Bangla
2 years ago

ফরাসি বিপ্লব: অভ্যুত্থানের পর যেভাবে উদার গণতন্ত্র এলো

আরসোলের যুদ্ধে নেপোলিওনঃ হোরেস ভারনেটের পেইন্টিং ১৮২৬
আরসোলের যুদ্ধে নেপোলিওনঃ হোরেস ভারনেটের পেইন্টিং ১৮২৬

Published :

Updated :

ফরাসি বিল্পব ১৭৮৯ সাল হতে ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত চলা ফ্রান্সে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লবকে বলা হয়। ফরাসি বিপ্লবের মতাদর্শই বর্তমানে লিবারেল বা উদার গণতন্ত্র নীতির ভিত্তি গঠন করে দেয়। ফ্রেঞ্চ সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থানও ঘটে এই ফরাসি বিপ্লবকে কেন্দ্র করেই।

১৮ শতকের শেষের দিকে আমেরিকান বিপ্লবে জড়িত থাকা ও রাজা লুই ষোড়শের অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল ফ্রান্স। ফরাসি সমাজের অসমতা, রাজকীয় কর্মকর্তাদের দুর্নীতি এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে জনগণ বিদ্রোহের দিকে ধাবিত হয়। এই পুরো সময়কালই ফরাসি বিপ্লব নামে পরিচিত। 

শুধুমাত্র যে রাজকীয় কোষাগারই ফাঁকা ছিল তা নয়, বরং কয়েক বছরের অপর্যাপ্ত ফসল ফলন, খরা, দেশ জুড়ে গবাদি পশুর রোগ এবং খাবারের আকাশছোঁয়া দাম কৃষক এবং শহরের নিম্নবিত্তদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। 

ফরাসি রাজা প্রচন্ডহারে কর আরোপ করা স্বত্তেও দেশের দুরবস্থার সময় ত্রাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এই ক্ষোভ থেকে ফরাসিরা দাঙ্গা, লুটপাট ও ধর্মঘট করার মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ শুরু করে এবং এর মধ্য দিয়েই ফরাসি বিপ্লবের শুরু হয়। 

ফরাসি বিপ্লব: একটি সংক্ষিপ্ত সময়রেখা (২০ জুন ১৭৮৯: এস্টেট-জেনারেলের পতন)

এস্টেট-জেনারেল যারা সম্রাটপন্থী তাদের সংসদ ভেঙে পড়ে। তখন তৃতীয় এস্টেটের সদস্য যারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, তারা নিজস্ব পরিষদ গঠন করে সাংবিধানিক সংস্কারে নামে। এটি সেসময়ের রাজার কর্তৃত্বের বিপক্ষে একটি কঠোর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে সাধারণ জনগণ এখান থেকেই স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা শুরু করে। 

১৪ জুলাই ১৭৮৯: বাস্তিল দুর্গের পতন

সামরিক অভ্যুত্থানের ভয় দেখা দিলে ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই বিদ্রোহীদের ধরপাকর শুরু করেন। প্রতিশোধ হিসেবে বিদ্রোহীরা রাজকীয় কর্তৃত্বের প্রতীক বাস্তিল দুর্গে হামলা করে এবং বাস্তিলের পতন হয়। প্যারিস তখন রাজা লুইয়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে জনগণের হাতে চলে আসে। আজও এই দিনটিকে ফ্রান্সের জনগণ বাস্তিল দিবস হিসাবে পালন করে। 

২২ সেপ্টেম্বর ১৭৯২: ফরাসি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

নতুন সংবিধান কীভাবে কাজ করবে তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের পর বিপ্লবীরা রাজাকে গ্রেফতার করে। এর মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লব তুমুল রূপ নেয়। ২২ সেপ্টেম্বর ১৭৯২ সালে সম্মেলন প্রতিষ্ঠিত হয়। 

রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘোষণা করে এবং ফরাসি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে এদিন। পরবর্তীতে রাজাকে বিচারের আওতায় নেওয়া হয় এবং ১৭৯৩ সালের ২১শে জানুয়ারি তাকে বিশ্বাসঘাতক হিসাবে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। 

জুন ১৭৯৩: সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু

রাজার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পর ফ্রান্স বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া শুরু করে। এটি ফরাসি বিপ্লবের সবচেয়ে সহিংস পর্যায় ছিল। 

জাতীয় সম্মেলনের মধ্যে থাকা দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মধ্য দিয়ে উগ্র মন্টাগনার্ডদের (তৎকালীন রাজনৈতিক দল) হাতে ক্ষমতা চলে যায়। তাদের হাত ধরে সন্ত্রাসের রাজত্ব (লা টেরর) শুরু হয়। 

এক বছরব্যাপী মন্টাগনার্ডরা যাদের বিপ্লবের বিরুদ্ধে বলে সন্দেহ হচ্ছিলো, তাকেই মেরে ফেলছিল। এই এক বছরে তাদের হাতে সন্দেহভাজন হিসেবে অন্তত কয়েক হাজার নিহত হয়। 

১৭৯৫: ডিরেক্টরি ক্ষমতা নেয়

একটি নতুন শাসকগোষ্ঠী, যারা ডিরেক্টরি নামে পরিচিত, তারা ১৭৯৫ সালে ফ্রান্সে ক্ষমতা গ্রহণ করে। সেসময়ের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকলেও মুখ ফুটে কেউ প্রতিবাদ করলেই সেনাবাহিনী তাকে নীরব করে দিতো। 

তখন সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন একজন তরুণ জেনারেল, যার নাম ছিল নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। ফ্রান্স তখন যুদ্ধে সাফল্যের পর সাফল্য পেতে থাকে। বর্তমান বেলজিয়াম তখন ফ্রান্সের আওতায় আসে, ডাচ প্রজাতন্ত্র আত্মসমর্পণ করে তাদের কাছে এবং প্রুশিয়ান ও স্প্যানিশদের সাথে শান্তি সম্পর্ক স্থাপন করে ফরাসি সেনাবাহিনী। 

৯ নভেম্বর ১৭৯৯: নেপোলিয়ন যুগ শুরু

ডিরেক্টরির চার বছর ক্ষমতায় থাকা ব্যর্থতার মধ্যে দিয়ে শেষ হয়। শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ডিরেক্টরি সেনাবাহিনীকে অনেক ক্ষমতা প্রদান করে যা তাদের কাল হয়ে দাঁড়ায়। ৯ নভেম্বর ১৭৯৯ এ বোনাপার্ট একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়, ডিরেক্টরি বাতিল করে এবং নিজেকে ফ্রান্সের প্রথম কনসোল (রক্ষাকর্তা) নিযুক্ত করে। এর মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লবের সমাপ্তি হয় এবং নেপোলিয়নিক যুগের সূচনা হয়।

Share this news