
Published :
Updated :

যদি আপনি ভেবে থাকেন যে ২০২৫ সাল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের দিক থেকে বেশ এগিয়ে ছিল, তাহলে প্রস্তুত থাকুন ২০২৬ এর জন্য। নতুন এই বছর সেই গতিকে আরও দ্রুত করবে।
সামনে যে সময় আসছে, তা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার নয়, এখন এটি বাস্তব প্রয়োগের সময়। এখন এগিয়ে থাকবে তারাই, যারা প্রযুক্তির ট্রেন্ডকে শুধু বুঝবেই না, বরং তা কাজে রূপ দিতে পারবে এবং সেখান থেকে বাস্তব ফলাফল বের করে আনবে।
একসময় নতুন প্রযুক্তি ছিল কৌতূহলের বিষয়। এখন তা হয়ে উঠেছে টিকে থাকার শর্ত। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও আগের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যস্ত, আর ঠিক তখনই কিছু প্রতিষ্ঠান নীরবে তৈরি করে ফেলছে আগামী দিনের অবকাঠামো।
২০২৬ সালের দিকে তাকালে যে সাতটি সম্ভাবনা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, সেগুলোই বলে দেয় ভবিষ্যৎ আসলে কেমন হতে যাচ্ছে।
স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট
শুধু প্রশ্নের উত্তর দেয়া এআই এর যুগ শেষ। ২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই জটিল কাজ সম্পাদন করবে এবং সিদ্ধান্ত নেবে। এমন সিস্টেমের কথা বলা হচ্ছে, যা যেকোনো তত্ত্বাবধান ছাড়াই পুরো কর্পোরেট প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে পারে, সময়সূচি সাজাতে পারে এবং অনলাইনে কাজ করতে পারে।
এক্সেম ম্যাগাজিন অনুযায়ী, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে বিশেষ ভাবে জোর দেয়, ২০২৬ সালে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে এআই দ্বারা পুনর্গঠনের দিকে অগ্রসর হতে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, মার্কেটিং ও শিক্ষা খাতে ইতোমধ্যেই এমন সমাধান চালু হয়েছে যা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ যেমন ডাটা এন্ট্রি কমিয়ে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করছে।
মাল্টি-এজেন্ট সিস্টেম
একটি এআই এজেন্টই যদি এত শক্তিশালী হয়, তাহলে একসাথে কাজ করা একাধিক এজেন্ট কল্পনা করুন। মাল্টি-এজেন্ট সিস্টেম হলো পরবর্তী ধাপ, বিশেষায়িত একাধিক এআই একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন সমস্যা সমাধান করবে, যা এককভাবে সম্ভব নয়।
ব্যবসার ক্ষেত্রে একটি বাস্তব উদাহরণ হলো একটি এআই এজেন্ট ডেটা বিশ্লেষণে কাজ করে, আরেকটি গ্রাহকের সাথে যোগাযোগ সামলাচ্ছে, আর তৃতীয়টি ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট দেখছে। সবগুলো মিলেই একটি সমন্বিত ফলাফল তৈরি করে।
২০২৬ সালে এই সিস্টেমগুলো ট্রেন্ডে থাকার কারণ হলো এগুলো জটিল ওয়ার্ক ফ্লো পরিচালনা করতে পারে এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অটোমেশন নিশ্চিত করে।
ডোমেইন-স্পেসিফিক ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল
জেনারেল এআই মডেল প্রযুক্তিকে সবার কাছে পৌঁছে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এখন আসছে বিশেষায়নের সময়। ডোমেইন-স্পেসিফিক ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো জনপ্রিয় হচ্ছে কারণ এগুলো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের জন্য নির্ভুলতা প্রদান করে।
