
Published :
Updated :

বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে মাহে রমজান। রমজান মাসে দৈনন্দিন জীবনের খাদ্যাভাসে নানা পরিবর্তন আসে। সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকার পর ইফতারে বাহারি পদের খাদ্যের সমাহার দেখা যায় আমাদের টেবিলে। বিভিন্ন মৌসুমি ফলের শরবত, ছোলা, মুড়ি, ভাজা-পোড়া, জিলাপি, হালিম- মুখরোচক বিভিন্ন ইফতার রমজান মাসের উৎসবের আমেজ আরো বাড়িয়ে তোলে।
মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতেও আছে নানা পদের সুস্বাদু ইফতার।
সাম্বুচা
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইফতার আয়োজনকারী দেশ সৌদি আরবের জনপ্রিয় ইফতার আইটেম হলো সাম্বুচা। এটির আকৃতি আমাদের দেশের সমুচার মতো। সাম্বুচা তৈরি হয় মাংসের কিমা দিয়ে। কিন্তু এর বিশেষত্ব হলো এতে কোনো ধরনের মরিচ দেয়া হয় না।

মাংসের কিমা ও মটরশুটি দিয়ে তৈরি সাম্বুচা, ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবে মসজিদে নববীতে প্রতিদিন লাখো মানুষ একসাথে ইফতার করে থাকেন। এখানকার ইফতারে থাকে নানা ধরনের মুখরোচক খাবার। কোনাফা, ত্রোম্বা, বাছবুসা নামক নানা রকম হালুয়া এ খাবার-দাবারের অংশবিশেষ। এছাড়া থাকে সালাতা, যা হচ্ছে এক প্রকার সালাদ। আরো থাকে সরবা, জাবাদি দই, লাবান, খবুজ (ভারী ছোট রুটি) বা তমিজ (বড় রুটি)। আর খেজুরের নানা রকম লোভনীয় আইটেম তো রয়েছেই।
ফুল মেডাম্যাস
মিশরের জনপ্রিয় খাদ্য ফুল মেডাম্যাস। এটি ফাভা বিন দিয়ে তৈরি এক ধরনের তরকারি। বেশিরভাগ মিশরীয়রা রোজা ভাঙ্গেন রুটির সাথে ফুল মেডাম্যাস খেয়ে। এছাড়াও থাকে ফলের রস। মিশরীয়রা মূলত অ্যাপ্রিকট ফল শুকিয়ে তাকে জুস করে ইফতারে পান করেন। এটি যেমন সুস্বাদু, তেমনি দারুণ পুষ্টিকর। অ্যাপ্রিকট ছাড়াও এক বিশেষ ধরনের পানীয়ও তৈরি করেন মিশরীয়রা, যার নাম কামার আল দিনান্দ আরাসি। শুকনা আখরোট সারাদিন পানিতে ভিজিয়ে রেখে পানীয়টি প্রস্তুত করা হয়। মিশরীয়রা মিষ্টিপ্রিয় বলে রোজার মাসে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিও তারা তৈরি করেন। সেগুলোর মধ্যে বিখ্যাত কয়েকটি হলো- কানাফা, কাতায়েফ ও বাকলাভা।

ফুল মেডাম্যাস, ছবি: সংগৃহীত
মিশরে ইফতার আয়োজন করা হয় চিরাচরিত মিশরীয় সংস্কৃতির আকর্ষণীয় ও রুচিশীল উপায়ে। মিশরের এক পুরোনো ঐতিহ্য হলো রাস্তায় অনেক মুসল্লি একসঙ্গে মিলিত হয়ে ইফতার করা। ইফতারে সবশেষে কড়া চা পান করে তারা তারাবীহ নামাজের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
শোলে জার্দ
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে শোলে জার্দ নামক মিষ্টান্ন প্রতিদিনের ইফতারে থাকে। এটি হলো ছোট চাল, চিনি আর জাফরান দিয়ে রান্না করা একধরনের ক্ষির বা পায়েশ। এছাড়াও তারা নানা ধরনের ফলমূল, পানীয় ও মিষ্টান্ন দিয়ে ইফতার করে থাকেন। ফলের মধ্যে থাকে খেজুর, আপেল, চেরি, তরমুজ আখরোট, তলেবি বা এক ধরনের বাঙ্গি, কলা, আঙ্গুর ইত্যাদি। এছাড়া, মধু, রুটি, পনির, দুধ, পানি, চা উল্লেখযোগ্য।

