
Published :
Updated :

“বিকাশে টাকা পাঠানো হয়” – সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশি অধ্যুষিত পাড়াতে গেলে বিভিন্ন দোকানে এই সাইন বোর্ড চোখে পড়বে। এর মধ্যে অধিকাংশ দোকানই মুদির দোকানের মতো যেখানে প্রাত্যহিক বাজার-সদাই করা যায়; যেখানে শাক-সবজি সহ সকল খাবার সহজেই পাওয়া যায়।
সৌদি আরবে যে সকল নিম্নবিত্ত বাংলাদেশিরা থাকেন, তারা মূলত এই সকল দোকান থেকেই তাদের প্রাত্যহিক বাজার করেন। আমাকেও মাঝে মধ্যে এই সকল দোকানে যেতে হয়। কারণ দেশীয় শাক-সবজি এই সকল দোকানে সব সময়ই পাওয়া যায়। আবার বাসার কাছের আধুনিক সুপার মার্কেট থেকে এই সকল মুদি দোকানে জিনিস পত্রের দামও কিছুটা কম।
একদিন দোকানীকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা ভাই, আপনাদের এখানে যে বিকাশে টাকা পাঠানো যায়, এগুলো কি বৈধ চ্যানেলে যায়?”
আমার প্রশ্ন শুনে দোকানি এক গাল হেসে বললেন, “অবশ্যই। আপনার কাছে কেন মনে হচ্ছে এটা অবৈধ?”
“না। আসলে এই টাকা কিভাবে দেশে যাচ্ছে, এটা একটু বলবেন? এগুলো কি ব্যাংকের মাধ্যমে যায়?”
“জ্বি অবশ্যই, ব্যাংকের মাধ্যমেই তো যায়।“
“আপনাদের কি তাহলে ব্যাংক একাউন্ট আছে?”
“হ্যাঁ, আছে।“
“তাহলে আমি এখানে যদি সৌদি রিয়াল আপনাকে দেই, তাহলে টাকাটা কিভাবে দেশে যাবে?”
“আমরা আপনার কাছ থেকে সৌদি রিয়াল নেব। তারপর আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে তা দেশে পাঠিয়ে দেব। ব্যাস। এরপর আপনার গ্রাহক তার বিকাশে তার টাকা পেয়ে যাবে।“
আমি তার উত্তর শুনে কিছুতে বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। একদিকে বিকাশ একটি বৈধ পন্থা। দেশে বিকাশ লাইসেন্স নিয়ে টাকা স্থানান্তরের ব্যবসা করছে। অন্যদিকে জেদ্দার দোকানি বলছে, তারা বিকাশের মাধ্যমেই টাকা পাঠাচ্ছে। আবার ব্যাংকেও নাকি তাদের একাউন্ট আছে। তাহলে তো এটা বৈধ পথেই হচ্ছে।
এই ধারণা নিয়েই আমি কিছুদিন চললাম। তবে গেল বছর একটি সংবাদ পড়ে বিভ্রান্তিটা কেটে গেল অনেকটা। জানতে পারলাম সরকার দেশে এমন অনেক বিকাশ একাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে যেগুলো হুন্ডির জন্য ব্যবহার করা হত।
বিষয়টা নিয়ে কথা বললাম কয়েকজন সহকর্মীর সাথে। তাঁরা জানালেন যে তাঁরা দেশে টাকা পাঠান সৌদি সরকারি মোবাইল প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ এসটিসি-র মাধ্যমে। এখানে অবৈধ চ্যানেলের কোন সুযোগ নেই। যে টাকা পাঠানো হয়, তার জন্য একটি চার্জ সরকার কেটে রাখে। ফলে সরকারি যে রেট সেটাই পাওয়া যায়। এর বেশি পাওয়া যায় না।
এসটিসি অ্যাপের মাধ্যমে টাকা কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংক হিসাব ছাড়াও বিকাশ একাউন্টেও পাঠানো যায়। তাহলে বিকাশে বিদেশ থেকে টাকা পেলেই যে তা অবৈধ পথে এসেছে, সেটাও নয়। এই টাকা বৈধ পথেও আসতে পারে।
