
Published :
Updated :

হীরা আভিজাত্যের প্রতীক। রাজ-রাজাদের যুগে সম্মান, প্রতিপত্তির পাশাপাশি ক্ষমতাকেও তুলে ধরতো হীরা। যে রাজার কাছে সবচেয়ে দামি ও দুর্লভ হীরা থাকতো সে ততো বেশি প্রতাপশালী ও ক্ষমতাধর। কিন্তু এই হীরাই যদি মানুষের রোগব্যাধির কারণ, উজাড় করে দেয় সাম্রাজ্য কিংবা কারণ হয় মৃত্যুর তাহলে কেমন হবে বিষয়টি? তবে কি সে হীরা অভিশপ্ত? এমনই কিছু কাহিনী জড়িয়ে আছে কোহিনূর হীরা নিয়ে।
ফেব্রুয়ারি মাসে দ্য ইকোনোমিক টাইমসে ‘কোহিনূর হীরা: রাজা চার্লসের ক্যান্সার কি বিখ্যাত এই হীরার অভিশাপে?’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হলে কোহিনূর হীরার অভিশাপের কথা আবারো আলোচনায় উঠে আসে।
কোহিনূর শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে আলোর পাহাড়। ব্রিটিশদের কাছে যখন এই আলোর পাহাড় আসে তখন এর ওজন ছিল ১৮৬ ক্যারেট। ১৮৫২ সালে পুনরায় এই হীরাটি কাটা হয়। বর্তমানে ১০৫.৬ ক্যারেটের এই হীরার আয়তন ৩.৬X৩.২X১.৩ সেন্টিমিটার। এই হীরার সাথে মিশে আছে অভিশাপের গল্প, সম্রাজ্যের পতন ও যুদ্ধের ইতিহাস।
কোহিনূরকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি পাথর খন্ড হিসেবে বিবেচনা করেন অনেকে। এই হীরা নিয়ে মোঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট জহিরউদ্দীন মুহাম্মদ বাবর তার রচিত বাবরনামায় লিখেন, ‘পৃথিবীতে প্রতিদিন যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয় তার অর্ধেকের সমমূল্য এই হীরা’।
কোহিনূর হীরা প্রথম কোথায় পাওয়া গেছে এই নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বেশিরভাগ ইতিহাসবিদের মতে বর্তমান ভারতের তেলাঙ্গানা রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত গোলকন্ডা নামক স্থানে কলুর মাইনে এটি পাওয়া গিয়েছে। আবিষ্কারের সাল নিয়েও বিতর্ক আছে। ধারণা করা হয় ১১০০ থেকে ১৩০০ সালের মাঝে কোহিনূর পাওয়া গিয়েছে।
পুরাণে অভিশাপ নিয়ে বলা হয়েছে, ‘যে এই হীরার মালিক হবে সে পুরো পৃথিবীর মালিক হবে কিন্তু সাথে দূর্ভাগ্যও নিয়ে আসবে নিজের জন্য। শুধু ইশ্বর ও নারী কোনো দূর্ভাগ্য পোহাবে না’।
যদিও এসব কেবলই লোককথা কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত বাস্তবে যার যার কাছে এই হীরা গিয়েছে তাদের প্রায় সবারই জীবনের পরিণতি হয়েছে করুণ।
কোহিনূরের প্রথম উল্লেখযোগ্য অবস্থান পাওয়া যায় ১৬২৮ সালে সম্রাট শাহজাহানের তৈরি ময়ূর সিংহাসনে। ময়ূর সিংহাসন নিজেও ইতিহাসে বিখ্যাত এক বস্তু। ময়ূর সিংহাসনের উপরিভাগে অবস্থান পায় কহিনুর।
১৬৫৮ সালে শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে পুত্র আওরেঙ্গজেব তাকে বন্দী করে। বন্দী অবস্থাতেই ১৬৬৬ সালে আগ্রা দূর্গে তার মৃত্যু হয়।
