Loading...
The Financial Express

মেমেন্টো মোরি স্থিরচিত্র: মৃতদের স্মৃতি ধরে রাখার ভিন্ন এক উপায়

| Updated: August 06, 2022 12:32:10


মৃতদের সাথে তোলা কয়েকটি মেমেন্টো মোরি স্থিরচিত্র। ছবি: উইউকিমিডিয়া কমনস মৃতদের সাথে তোলা কয়েকটি মেমেন্টো মোরি স্থিরচিত্র। ছবি: উইউকিমিডিয়া কমনস

আট সদস্যের একটি পরিবার। হঠাৎ করেই পরপারে চলে গেল বাড়ির সবচেয়ে ছোট মেয়েটি। শিশুটির এই অকাল প্রয়াণ সকলকেই করলো শোকগ্রস্থ। তার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সবচেয়ে প্রিয় পোশাকে সাজানো হলো তাকে। তারপর তার আরো চার ভাই-বোনের সাথে তাকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো একটি স্ট্যান্ডের সাহায্যে। এরপর তোলা হলো ছবি।

হয়তো এখন শুনতে খুবই অবাক লাগছে, তবে উনবিংশ শতাব্দীর ভিক্টোরিয়ান ইউরোপে এভাবে মৃতদের সাজিয়ে পরিবারের জীবিত সবার সাথে ছবি তোলা হতো। এটি ছিল 'মেমেন্টো মোরি' স্থিরচিত্র। এর মানে 'মনে রেখো, একদিন সবাইকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে'।

'মেমেন্টো মোরি' নামের এই ধারণা অবশ্য শুধু স্থিরচিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়। প্রাচীন গ্রীসে রাজা কিংবা বিভিন্ন দার্শনিকদের মৃত্যুর সময়ের মুখাবয়ব এর রূপ ফুটিয়ে তোলা হতো মুখোশে। এটি ছিল 'মেমেন্টো মোরি মাস্ক'। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, মৃত ব্যক্তির একটি স্মারক রাখা। মৃত্যুই অমোঘ সত্য - সেই সত্যকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করা ও ইহকালীন লালসা থেকে মুক্তিও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

শুধু প্রাচীন গ্রীস নয়, আধুনিককালেও ভ্লাদিমির লেনিন, মাও সে তুং কিংবা জোসেফ স্ট্যালিনের মত রাজনৈতিক নেতাদের 'মেমেন্টো মোরি মাস্ক' তৈরি করা হয়েছে।

স্থিরচিত্রে মোমেন্টো মোরির শুরু ঠিক কবে থেকে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে ১৮৫০ এর দশকের পর থেকে এ ধরনের ফটোগ্রাফের অস্তিত্ব মেলে। সে সময়ের ইউরোপ ছিল নানারকম রোগের প্রকোপে জড়সড়। প্লেগ মহামারী তো ছিলই, সাথে ছিল হাম, ডিপথেরিয়া, টাইফয়েড, স্কারলেট জ্বরের মত রোগের ঘন ঘন আক্রমণ। কাজেই মানুষের গড় আয়ু ছিল চল্লিশ বছরের আশেপাশে।

সে সময়ের পরিবারগুলো ছিল বড় পরিবার। একেকটি পরিবারে গড়ে সাত-আটজন করে সন্তান থাকতো। প্রায় পরিবারেই অন্তত এক/দুইজন শিশুর অল্পবয়সে মৃত্যু হতো৷ এর বড় কারণ ছিল উল্লেখিত রোগগুলোর আক্রমণ।

সে সময় মানুষের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার একটি বড় মাধ্যম ছিল পোর্ট্রেট আঁকা। তবে সেটি ছিল ব্যয়বহুল। খুব উচ্চবিত্ত পরিবার ছাড়া বাকিদের ভেতর এর চল ছিল না। এ কারণে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে প্রায় কোন মানুষেরই ছবি থাকতো না।

তবে ১৮৩৮ সালে জ্যাক দামের কর্তৃক যখন দাগেরোটাইপ ফটোগ্রাফির উদ্ভব হয়, তখন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ছবি তুলতে শুরু করে। তবে, পোর্ট্রেট এর মত অত ব্যয়বহুল না হলেও এখানেও খরচ খুব কম ছিল না। এই পদ্ধতিতে ছবি তুলে তা ওয়াশ করে রুপার পাত এর ওপর প্রোথিত হতো৷ কখনো কখনো অন্য কোন ধাতু, পিতল, কাঁচ ইত্যাদি ব্যবহৃত হতো।

