Bangla
2 years ago

জগতি জাংশনঃ অযত্ন ও পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে দেশের পুরাতন এই রেল স্টেশন

ইতিহাস বলে ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য ১৮৬২ সালে জগতি স্টেশনটি চালু করা হয়।
ইতিহাস বলে ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য ১৮৬২ সালে জগতি স্টেশনটি চালু করা হয়। Photo : আফরা নাওমী

Published :

Updated :

লাল ইটের দোতলা ভবন দাঁড়িয়ে। যাত্রীরা ঠেলাঠেলি করে ঢুকছে ওয়েটিং রুমে রেলগাড়ির অপেক্ষায়। যেকোনো সময় রেলগাড়ি থামবে। মানুষজন ছোটাছুটি করছে মাল-সামাল নিয়ে। টিকিট কাটার ঘরে টিকিট বিক্রিতে ব্যস্ত রেলের কর্মচারীরা, চোখে মুখে বিরক্তি আর ক্রেতাদের মুখে অসন্তোষ, ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। রেল কর্মচারীর ঘরে ফোন বেজেই চলছে ক্রিং ক্রিং!

ছবি তুলেছেন, আফরা নাওমী

ওদিকে কুলিরা আছে দৌড়ের ওপর। এত এত যাত্রী যে! কাকে রেখে কার মাল-পত্র নেয় তারা। ধান, পান, কাপড়, যন্ত্রাংশ কী নেই এতে! আশপাশে ব্যস্ত চা-দোকানী, বেয়ারা। রেলগাড়ি দেখতে কেমন সেটা নিয়েও কৌতূহলী মানুষের ভিড়। ল্যাম্প-পোস্টে আলো জ্বলছে। হৈ-চৈ হৈ-হুল্লোর চারপাশে।

প্ল্যাটফর্মের পাশেই খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে দুটি ওভারহেড পানির ট্যাংক, এটি কয়লার ইঞ্জিনে চলা পাম্প দিয়ে মাটির নিচে থেকে পানি তুলতে ব্যবহৃত হয়।  অবশেষে ‘কয়লা’ পুড়িয়ে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে ঝক ঝক শব্দে স্টিম ইঞ্জিনের রেলগাড়ি এসে থামলো। এবার হুড়োহুড়ি করে যাত্রীরা উঠে পরার পালা। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে কেউ বা অনুভূতিহীন।

এই হচ্ছে প্রতিদিনকার চিত্র কুষ্টিয়ার জগতি স্টেশনের ব্যস্ত জাংশনের। এই দৃশ্য খুব নিয়মিত ছিল আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে। জগতি স্টেশন, কুষ্টিয়ার প্রথম রেল স্টেশন।

১৮’ শতকের শুরুর দিকে বাস্পীয় ইঞ্জিনের প্রথম রেলগাড়ি নির্মিত হয় ইংল্যান্ডে। আধুনিকায়নের ফলে দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পরে রেলগাড়ির। বাংলাদেশের ভূখন্ডে রেল যোগাযোগের প্রথম চিহ্ন পরে কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়া সদর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরত্বে জগতি রেলওয়ে স্টেশন নির্মিত হয় ব্রিটিশদের হাত ধরেই।

ছবি তুলেছেন, আফরা নাওমী

ইতিহাস বলে ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতার শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য ১৮৬২ সালে জগতি স্টেশনটি চালু করা হয়। তবে এটাই বাংলার প্রথম রেলপথ নয়। এর আগে ১৮৪৪ সালে আর. এম স্টিফেনসন কলকাতার কাছে হাওড়া থেকে পশ্চিম বাংলার কয়লাখনি সমৃদ্ধ রানীগঞ্জ শহর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করেন। এ জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি ১৮৫৪ সালে কলকাতার হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার রেললাইন চালু করে।

পরে ১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কলকাতা থেকে রাণাঘাট পর্যন্ত রেলপথ চালু করা হয়। একই বছরের ১৫ নভেম্বর কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত ৫৩.১১ কিলোমিটার বাড়িয়ে করে ব্রডগেজ রেললাইন শাখা।

উদ্বোধনের দিন থেকেই ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস নামের একটি ট্রেন কলকাতা থেকে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল শুরু করে। পথে এটি থামতো কুষ্টিয়া, কুষ্টিয়া কোর্ট, চড়াইকল কুমারখালী, খোকসা, মাছপাড়া, পাংশা, কালুখালী জাংশন, বেলগাছি, ও সূর্যনগর গোয়ালন্দ বাজার।

এই যোগাযোগকে উন্নত করতে ঢাকার সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো সহজ করা হয়। জগতি স্টেশন নির্মাণের এক দশক পরে ১৮৭১ সালের পয়লা জানুয়ারি জগতি থেকে বর্তমান গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত রেললাইন চালু করা হয়। জনগণ তখন কলকাতা থেকে রেলযোগে জগতি স্টেশন হয়ে গোয়ালন্দঘাটে যেতেন। সেখান থেকে স্টিমারে পদ্মানদী পার হয়ে পৌঁছে যেত ঢাকায়।

সেসময়ে অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার অংশ ছিল আজকের কুষ্টিয়া। ব্রিটিশরা সেই সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এই অঞ্চলকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। এছাড়া, কুষ্টিয়া কলকাতা-রানাঘাট রেলপথের বেশ কাছাকাছি হওয়ায় প্রথম রেল যোগাযোগ এদিক দিয়েই স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জগতি রেলওয়ে স্টেশন স্থাপনের পরেই এই অঞ্চলটি ব্যবসা বাণিজ্যে প্রসার লাভ করে। 

