Loading...
The Financial Express

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বৈশ্বিক প্রবণতা

| Updated: August 17, 2021 15:11:31


মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বৈশ্বিক প্রবণতা

বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওতপ্রোত সম্পর্ক বিদ্যমান। বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিভিন্ন দেশ প্রধানত মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড এরিয়া), শুল্ক সংঘ (কাস্টমস ইউনিয়ন), অভিন্ন বাজার (কমন মার্কেট) এবং অর্থনৈতিক ইউনিয়ন (ইকনোমিক ইউনিয়ন)- এই চারভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে । এজন্য তারা দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক অথবা বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করছে। এই চুক্তিসমূহের বেশিরভাগই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ)। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাণিজ্যসুবিধা,  জিএসপি সুবিধা প্রভৃতি গ্রহণ করেছে যা বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। তবে ২০২৬ সালে এলডিসির কাতার থেকে উত্তরণের মধ্য দিয়ে এই সুবিধাগুলো হারাতে হবে। তাই বাণিজ্য সম্প্রসারণের অন্যান্য উপায় বিশেষ করে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট) ও  মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কে আলোচনা, গবেষণা ও কাজ শুরু হয় গেছে।

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি : বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হলে সদস্য দেশের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রায় সকল পণ্যের উপর কর বা শুল্ক এবং অন্যান্য বিধিনিষেধ অপসারণ করা এবং সেবা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর সদস্য দেশের সেবা সরবরাহকারীদের প্রায় সকল বৈষম্য অপসারণ করতে হয়। পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার গ্যাট (জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড) ২৪ অনুচ্ছেদের এবং সেবার ক্ষেত্রে গ্যাটস ৫ অনুচ্ছেদের আওতায় নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হয়। মুক্ত বাণিজ্যের প্রধান প্রচারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে যে তাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিসমূহের উদ্দেশ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হ্রাস করা, বিদেশে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা এবং মুক্ত বাণিজ্যের অংশীদার দেশ বা দেশসমূহে আইনের শাসন শক্তিশালী করা । 

এফটিএর ইতিকথা: ১৬ শতক থেকে ১৮ শতক পর্যন্ত ইউরোপীয় শক্তিধর দেশগুলো বেনেবাদী (মার্কেন্টাইলিস্ট) মতবাদ দ্বারা পরিচালিত হতো। তাদের প্রধান চিন্তা ছিল অনুকূল বাণিজ্য ভারসাম্য  বা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অবস্থা যেখানে রপ্তানি বেশি থাকবে, আমদানি কম থাকবে। তখন বাণিজ্য চুক্তিকে নিরুৎসাহিত করা হতো। শুল্ক এবং কোটাব্যবস্থার মাধ্যমে দেশীয় শিল্পকে সংরক্ষণ করা হতো। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ নেভিগেশন অ্যাক্ট ১৬৫১ এর কথা বলা যায়। এই আইন অনুযায়ী কোনো বিদেশী জাহাজ ব্রিটেনের সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে ব্যবসা করতে পারতো না । আমদানি করতে হলে ব্রিটিশ জাহাজ ভাড়া করতে হতো অথবা যে দেশে পণ্য উৎপাদিত হয়েছে সেই দেশে জাহাজটি নিবন্ধিত হতে হতো। অন্যদিকে বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রায় শুরু থেকেই শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা দাবি করে আসছিল । ১৭১৭ সালে মুঘল বাদশাহ ফররুখশিয়ারের নিকট থেকে বার্ষিক মাত্র তিন হাজার ৩০০০ রুপির বিনিময়ে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা আদায় করতে সমর্থ হয়।

অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ (১৭২৩-১৭৯০) এবং ডেভিড রিকার্ডো (১৭৭২-১৮২৩)’র মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও দেশসমূহের তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্বের কারণে এই চিন্তায় পরিবর্তন আসে। সোনা, রূপার আধিক্য দিয়ে দেশের সম্পদ পরিমাপ না করে মানুষের জীবনমান দিয়ে পরিমাপ করার বিষয়টি সামনে আসে। তখন আমদানি বৃদ্ধির ব্যাপারটিও সামনে আসে। ১৮২৩ সালে ”রেসিপ্রোসিটি অব ডিডউটিজ অ্যাক্ট” এর মাধ্যমে দেশসমূহের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক হ্রাসের অনুমতি দেয়া হয়। ১৮৫০ সালের মধ্যে কর্ন অ্যাক্ট (শস্য আইন)সহ অনেক সুরক্ষামূলক নীতি বর্জন করা হয়। এরপর ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ‘কবডেন-শ্যাভালিয়ের ট্রিটি’ হয় যার মধ্যে মোস্ট ফেভারড নেশন (এমএফএন) ধারাও ছিল- অর্থাৎ একদেশকে যে সুবিধা দেয়া হবে তার বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোকেও সেই সুবিধা প্রদান করতে হবে। এখানে বৈষম্য করা যাবে না। এর ফলে ইউরোপে আরও এমন বেশ কিছু চুক্তি হয় যার মাধ্যমে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য উদারীকরণ ও মুক্ত বাণিজ্যের সূচনা হয়। এরপর অবশ্য বহু উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে মুক্ত বাণিজ্যের ধারণা বিবর্তিত হয়। ১৮৭৩ সালে ইউরোপে মন্দা দেখা দেয়। তখন সুরক্ষাবাদী নীতি গ্রহণ করে দেশগুলো। এই প্রবণতা চলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত।