মৃত বোনের কাঁধে মাথা রেখে শিশু, খেলনাসহ মৃত শিশু, মৃতশিশুর আঁকানো চোখ, মৃত মায়ের সাথে দুই কন্যা, মৃত মেয়ে কোলে বাবা, মৃত ছেলে কোলে মা। ছবি: কনভার্সেশন.কম/ উইকিমিডিয়া কমনস

সেসময় বেশিরভাগ পরিবারই সারাজীবনে কোন ছবি আলাদাভাবে তুলতো না। অনেক পরিবারে 'ফ্যামিলি ফটো' বলতে কিছু ছিল না। তাই কেউ মারা গেলে তার স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে সবাই মিলে ছবি তোলা হতো।

আবার কখনো কখনো সবাই মিলে ছবি না তুলে মৃত শিশুর সাথে তার ভাই-বোনেরা, মৃত কন্যার সাথে মা-বাবা, মৃত ভাইয়ের সাথে অপর ভাই - এভাবে ছবি তোলা হতো।

কখনো কখনো মৃতদের 'সিঙ্গেল ফটো' নেয়া হতো৷ একটি স্ট্যান্ডের সাহায্যে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাদের একক ছবি তোলা হতো। চোখ বন্ধ হয়ে গেলে জোর করে চোখ খোলানো হতো। সেটা না করে অনেকে আবার বন্ধ চোখের ওপর কৃত্রিম চোখ আঁকিয়ে নিতেন। এভাবে মোটামুটি জীবিতের মত দেখাতো মৃতদের।

শিশুদের একেবারে পরিপাটি কাপড় পরিয়ে শুইয়ে রাখা হতো ঘুমের ভঙ্গিতে৷ সাথে দেয়া হতো প্রিয় খেলনা, ফুল ইত্যাদি। এরপর নেয়া সিঙ্গেল ফটো দেখে মনে হতো ফুলের মাঝে শুয়ে থাকা ফুলের মত একটি শিশু খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়েছে।

আবার, বাড়ির কোন পোষা প্রাণী মারা গেলে তার সাথেও তোলা হতো ছবি। যেমন - মৃত একটি কুকুরকে মাটিতে শুইয়ে রেখে বাড়ির মেয়েরা কেউ দাঁড়িয়ে, আর কেউ মৃত কুকুরটির পাশে বসে তুলেছেন ছবি।

মৃত বোনের কাঁধে মাথা রেখে বোনের তোলা ছবি কিংবা ঘুমের ভঙ্গিতে থাকা মৃত ভাইয়ের সাথে পাশাপাশি শুয়ে থাকা ভাইয়ের ছবিও আছে এর ভেতর।

সাধারণত এসব ছবি তোলার সময় সবাই পরিপাটি হয়ে থাকতেন। দেখে মনে হতো, সবাই মিলে যেন কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে। মৃতদের পরিবারের কাছে ছবিগুলো ছিল সারাজীবনের জন্য প্রিয়জনের সাথে শেষ চিহ্ন। তাই এখানে কোনরকম বিলাপ বা কান্নাকাটির রেশ থাকতো না। তবে সাজানো গোছানো ছবিগুলোতেও দেখা যেতো কিছু কিছু বিমর্ষ চোখ

ইউরোপে এর মূল প্রচলন থাকলেও ব্রিটিশ ভারতে কিছু কিছু বাঙ্গালিরও মেমেন্টো মোরি স্থিরচিত্র তোলা হয়েছে। যেমন - ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৯১ সালে মারা যাবার পর সাঁওতাল পরগণার লোকেরা তাকে আধবসা করিয়ে তার সাথে এরকম স্থিরচিত্র তুলেছিলেন।

আজ হয়তো এসব ছবি দেখে অনেকের কাছে খুব অদ্ভুত লাগবে, অনেকে মনে সঞ্চারিত হবে ভয়ের শীতল তরঙ্গ; কিন্তু সে সময়ের ইউরোপের অনেক পরিবারের কাছে অন্তিম মুহূর্তের এই ছবিগুলোই ছিল পরম আবেগ ও ভালোবাসার চিত্র। যা তারা যত্ন নিয়ে সংরক্ষণ করতেন।

 

মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।

[email protected]

Share if you like

Filter By Topic