Bangla
10 months ago

নীলক্ষেতের ফুটপাতে কেন সবরকম বই কম দামে পাওয়া যায়?

Published :

Updated :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ পার হলেই নীলক্ষেতের ফুটপাত জুড়ে দেখা মেলে অসংখ্য বইয়ের দোকান। এই দোকানগুলোতে খুব কম দামে পাওয়া যায় দেশি-বিদেশি লেখকদের বই। একটু ভালো করে দেখলে যে লেখকের নাম সবচেয়ে বেশি দেখতে পাবেন তিনি কলিন হুভার. 

আমেরিকান এই লেখিকার একটি প্যাপার-ব্যাক বই অ্যামাজন থেকে কিনতে গুণতে হবে কমপক্ষে ১০ ডলার। এই লেখিকার একটি প্রিন্টেড নতুন বই পড়তে আপনাকে কিন্তু এতো টাকা খরচ করতে হবে না। ১ ডলারের ও কম, অর্থাৎ ১০০ টাকাতেই আপনি কিনতে পারবেন এই লেখিকার যেকোনো বই। শুধু কলিন হুভার নয়, দেশি-বিদেশি অনেক লেখকের বই অত্যন্ত কম দামে পেয়ে যাবেন নীলক্ষেত ফুটপাতের বইয়ের দোকানগুলোতে। 

সমরেশ মজুমদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কল্লোল লাহিড়ী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এপার বাংলার হুমায়ুন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহসহ সবার নতুন ছাপা বই পেয়ে যাবেন এই দোকানগুলোতে। বিদেশি ভাষার লেখকদের মধ্যে কালজয়ী জন মিল্টন, শেক্সপিয়র, পাউলো কোয়েলহোর বই যেমন পাবেন, পাশাপাশি অধিক সংখ্যায় দেখবেন কলিন হুভার, জোজো ময়েজ, জন গ্রীনদের মতো একবিংশ শতাব্দীর লেখকদের বই। 

বিক্রেতাদের বই নির্বাচন

সোহরাব হোসেন নামে পঞ্চাশোর্ধ একজন বিক্রেতা নীলক্ষেতের ফুটপাতে বই বিক্রি করেন নব্বইয়ের দশক থেকে। তার কাছে জানতে চাওয়া হলো কিভাবে ঠিক করেন কোন কোন বই রাখবেন, কোন ধরনের বইয়ের চাহিদা বেশি। তার ভাষ্যে, এখন ইংরেজি ভাষার উপন্যাস এবং মোটিভেশনাল বইয়ের চাহিদা বেশি। অতীতে এমনটা ছিল না বলেও জানান তিনি। 

নীলক্ষেতের সবচেয়ে পরিচিত ফুটপাতের বইয়ের দোকান থেকে বই কিনছেন একজন ক্রেতা

তিনি বলেন, “৭-৮ বছর হলো ইংরেজি বইয়ের এতো চাহিদা। এর আগে আমরা নামও জানতাম না এসব বইয়ের। কাস্টমাররা এসে জিজ্ঞেস করে এই বই আছে কিনা, ঐ বই আছে কিনা। যেসব বইয়ের ব্যাপারে বেশি শুনি সেগুলোই আনি।“ 

বইয়ের দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে It ends with us, It starts with us, Five feet apart, The fault in our stars, Me before you, ইত্যাদি রোমান্টিক উপন্যাসের সংখ্যা বেশি। Dopamin detox, Rich dad Poor dad এর মতো নন-ফিকশন এবং Before the coffee gets cold, Before the coffee gets cold: Tales from the café’র মতো ফিকশনাল অণুপ্রেরণাদায়ক বইয়ের চাহিদাও আছে। 

বাংলা সাহিত্যের হিমু সিরিজ, মিসির আলি সিরিজ, ইন্দুবালা ভাতের হোটেল, আরণ্যক, আদর্শ হিন্দু হোটেল, তারানাথ তান্ত্রিক, শাপমোচন, চিতা বহ্নিমান, কাঁদো নদী কাঁদো, পদ্মা নদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা, সাতকাহন, কালবেলা, ছবির দেশে কবিতার দেশে, কাকাবাবু সমগ্র, ইত্যাদি বইয়ের দেখা মিলেছে। 