আগের যুগে বলা হত ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠালে বৈধ। আর ব্যাংকের বাইরে গেলেই তা অবৈধ। কিন্তু মোবাইল মানি ট্রান্সফারের যুগ আসার পর থেকে এই বৈধ-অবৈধের সীমারেখা অনেকটাই বদলে গেছে। এখন কোন চ্যানেল বৈধ, আর কোন চ্যানেল অবৈধ – তা নির্ধারণ করা বেশ কঠিন।
আমি তখন খেয়াল করলাম, আমি সময় সময় ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে পরিবারের কাছে যে টাকা পাঠাই, তাতেও কিন্তু সৌদি সরকারকে একটি চার্জ দিতে হয়। আমার টাকা সরাসরি যাচ্ছে দেশে পরিবারের ব্যাংক একাউন্টে। এখানে বিকাশের মাধ্যমে কোন টাকা যাচ্ছে না। তাই এটাও বৈধ চ্যানেলেই যাচ্ছে – কোন সন্দেহ নেই।
দেশের পত্রিকাতে বিকাশ একাউন্ট বন্ধ করার সংবাদ পড়ে আমি আবারো দোকানিকে গিয়ে ধরলাম।
“ভাই, আপনি যে বললেন, এই টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে যাচ্ছে, আপনি কি তাহলে সৌদি ব্যাংককে এর জন্য চার্জ দেন? আপনি যে রেট বললেন, এতে তো মনে হয় এই ধরনের কোন চার্জ আপনাকে দিতে হয় না।“
আমার প্রশ্ন শুনে দোকানি আমতা আমতা করতে লাগল। সরাসরি কোন উত্তর দিল না।
আমি বুঝলাম, ডালমে কুছ কালা হ্যায়। আমি আর তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
আমি ফিন্যান্সের একজন গ্রাজুয়েট। অর্থনীতি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করি। সেই আমিও কিন্তু বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম দোকানির কথা শুনে। চট করে বুঝতে পারলাম না কোনটি বৈধ, আর কোনটি অবৈধ।
এই যদি হয় আমার অবস্থা, তাহলে সৌদি আরবে যে সকল স্বল্প শিক্ষিত, অশিক্ষিত শ্রমিক কাজ করছে, তারা কীভাবে বুঝবেন কোনটা বৈধ চ্যানেল, আর কোনটি অবৈধ?
এটা যদি তাঁরা না বোঝেন, তাহলে যে পন্থায় তাদের টাকা পাঠানো সবচেয়ে সহজ, তাঁরা সেই পন্থাই স্বাভাবিকভাবে বেছে নেবেন। এখানে বৈধ-অবৈধের কোন বিষয় কাজ করবে না।
বৈধ পন্থায় টাকা পাঠানোর আরো সমস্যা রয়েছে।
বৈধ পথে টাকা পাঠাতে হলে সৌদি আরবে ব্যাংক একাউন্ট থাকতে হয়। ব্যাংক একাউন্ট খুলতে হলে রেসিডেন্ট পারমিট লাগে, যা অনেকেরই নেই। তাই তারা বাধ্য হয়েই অবৈধ পথেই টাকা পাঠান।
অবৈধ পথে টাকা পাঠানোর সুবিধাও প্রবাসীদেরকে এই পথে আকৃষ্ট করে। বিকাশে এই পন্থায় টাকা পাঠাতে হলে দোকানিকে দেশের বিকাশ নম্বর দিয়ে হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ দিলেই হয়ে যায়। পরবর্তী কোন সময় দোকানে গিয়ে টাকা মিটিয়ে দিলেই হয়। এই সুবিধা ব্যাংকিং চ্যানেলে নেই।
ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে হলে হয় ব্যাংকে যেতে হবে, না হলে অনলাইন পোর্টালে ঢুকে কয়েক ধাপ পার হয়ে তারপর টাকা পাঠাতে হবে। তাই ঝক্কি কিছুটা হলেও বেশি। এই ঝক্কি আবার এসটিসি অ্যাপসের ক্ষেত্রে অনেক কম। যারা এসটিসি অ্যাপসের মাধ্যমে টাকা পাঠান, তারা শুধুমাত্র অ্যাপসে লগ ইন করেই দ্রুত টাকা পাঠাতে পারেন।