একটি সাধারণ এআই চিকিৎসা, ফাইন্যান্স বা ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে মোটামুটি কথা বলতে পারে। কিন্তু চিকিৎসা নির্ণয়ের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ক্লিনিক্যাল সূক্ষ্মতা, টেকনিক্যাল শব্দ এবং প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট বোঝা এআই যা সাধারণ পরামর্শ আর সত্যিকারের কার্যকর গাইডলাইনের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়। গ্যাটনার, একটি আমেরিকান রিসার্চ ফার্ম। এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে কোম্পানিগুলোর ব্যবহৃত জেনারেটিভ এআই মডেলের অর্ধেকেরও বেশি হবে ডোমেইন-স্পেসিফিক। এর ফলে সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা বাড়বে, গুরুতর ভুল কমবে এবং প্রতিটি সেক্টরের বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই উত্তর পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এআই সিকিউরিটি প্ল্যাটফর্ম
আপনার কোম্পানি যত বেশি এআই-এর ওপর নির্ভর করবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে। প্রতিদিন নতুন নতুন হুমকি দেখা দিচ্ছে এআই এর ক্ষেত্রে। প্রম্পট ইনজেকশন, সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস, স্বয়ংক্রিয় এজেন্টের অননুমোদিত কাজ ইত্যাদি।
এই বাস্তবতায় এআই সিকিউরিটি প্ল্যাটফর্মগুলো একটি সমাধান হিসেবে এসেছে। এগুলো শুধু অ্যান্টিভাইরাস নয় বরং এমন সিস্টেম যা সন্দেহজনক আচরণ পর্যবেক্ষণ ও রিয়েল-টাইমে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করবে। এছাড়া, এআই-নির্দিষ্ট সিকিউরিটি নীতি প্রয়োগও করবে।
গ্যাটনার পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৮ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠান এআই সিকিউরিটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, ফাইন্যান্স ও সরকারি খাতে এটি একটি মৌলিক প্রয়োজন হয়ে উঠবে।
এআই-নেটিভ ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্ম
এআই-নেটিভ ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ডেভেলপারদের প্রতিস্থাপন করে না বরং তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এসব টুল কোড দ্রুত লিখতে ও বাগ ধরতে কাজ করবে।
গ্যাটনারের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ছোট কিন্তু এআই-সহায়তাপ্রাপ্ত টিমে রূপান্তরিত হবে। অর্থাৎ অল্প সংখ্যক মানুষই বড় ও জটিল প্রজেক্ট সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে।
এআই সুপারকম্পিউটিং
এই পুরো এআই বিপ্লব চালাতে প্রয়োজন শক্তিশালী অবকাঠামো। এআই সুপারকম্পিউটিং বলতে বোঝায় সিপিউ, জিপিউ, বিশেষায়িত এএসআইসি এমনকি নিউরোমর্ফিক কম্পিউটিংয়ের সমন্বিত ব্যবহার, যা মানুষের মস্তিষ্কের মতো কাজ করে।
এটি শুধু বেশি প্রসেসিং পাওয়ার নয়, বরং প্রতিটি কাজের জন্য সঠিক ধরনের প্রসেসিং ব্যবহার করা। এর ফলে জটিল সিমুলেশন, বিশাল ডেটা বিশ্লেষণ এবং উন্নত মেশিন লার্নিং এখন অভাবনীয় গতিতে সম্ভব হচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ডেটা সেন্টার বিশ্বব্যাপী ৪ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে টেকসই উন্নয়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মানবিক দক্ষতার উত্থান: সহানুভূতি, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতা
২০২৬ সালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈপরীত্য হলো, যত বেশি অটোমেশন বাড়ছে, তত বেশি মূল্য পাচ্ছে মানবিক দক্ষতা। সহানুভূতি, নৈতিক বিচার, নেতৃত্ব এবং সৃজনশীলতা অ্যালগরিদম দিয়ে অনুকরণ করা যায় না।
প্রযুক্তি যখন পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সামলাবে, মানুষ তখন কৌশলগত চিন্তা, সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং নতুন ধারণা সৃষ্টিতে মনোযোগ দিতে পারবে। যারা এটা আগে বুঝবে, তারাই ভবিষ্যতে এগিয়ে থাকবে। ২০২৬ কোনও পরীক্ষার বছর নয়, বরং এটি হবে প্রযুক্তি ও মানবিক দক্ষতা একত্রীকরণের বছর।
samiulhaquesami366@gmail.com

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.