শোলে জার্দ, ছবি: ইন্টারনেট
ইরানের এক বিশেষ ধরনের স্যুপ ইফতারে বেশ প্রচলিত। ‘অ্যাশ রেশতেহ’ নামে এই স্যুপে থাকে চিকন নুডলস, দুগ্ধজাত মাঠার মতো জলীয় দ্রবণ এবং সঙ্গে ধনিয়া, পালং, পেঁয়াজের মতো অন্যান্য উপাদান। তাদের ইফতারের অন্যতম জনপ্রিয় একটি উপাদান বুটের ডাল ও মাংস দিয়ে তৈরি শামি কাবাব। এছাড়াও থাকে এক ধরনের জিলাপি ও হালিম। এগুলোর স্বাদ বাংলাদেশের জিলাপি ও হালিমের মতো নয়। ইরানীদের খাদ্য তালিকায় ভাজা-পোড়া আইটেম তেমন থাকে না। এরা তাজা খাবার খেতেই বেশি পছন্দ করে।
মানসাফ
জর্ডানের জনপ্রিয় ইফতার আইটেম হলো মানসাফ। এটি তাদের জাতীয় খাবারও বটে। মানসাফ তৈরি করতে প্রথমে ভেড়ার মাংসকে হালকা মসলা দিয়ে রান্না করা হয়। পরে তার ওপর দই ও কাজুবাদাম দিয়ে সাজানো হয় এবং সেটা রুটি দিয়ে পরিবেশন করা হয়।

মানসাফ, ছবি: ইন্টারনেট
রাজকীয় জর্দানে রমজান পালন করা হয় ভিন্ন আমেজে। তাদের বিখ্যাত সংস্কৃতির একটি হলো গোশতের শরবত। দেশি গম ও গোশত দিয়ে তৈরি করা হয় এই শরবত। রমজানে হরেক রকম কফিও তৈরি হয় রাজধানী আম্মানে। অতিথিদের বিভিন্ন রঙের কয়েক প্রকার কফি পরিবেশন করা জর্দানি সংস্কৃতির অংশ। রমজানে মসজিদে ইফতারের সাধারণ আয়োজনেও থাকে গরম কফি।
পিটেহ
তুরস্কের মুসলিমদের ইফতারের অন্যতম প্রিয় পদ হলো পিটেহ। এটি এক ধরনের নরম ও তাজা রুটি। পুরো রমজান মাসজুড়েই তুরস্কের মানুষ খেয়ে থাকেন হাতে বানানো তাজা পিটেহ রুটি। পুরো তুরস্কের সব বেকারিই গরম গরম এই রুটি তৈরি করে। রুটির ভেতরে বিভিন্ন মাংস বা সবজি দিয়ে পরিবেশন করা হয় অনেক সময়।

পিটেহ রুটি, ছবি: ইন্টারনেট
এছাড়াও খেজুর, কালো এবং সবুজ জলপাই, তার্কিশ সাদা পনির, মশলাদার গরুর মাংসের পাতলা স্লাইস, মসলাদার সসেজ, মিষ্টি মাখন, ফল, মধু, প্রচুর পরিমাণে টমেটো ও শশা খেয়ে থাকেন তারা। ইফতারে তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী খাবারের ধারাবাহিকতা চলতেই থাকে। ভাত, বিভিন্ন সবজি দিয়ে রান্না মাংসের কিমা, খোপতে (মিটবল), পাস্তিরমাহ (মসলাযুক্ত গরুর মাংস), কাজু তান্দির বা তন্দুর করা ভেড়ার মাংস, হানকার বেগেন্ডি, মানতি বা তুর্কির বিশেষ প্রক্রিয়ার রান্না করা ডাম্পলিংস ইত্যাদি হলো তুরস্কের জনপ্রিয় ইফতার আইটেম।
শুধু ইফতারের মধ্যেই তুর্কিদের সন্ধ্যার আয়োজন শেষ হয়ে যায় না। বিভিন্ন ধরনের বাকালাভা, কুনাফা, টার্কিশ ডিলাইট, গুল্লাক, রেভানি, কায়মাকলি ক্যাসি ইত্যাদি মিষ্টান্ন থাকে ইফতারের পর।
ফাইয়াজ আহনাফ সামিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
faiyazahnaf678@gmail.com

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.