় শুধুমাত্র ছেলেটিকে ডাক্তার দেখানো হতো।

ধারণা ছিল, ছেলে বড় হয়ে মা-বাবাকে দেখবে, মেয়ের পরের বাড়ি চলে যাবে।

কিন্তু মেয়েরা ক্রমান্বয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠায় সামাজিক এই দৃষ্টিভঙ্গিতে এখন ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে যা নারীর গড় আয়ুতে প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি জানান।

নারীরা আত্ম নির্ভরশীল হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে শুরু করে।

মূলত সত্তর ও আশির দশকের পর থেকে নারী ও পুরুষের গড় আয়ুর ব্যবধান কমতে শুরু করে।

২০১১ সালে নারীর গড় আয়ু পুরুষের তুলনায় এক থেকে দেড় বছর বেড়ে যায়।

এর পেছনে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নমূলক কর্মসূচির ভূমিকা রয়েছে বলে জানান মি. নবী।

তার মতে, নারীর ক্ষমতায়ন, তার স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, শিক্ষা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সবকিছুর উন্নয়নে স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল - তা বাস্তবায়নের কারণেই নারীরা নিচ থেকে ওপরের দিকে আসতে শুরু করেছে।

নারী যখন থেকে আয় রোজগার শুরু করলো, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন হল তখন থেকেই মূলত পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে।

তিনি বলেন, "অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসায় নারীরা স্বাধীনভাবে নিজের স্বাস্থ্য, জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শিখল তেমনি সেগুলো কার্যকর করার মতো সক্ষমতা তৈরি হল। এই মর্যাদার অর্জনের পর থেকেই নারীর আয়ু পুরুষের তুলনায় বাড়তে শুরু করে।"

অন্যদিকে নাসরিন সুলতানা জানান, আর্থিকভাবে সক্ষম নারী নিজেই নিজের খাবার, স্বাস্থ্য সুরক্ষার ভার নিতে পারেন।

কিন্তু নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও বেশি বিনিয়োগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।

তিনি বলেন, "এখন মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ৭৩% খরচ এখনও নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। এই খরচ কমাতে হবে। নাহলে যেসব নারী অসচ্ছল তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ঝুঁকির মুখে পড়বে।"

ইউএনএফপিএ-এর এবারের প্রতিবেদনে নারীর শরীরের ওপর নারীর নিজের অধিকারকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন নারীর তার নিজের শরীরের ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে তার কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নারীশিক্ষার বিষয়ে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। বলা হচ্ছে, শিশুদের ৯৫ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়। আর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার হার ৬২ শতাংশ।

শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীদের অবস্থান আগের চাইতে অনেকটাই এগিয়েছে বলে মনে করা হয়।

অথচ আয়, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি দিকে নারী এখনও পুরুষদের থেকে পিছিয়ে।

সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ১৭৩ জন মা প্রাণ হারান। কারণ এখনও ৪৭% শিশু প্রসব হয় অদক্ষ হাতে।

যেসব মেয়ের বয়স ১৫-১৯ বছরের মধ্যে। তাদের প্রতি ১০০০ জনের মধ্যে ৭৪ জন সন্তান জন্ম দিয়ে থাকে।

কারণ ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে ৫৯% কিশোরীর বিয়ে হয়ে যায়।

এখনও স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন ২৯% নারী।

এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরও অগ্রগতির প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, নারী ও পুরুষকে সমান দৃষ্টিতে দেখার মতো মানসিকতা তৈরিতে আরও অনেক কাজ করতে হবে।

ইউএনএফপিএ-এর ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের কোনও দেশ সামগ্রিকভাবে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

যার প্রতিফলন দেখা যায় নারীদের প্রতি সহিংসতা, শারীরিক স্বাধীনতায় ঘাটতি, বেতন বৈষম্য, নেতৃত্ব ও আইনি বৈষম্যে।

Share if you like

Filter By Topic

-->