বই সংগ্রহ, ছাপানো ও দাম নির্ধারণ 

বইগুলো সাধারণত ইন্টারেন্ট থেকে পিডিএফ ফাইল আকারে ডাউনলোড করা হয়। যদি ভালো মানের পিডিএফ না পাওয়া যায় তখন এই বিক্রেতারা একটি কপি কিনে সেটাকে কম্পোজ করে নেন। 

সোহরাব হোসেন জানান, “প্রয়োজনে আমরা লেখাগুলোকে মূল লেখার চেয়ে ছোট অক্ষরে (ফন্ট) বানিয়ে নেই। এতে কাগজ কম লাগে, দাম ও কম রাখা যায়।” 

বইগুলো প্রিন্ট করা হয় নীলক্ষেতের পেছনে গাউসুল আজম মার্কেটে। সাধারণত এক হাজার কপি বই একবারে প্রিন্ট করা হয়। প্রিন্ট করতে নিউজ প্রিন্ট, হোয়াইট প্রিন্ট দুই ধরনের কাগজই ব্যবহার করা হয়। কাগজের মান হয় খুবই নিম্নমানের। সোহরাব হোসেন জানান, “একদম সস্তা কাগজ ব্যবহার করতে হয়। কারণ আমাদের কাস্টমাররা অল্প দামে বই কিনতে চান।” 

সাধারণত বিক্রেতারা বইয়ের সাইজ ও কাগজের মানের উপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করেন। নিউজ প্রিন্টের বইগুলো সাধারণত ৯০-১২০ টাকার মধ্যে বিক্রি করেন। হোয়াইট প্রিন্টের ক্ষেত্রে দামটা সামান্য বাড়ে। এই বইগুলোর কোনো নির্ধারিত দাম নেই। বিক্রেতারা ক্রেতার কাছে ১৫০-২০০ টাকা দাম চেয়ে থাকেন। 

ক্রেতার ধরন ও তাদের ভাবনা

নীলক্ষেত ফুটপাতের বই ক্রেতার বড় অংশ হলো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। পুরুষের তুলনায় নারী ক্রেতার সংখ্যা বেশি এসব বইয়ের। এখান থেকে বই কেনার সবচেয়ে বড় কারণ এখানে বইয়ের দাম খুব কম। 

সামিয়া ইসলাম নামের এক ক্রেতা বলেন, “স্টুডেন্ট হওয়ায় আমার কাছে খুব বেশি টাকা থাকে না। নীলক্ষেত আমার কাছে গোল্ড কয়েনের মতো। আমার পড়া শেষে আবার চাইলে এগুলো নীলক্ষেতে বিক্রিও করে দিতে পারি।”

এখানে বই কিনতে হলে ক্রেতাকে দামাদামিতে পারদর্শী হতে হয়। দামাদামি করতে পারলে এখানের বই কেনার অভিজ্ঞতা ভালো হয়। 

পপ কালচারড বই কেন পড়তে পছন্দ করেন এমন প্রশ্নের বিভিন্ন উত্তর পাওয়া গেছে। কারো কাছে ক্লাসিক বই দূর্বোধ্য লাগে বলে তারা এগুলো পড়েন। সোশ্যাল মিডিয়াতে এসব বইয়ের ব্যাপারে ব্যাপক আলোচনাও একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। কেউ কেউ কেবলই বিনোদনের জন্য পড়েন। 

নৈতিকতার দায় ও বইয়ের প্রভাব 

কোনো যুক্তি দিয়েই পাইরেটেড এসব বইয়ের ক্রয়-বিক্রয়কে বৈধতা দেয়া যায় না। আসল বইয়ের দাম বেশি বলেই পাইরেটেড কপি কেনা যুক্তিযুক্ত হয় না। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. নাদির জুনাইদ বলেন, “পাইরেসি করা মানে লেখক ও পাবলিশারকে ঠকানো। দাম বেশি এক্ষেত্রে অজুহাত হতে পারে না। পাইরেটেড বই বিক্রি বন্ধে কঠোর আইন করার পাশাপাশি পাবলিক লাইব্রেরির সংখ্যা বাড়ানো উচিত।”

সুস্থ বিনোদনের অভাব তরুণদেরকে সস্তা, অন্তঃসারশূন্য বিদেশি বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করছে। অধ্যাপক নাদির জুনাইদের মতে এসব বই আমাদের চিন্তা ও মেধাকে বাড়াচ্ছে না।

[email protected]

Share this news