Bangla
2 years ago

বাংলাদেশে মাল্টা চাষ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে কেন?

Representational image
Representational image

Published :

Updated :

বিদেশী ফল হিসেবে প্রসিদ্ধ হলেও সম্প্রতি বাংলাদেশে মাল্টা চাষ বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। টক-মিষ্টি স্বাদের রসালো এই ফলটি একদিকে যেমন পুষ্টিগুণে ভরপুর, ঠিক তেমনি মুখে অরুচি কিংবা শরীরের পানি স্বল্পতা রোধেও মাল্টা অনন্য।

সঠিক পরিকল্পনা এবং যত্ন পেলে মাল্টা চাষ বেকারত্ব হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়সহ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

মাল্টা মূলত কমলা এবং বাতাবি লেবুর সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবিত একটি ফল যার ইংরেজি নাম সুইট অরেঞ্জ। এর আদি উৎপত্তিস্থল হিসেবে ভিয়েতনাম, দক্ষিণ চীন এবং উত্তর-পশ্চিম ভারত অঞ্চলকে বিবেচনা করা হয়। মাল্টা মূলত সাইট্রাস পরিবারভুক্ত একটি বিদেশী ফল।

মাল্টায় রয়েছে শর্করা, আমিষ, চর্বি, ক্যারোটিন, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, লৌহসহ আরো নানাবিধ পুষ্টি উপাদান। এছাড়া এর বেশ কিছু ঔষধি গুণাগুণও রয়েছে। যেমন- সর্দি ও কাশি উপশমে মাল্টা কার্যকরী। এছাড়া এই ফলের খোসা প্রসাধনী তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

একসময় বাংলাদেশে মাল্টার বাজার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর থাকলেও এখন সময় বদলেছে। উন্নত কৃষি গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের মাটিতেও এখন সফলভাবে চাষ হচ্ছে বিদেশি ফল হিসেবে তকমা পাওয়া মাল্টা।

বাংলাদেশে মূলত বারি-১ জাতের মাল্টার চাষ করা হয়। মাল্টা চাষে বাংলাদেশের কিছু জেলা ইতোমধ্যে বেশ সফলতা পেয়েছে যার মধ্যে মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, পিরোজপুর, বগুড়া এবং শেরপুর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

যেকোনো ফল উৎপাদনের জন্য সেই এলাকার আবহাওয়া এবং মাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভূ-প্রকৃতিগত কারণে বাংলাদেশের একটি জেলার সাথে আরেকটি জেলার আবহাওয়া এবং মৃত্তিকাগত পার্থক্য দেখা যায়।

আর তাই তো পাহাড়ি এলাকায় যে ফল অধিক হারে জন্মে, সমতলে সেটির উৎপাদন ততটা আশাব্যঞ্জক হয় না। আবার বাংলাদেশের সিলেট, পঞ্চগড় এবং বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল চা চাষের জন্য বিখ্যাত হলেও অন্যান্য জেলাগুলোতে চা চাষ তেমন একটা দেখা যায় না।

কৃষি বাতায়নের তথ্যমতে, শুষ্ক ও উষ্ণ জলবায়ু মাল্টা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। অধিক বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্রতা থাকলে মাল্টার গুণগত মান কমে যায় এবং সেই সাথে ফলে পোকা-মাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়।

প্রায় সব ধরনের মাটিতে মাল্টা চাষ করা গেলেও উর্বর এবং দোঁ-আশ মাটিতে মাল্টার ফলন ভালো হয়। এছাড়া মাটির অম্লত্ব ৫.৫-৬.৫ এর মধ্যে থাকা মাল্টা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। তবে উচ্চ তাপমাত্রা এবং লবণ সংবেদনশীল হলেও মাল্টাগাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তাই পানি জমে থাকে এমন জমিতে মাল্টা চাষ সম্ভব নয়।

আবহাওয়াগত কারণে বাংলাদেশে বেশিরভাগ সময় উষ্ণ এবং কম আর্দ্রতাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে যা মাল্টা চাষের জন্য অনুকূল। আবার প্রকৃতিগতভাবে এদেশের মাটি উর্বর হওয়ায় সেটিও মাল্টা চাষে এদেশের কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে। এমনকি জলাবদ্ধতার ঝুঁকি না থাকায় পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতেও এই ফল চাষের কদর বাড়ছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত বারি মাল্টা-১ জাতটি উচ্চ ফলনশীল জাত হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। মধ্য ফাল্গুন থেকে মধ্য চৈত্রে এই গাছে ফুল আসে এবং ফল পাকতে সময় লাগে কার্তিক মাস পর্যন্ত।

তবে অন্যান্য জাতের মাল্টা পাকা অবস্থায় গাঢ় হলুদ হলেও বারি মাল্টা-১ জাতের ফলগুলো পাকা অবস্থায় সবুজ হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক এফটিআইপি বউ মাল্টা-১ নামে আরো একটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।

বাংলাদেশে মাল্টার চাষ জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো এটি চাষে খুব বেশি খরচ হয় না। পাশাপাশি এই ফল চাষে খুব বেশি যত্নেরও প্রয়োজন হয় না। পতিত জমিতে এই ফলের আবাদ করে বেশ লাভবান হওয়া যায়। সেজন্য কৃষক এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের মাঝে মাল্টা চাষে আগ্রহ দেখা যায়।

অন্যদিকে বাজারে দেশীয় মাল্টার চাহিদাও থাকে বিদেশী মাল্টা অপেক্ষা বেশি। দেশীয় মাল্টা পরিবহন ও বিপণনে কম সময় লাগে বিধায় এই ফল বেশ তরতাজা থাকে যা বাজারে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এছাড়া এই ফলে ক্ষতিকারক কেমিক্যাল মেশানোর প্রবণতাও থাকে তুলনামূলক কম যা ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে সক্ষম।

মাল্টা চাষে চারা রোপণ থেকে গাছে ফল আসা পর্যন্ত সময়কাল নাতিদীর্ঘ হয়ে থাকে। চারা রোপণের মাত্র ২ বছরের মধ্যেই মাল্টা গাছে ফল আসতে শুরু করে। এছাড়া প্রথম বছর যতটুকু ফলন পাওয়া যায়, পরবর্তী বছরগুলোতে ফলন আরো বাড়তে থাকে।

অন্যদিকে পরিবহন ও বিপণন সহজতর হওয়ায় বাজারে এর দাম বিদেশী মাল্টা অপেক্ষা কম হয়ে থাকে। আর কম দামে টাটকা ও ভেজালমুক্ত ফল পাওয়া যায় বিধায় সর্বস্তরের মানুষের কাছে দেশীয় মাল্টার জনপ্রিয়তা দিনদিন বাড়ছে।

tanjimhasan001@gmail.com

Share this news