বাংলাদেশের প্রথম সারির চিনিকলের একটি প্রতিষ্ঠিত হয় কুষ্টিয়ায়। পাকিস্তান আমলে কুষ্টিয়া চিনিকল প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে আখ পরিবহনের কাজে জগতি স্টেশনই ব্যবহৃত হত।

কুষ্টিয়ার আশপাশের জেলাগুলোর জন্য এই রেলপথ ধরেই আসতো খাদ্যপণ্যসহ অন্যান্য সামগ্রী যেমন ধান, পাট ইত্যাদি। সেসময়ে কুষ্টিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মোহিনী মিল’ যা সমগ্র এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় কাপড়ের মিল বলে খ্যাতি লাভ করে।

কলকাতার সাথে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকার কারণে এত বড় কাপড়ের কল এখানে চালু করা সম্ভব হয়েছিল। এসব কারণেই প্রতিষ্ঠার পরেই এই অঞ্চলের মানুষের কাছে ‘জগতি স্টেশন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হয়ে ওঠে।

জগতির বর্তমান অবস্থা একেবারেই ভিন্ন। মানুষের আবেগ থাকলেও তার জন্য করণীয় কিছুই করে উঠতে পারেনা। জগতি স্টেশনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। এই লাল ইটের দালান এখন মলীন। দোতলা ঘরে ফাটল ধরেছে। আশপাশ শ্যাওলা, ময়লা জীর্ণ অবস্থায় পরে আছে। কক্ষের ভেতরের যন্ত্রাংশ সবই বিকল। এগুলোর কোনো ব্যবহার ও সংস্কার কিছুই নেই। না আছে আগের মতো জমজমাট চেহরা না জৌলুশ।  

এই স্টেশন পরিত্যক্ত প্রায়। শুধুমাত্র দুইটি লোকাল ট্রেন আছে। মাঝে মাঝে অবশ্য ভারত থেকে কয়লা এবং পাথরবাহী মালগাড়ি আসলে এই স্টেশনে অনেক সময় সেগুলো খালাস হয়। তবে স্টেশন পরিচালনা করার জন্য কোনো কর্মচারি নেই এখানে।

আশপাশের যে রেলকর্মীদের স্টাফ কোয়ার্টার ছিল তাও ধ্বংসের পথে অথবা কারো দখলে। স্থানীয় এক বয়োজেষ্ঠ্য ব্যক্তি করিম মোল্লা বলেন, “ছোট থাকতে কয়েকবার চড়েছি এই ট্রেনে। তখন অনেক ভীড়ও হত। আস্তে আস্তে সব শেষ। এখন ময়লা আবর্জনায় ভরে আছে লাল ইটের দালান গুলো। বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কাজ হয়নি এখন পর্যন্ত। সামনেও হবে কিনা তার কোনো আশা নেই”।   

জগতি স্টেশনে আগে প্রায় ২৫-২৬ জন কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। একজন টিকিট মাস্টার, দুজন সহকারী টিকিট মাস্টার, ছয়জন পয়েন্টম্যান, দুজন পোর্টার ও তিনজন গেটম্যানের পদসহ আরও কিছু পদ ছিল যা এখন কিছুই নেই। বর্তমানে ওই স্টেশনে দুজন গেটম্যান ছাড়া আর কোনো কর্মচারীর খোঁজ পাওয়া যায় না বলে জানায় স্থানীয় বাসিন্দারা।

এছাড়াও এই নির্জন পরিবেশে গড়ে উঠেছে অন্যান্য অনেক সামাজিক সমস্যা যেমন মাদকাসক্তদের আসর, ছিনতাই- ডাকাতির মতো নানা রকম অপকর্ম। প্রচলিত আছে ভূত-পেত্নীর গল্প। অনেকেই নাকি রাত-দুপুরে, অস্বাভাবিক কর্মকান্ড দেখেছে এখানে।

রাত হলেই এই রাস্তা জনসাধারণের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আশপাশের মানুষ এই ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে।

জগতি রেল স্টেশন কেবলই একটি স্টেশন নয়। এর সাথে বাঙালীর ইতিহাস জড়িত। তার চেয়েও বেশি করিম মোল্লার মতো মানুষের শৈশবের স্মৃতির মতো, যেমন কবি শামসুর রাহমান ‘ট্রেন’ কবিতাটি মতো। 

‘ঝক ঝকাঝক ট্রেন চলছে
রাত দুপুরে অই
ট্রেন চলছে ট্রেন চলছে
ট্রেনের বাড়ি কই?
একটু জিরায়ে ফের ছুটে যায়
মাঠ পেরুলেই বন।
পুলের উপর বাজনা বাজে
ঝনঝনা ঝনঝন’।

এখনের ডিজিটাল যুগে অনেক ইউটিউবার ভ্লগ করেও আকুতি জানান জগতিকে টিকিয়ে রাখার।  রেল স্টেশন একে তো একটি আবেগের জায়গা তার ওপর জগতির লাল-ইটের নান্দনিক অবকাঠামো চোখ-জুড়ানো। তাই সম্পূর্ণ ধ্বসে পরার আগেই এর উন্নয়ন প্রয়োজন।

afranawmi@yahoo.com

Share this news