১৭৩৯ সালে পারস্যের সম্রাট নাদির শাহ ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন। যুদ্ধে তিনি সেসময়ের দিল্লির সম্রাট মুহাম্মদ শাহকে পরাজিত করেন। ভারতবর্ষ থেকে বিপুল পরিমাণ খাজানার সাথে কোহিনূর হীরাও নিয়ে যান নাদির শাহ। নাদির শাহ-ই এই রত্নের নাম দেন ‘কোহিনূর’। তার ঠিক আট বছরের মাথায় ১৭৪৭ সালে নিজের দেহরক্ষীর হাতে খুন হন এই পারস্য সম্রাট।
এরপরে কোহিনূর যায় দুররানি সম্রাজ্যের হাতে। এই সম্রাজ্যের শাসকদের কপালও সুপ্রসন্ন হয়নি। দুররানি সম্রাজ্যের তৃতীয় শাসক জামান শাহ দুররানি ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি নিজের দুই চোখ হারান। জামান শাহের পরে কোহিনূর যায় সুজা শাহ দুররানির কাছে। তিনিও ১৮০৯ সালে ক্ষমতা হারান এবং কোহিনূর হীরা নিয়ে লাহোরে পালিয়ে আসেন।
১৮১৩ সালে লাহোরের শাসক শিখ সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রঞ্জিত সিং, সুজা শাহকে আশ্রয় দেয়ার বিনিময়ে কোহিনূর দাবি করেন। ১৮৪৯ সালে দ্বিতীয় অ্যাংলো-ব্রিটিশ যুদ্ধে শিখ সম্রাজ্যকে পরাজিত করে ব্রিটিশরা। এই যুদ্ধের ফলাফলস্বরূপ লাহোর চুক্তি হয় ব্রিটিশ ও শিখদের মাঝে। সে চুক্তির একটি শর্ত অনুযায়ী কোহিনূর ব্রিটিশদের কাছে চলে যায়। আর ঠিক এভাবেই আজকের দিনে কোহিনূর ব্রিটিশ রাজের সম্পত্তি।
বলা হয়ে থাকে ব্রিটিশরাও কোহিনূরকে ঘিরে কুসংস্কার নিয়ে সচেতন ছিলেন। তাই সময়ের পরিক্রমায় কোহিনূর কোনো না কোনো রানির মুকুটে শোভা পেয়েছে।
রানি ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পরে কোহিনূর রানি আলেকজান্দ্রিয়ার মুকুটে শোভা পায়। ১৯১১ সালে তা কুইন ম্যারির কাছে যায়। ১৯৩৭ সালে দ্য কুইন মাদার, কুইন এলিজাবেথের কাছে যায় এই হীরা। তবে, ২০২৩ সালে কুইন ম্যারির মুকুট বর্তমান রানি ক্যামিলাকে দেয়া হলেও তাতে কোহিনূর ছিল না।
কোহিনূর নিয়ে অভিশাপের গল্প সাধারণ জনগণ অনেক বেশি পছন্দ করে। তাই, ঘুরেফিরে সেসব শাসকদের কথাই আসে যাদের কাছে কোহিনূর ছিল এবং যাদের পরিণতি ভালো হয়নি।
কিন্তু, ইতিহাসে এমন শাসকও ছিলেন যাদের কাছে কোহিনূর ছিল তবে তাদের পরিণতিতে কোহিনূরের অভিশাপ দৃশ্যমান নয়। দুররানি সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ শাহ দুররানি ও তার ছেলে বিখ্যাত আফগান শাসক তৈমুর শাহ দুররানি এর অন্যতম উদাহরণ।
এই দুই শাসকের কাছেই কোহিনূর ছিল। এর মধ্যে আহমেদ শাহ’র মৃত্যু স্বাভাবিক অসুস্থতাজনিত কারণে হয়। তৈমুরের মৃত্যু নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে দ্বিমত থাকলেও তার মৃত্যুও অসুস্থতাজনিত কারণেই হয় বলে ধারণা করা হয়।

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.