
Published :
Updated :

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এমন একজন লেখক, যাকে পড়া মানে শুধু গল্প বা উপন্যাস পড়া নয়—একটি সময়কে, একটি মানসিকতাকে, একটি রাষ্ট্রের ভেতরের যন্ত্রপাতিকে বুঝতে শেখা। তিনি আমাদের আরাম দেন না, আশ্বাস দেন না; বরং প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। এই কারণেই ইলিয়াস আজও প্রাসঙ্গিক, আজও জরুরি।
তার জন্ম ১৯৪৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, গাইবান্ধায় মামাবাড়িতে। মৃত্যু ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি, ঢাকায়। লিখেছেন দুটি উপন্যাস (চিলেকোঠার সেপাই ও খোয়াবনামা) ও পাঁচটি গল্পগ্রন্থে মোট আটাশটি গল্প। লিখেছেন 'সংস্কৃতির ভাঙা সেতু'-র মতো মূল্যবান প্রবন্ধগ্রন্থ। কেন পড়বেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বই?
ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে—ইলিয়াস পাঠকদের সেটা বুঝতে শেখান
ইলিয়াসের সাহিত্যে ক্ষমতা কখনও স্রেফ সরকার, পুলিশ বা সেনাবাহিনী হয়ে আসে না। বরং ক্ষমতা ছড়িয়ে থাকে সম্পর্কের ভেতর, ভাষার ভেতর, নীরবতার ভেতর। চিলেকোঠার সেপাই পড়লে বোঝা যায়—রাষ্ট্রের দমনযন্ত্র কেবল বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া কিছু নয় বরং মানুষ নিজেই ধীরে ধীরে সেই যন্ত্রের অংশ হয়ে ওঠে।
ইলিয়াস দেখান, কীভাবে মানুষ নিজের নিরাপত্তা, সুবিধা বা ভবিষ্যতের আশায় ধাপে ধাপে আপোষ করে। প্রথমে সামান্য নীরবতা, পরে যুক্তি দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন, আর শেষে পুরোপুরি মানসিক আত্মসমর্পণ। এই ক্ষমতার বিশ্লেষণ আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায়ও ভয়ংকরভাবে প্রাসঙ্গিক।
মধ্যবিত্তীয় ভণ্ডামির সবচেয়ে নির্মম পাঠ ইলিয়াসের লেখায়
বাংলা সাহিত্যে মধ্যবিত্তকে নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে, কিন্তু ইলিয়াসের মতো করে খুব কম লেখকই মধ্যবিত্তের আত্মপ্রতারণা উন্মোচন করেছেন। তার চরিত্ররা খুব পরিচিত 'শিক্ষিত', 'সচেতন' বলে দাবি করে, রাজনৈতিকভাবে ‘বুঝে’ এমন মানুষ। কিন্তু সংকট এলে তারাই সবচেয়ে আগে হিসাব কষে।
ইলিয়াস দেখান, মধ্যবিত্ত কীভাবে নৈতিকতার কথা বলে, কিন্তু সুবিধা হারানোর ভয়ে সেই নৈতিকতাকেই জলাঞ্জলি দেয়। এই ভণ্ডামি তিনি করুণার চোখে দেখেন না; বরং নির্মমভাবে তুলে ধরেন। এই নির্মমতা পাঠকের জন্য অস্বস্তিকর, কারণ আমরা অনেক সময় নিজের ছায়া দেখতে পাই।
ইতিহাসকে তিনি গৌরবগাঁথায় পরিণত করেন না
ইলিয়াসের ইতিহাস মানে বীরত্বের গল্প নয়, বিজয়ের মিছিল নয়। তার ইতিহাস হলো বিভ্রান্তি, ভুল সিদ্ধান্ত, পরাজয় আর ক্ষতচিহ্নের ইতিহাস। খোয়াবনামা তার বড় উদাহরণ। এখানে ইতিহাস আসে সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে যারা যুদ্ধ বোঝে না, রাজনীতি বোঝে না, কিন্তু তার ফল ভোগ করে।
ইলিয়াস দেখান, ইতিহাস কখনও একরৈখিক নয়। যে বিপ্লব আজ ন্যায্য মনে হয়, কাল তা দমনযন্ত্রে পরিণত হতে পারে। এই ইতিহাসবোধ পাঠককে সরল দেশপ্রেম বা সরল রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বের করে আনে।
ভাষা: সংযত, কিন্তু গভীর এবং তীক্ষ্ণ
ইলিয়াসের ভাষা বাহুল্যপূর্ণ নয়। তিনি আবেগ দিয়ে পাঠককে কাঁদাতে চান না, অলংকার দিয়ে মুগ্ধ করতে চান না। তার ভাষা সংযত, কখনও প্রায় নিরাবেগ কিন্তু সেই সংযমের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ভয়, দমন আর অস্বস্তি।
অনেক সময় ইলিয়াসের লেখায় যা বলা হয়নি, সেটাই সবচেয়ে বেশি বলে। নীরবতা, অসম্পূর্ণ বাক্য, থেমে যাওয়া সংলাপ এইসব দিয়েই তিনি বাস্তবের চাপ তৈরি করেন। এই ভাষা পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে, ব্যাখ্যা নিজে খুঁজে নিতে বাধ্য করে।
ইলিয়াস প্রমাণ করেন, রাজনৈতিক সাহিত্য মানেই বক্তৃতা, শ্লোগান বা আদর্শের প্রচার নয়। বরং রাজনীতি সবচেয়ে শক্তিশালী হয় তখন, যখন তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ঢুকে পড়ে যেমন, খাবার টেবিলে, অফিসে, বন্ধুত্বে, দাম্পত্যে। তার লেখায় রাজনীতি আসে সিদ্ধান্তহীনতায়, ভয়ে, সুবিধাবাদে। এই সূক্ষ্ম রাজনৈতিক বোধ আজকের সময়ের লেখক ও পাঠকের জন্য খুব জরুরি শিক্ষা।
বাংলাদেশকে বুঝতে ইলিয়াস পড়া দরকার
নজরদারি, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ‘ভালোমানুষি’ নীরবতা, সুবিধাভিত্তিক নৈতিকতা—এইসব শব্দ আজ আমাদের বাস্তবতার অংশ। ইলিয়াস বহু আগেই এই মানসিক কাঠামোর সাহিত্যিক মানচিত্র এঁকেছেন। আজ যখন মানুষ প্রকাশ্যে কম কথা বলে, নিজেকে গুটিয়ে রাখে, তখন ইলিয়াস আমাদের শেখান এই নীরবতা নিরীহ নয়; অনেক সময় এটি ক্ষমতার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।
ইলিয়াস পাঠককে আরাম দেন না—সতর্ক করেন
ইলিয়াসের লেখায় মুক্তির সহজ পথ নেই, নায়ক নেই, চূড়ান্ত সমাধান নেই। আছে প্রশ্ন, দ্বিধা আর অস্বস্তি। কিন্তু, এই অস্বস্তিই পাঠককে সজাগ করে তোলে। ইলিয়াস পড়া মানে শুধু সাহিত্য পাঠ নয় এটা এক ধরনের মানসিক প্রস্তুতি। এমন এক প্রস্তুতি, যেখানে মানুষ শুধু সাহিত্য থেকে আনন্দই লাভ করে না বরং ভাবতে শেখে। ঋত্বিক ঘটক বলেন, "ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো" ইলিয়াস এই ভাবতেই সাহায্য করে।
mahmudnewaz939@gmail.com

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.