দেশগুলোর উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাব এবং যুদ্ধের পর অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে বাণিজ্য উদারীকরণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় । ১৯২৭ সালের প্রথমবারের মতো বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় লীগ অব নেশনস এর উদ্যোগে। কিন্তু ১৯৩০ এর মহামন্দার কারণে এই উদ্যোগের সুফল পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস চুক্তি এর মধ্য দিয়ে বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থা (আইএমএফ) ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা (আইটিও) প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর আইটিও-র বদলে ১৯৪৭ সালে যাত্রা শুরু করে গ্যাট (জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড)। এর মধ্য দিয়ে পুনরায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি হওয়া শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পোন্নত দেশগুলোর গড় শুল্ক ১৯৪৬ সালে ৪০ শতাংশ থেকে ১৯৯০ এর দশকে ৫ শতাংশে নেমে আসে। বাণিজ্য উদারীকরণের এই উদ্যোগ বৈশ্বিক রপ্তানি বৃদ্ধি করেছে এর ফলে ১৯৫০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক রপ্তানি প্রায় ১৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হলো ইউরোপীয়ান ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনস (ইএফটিএ) যার যাত্রা শুরু ১৯৫৯ সালের ১৪ নভেম্বর আইসল্যান্ড, লিকটেনস্টেইন, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড এই চারটি দেশের সমন্বয়ে। এটা স্টকহোম কনভেনশনের উপর ভিত্তি করে হয়েছিল যাদের উদ্দেশ্য ছিল সদস্য দেশসমূহের মধ্যে শুল্ক হ্রাস, কোটা ব্যবস্থার উদারীকরণ, কৃষি পণ্যের বাণিজ্য উদারীকরণ প্রভৃতি। এরপর ৮০’র দশকে তৎকালীন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ইএফটিএ’র সদস্য দেশসমূহের সঙ্গে আলাদা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হয় । ১৯৯২ সালে উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (নাফটা) ও  দক্ষিণ-পূর্ব  এশীয় জাতিগুলোর সংঘ (আসিয়ান) এবং ২০০৪ সাফটা চুক্তি সম্পাদিত হয়।

বৈশ্বিক প্রবণতা: বর্তমানে ৩৫০ টা আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি (আরটিএ) কার্যকর রয়েছে তার মধ্যে ৩০৫টিই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। বাকিগুলো অন্যান্য অর্থনৈতিক সংযুক্তির উপায় যেমন কাস্টমস ইউনিয়ন (সিইউ), অর্থনৈতিক সংযুক্তি চুক্তি (ইআইএ) এবং আংশিক সুবিধা চুক্তি (পিএসএ) । ডব্লিউটিও-র যাত্রা শুরুর আগ বা  ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত আঞ্চলিক বাণিজ্য্ চুক্তি (আরটিএ) হয়েছে ৫০টি। বাকি ৩০০টিই হয়েছে পরবর্তী ২৬ বছরে। গত সাত বছরে সম্পাদিত সক্রিয় চুক্তির সংখ্যা ১০০টি। মূলত আঞ্চলিক চুক্তির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সক্রিয় চুক্তির সংখ্যা ৪৬টি। ইএফটি-র সক্রিয় চুক্তি সংখ্যা ২৭টি। ইউরোপে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য চুক্তি করেছে যুক্তরাজ্য। এশিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া, ১৭টি। দক্ষিণ আমেরিকায় নেতৃত্ব দিচ্ছে চিলি, ১৭টি চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ১৪টি সক্রিয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। বর্তমানে আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আরও বড় পরিসরে সম্পাদিত হচ্ছে। গত ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর আসিয়ানভুক্ত ১০টি দেশ, পূর্ব এশিয়ার চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, এবং ওশেনিয়ার দুটি দেশ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড- মোট ১৫ টি দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হলো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) । এই চুক্তির সদস্য দেশগুলোতে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বাস করে এবং বিশ্বের মোট জিডিপিতে এদের অবদান ২৯ শতাংশ। আরসিইপি-র মধ্য দিয়ে সদস্য দেশগুলো আগামী ২০ বছরের মধ্যে অনেক ধরনের কর/শুল্ক প্রত্যাহার করবে।

মো. জুলফিকার ইসলাম, গবেষক, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই), ঢাকা।

[email protected]

[রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ৪২৮তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারে প্রদত্ত মূল বক্তব্যের লিখিত রূপের প্রথম অংশ; ঈষৎ সম্পাদিত]

 

Share if you like

Filter By Topic