আবার দেশে অনেকেরই কোন ব্যাংক একাউন্ট নেই। কিন্তু তাদের আবার সকলের বিকাশ একাউন্ট রয়েছে। তাই ব্যাংক একাউন্টে না পাঠিয়ে বিকাশে পাঠানো অনেক সহজ। এতে দেশে থাকা পরিবার সাথে সাথেই টাকা পেয়ে যাবে।
আবার সৌদি ব্যাংক একাউন্ট থেকে দেশের কোন ব্যাংকে সরাসরি টাকা পাঠালে তা যেতে কিছুটা সময় লাগে। এই সময় আবার বেঁচে যায় যদি কারো Quick Pay একাউন্ট থাকে। সৌদি আরব এবং বাংলাদেশের অনেক ব্যাংকের সাথে এই Quick Pay সার্ভিসের চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে ব্যাংকগুলি থেকে Quick Pay সার্ভিসের মাধ্যমে কয়েক ঘন্টার মধ্যে টাকা পাঠানো যায়। কিন্তু সমস্যা হল এর জন্য Quick Pay -র আলাদা একাউন্ট খুলতে হয়। এই একাউন্ট খুলতে গেলে আবার ইংরেজিতে একটি ফর্ম পূরণ করতে হয় যা অনেক স্বল্প শিক্ষিত প্রবাসীর পক্ষে সম্ভব নয়।
তাই হুন্ডিকে আটকানো আসলে সহজ নয়।
বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে যে পরিমাণ টাকা বৈধ চ্যানেলে আসে, একই পরিমাণ টাকা নাকি অবৈধ চ্যানেলেও আসে। এই টাকার পুরোটাই যদি বৈধ চ্যানেলে আসত, তাহলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার কোন সঙ্কট থাকত না। তাই সরকারের উচিত এই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া। এই বিষয়ে আমার পরামর্শ হলঃ
১। টাকা পাঠানোর কোন পন্থা বৈধ, এবং কোন পন্থা অবৈধ তা পরিস্কার করে আধুনিক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রবাসীদেরকে এই বিষয় সচেতন করতে হবে। এই বিভ্রান্তি নিরসন না হলে শুধুমাত্র প্রণোদনা দিয়ে হুন্ডিকে আটকানো যাবে না;
২। বিদেশে যে সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অবৈধ পথে টাকা পাঠাচ্ছে, তাদেরকে বৈধ করার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। এর জন্য বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস থেকে একটি সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করা যায়। দূতাবাসের কর্মকর্তারা রেমিটেন্স পাঠানো প্রতিষ্ঠানের টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া পরীক্ষা করে এই সার্টিফিকেট দিবেন। এই সার্টিফিকেট রেমিটেন্স পাঠানোর প্রতিষ্ঠান সর্বসমক্ষে ঝুলিয়ে রাখবে যা দেখে সবাই বুঝতে পারবেন, এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত।
৩। যে সকল ব্যক্তি অধিক পরিমাণে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন, তাদেরকে বিভিন্ন স্বীকৃতি অনেক আগ থেকেই দেয়া হচ্ছে। কিন্তু যে সকল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই সকল রেমিটেন্স পাঠানো হচ্ছে, তাদেরকে স্বীকৃতি প্রদানের কোন ব্যবস্থা এখনো নেই। এই ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। এটা শুধু দেশীও ব্যাংকগুলির ক্ষেত্রে নয়, বরং বিদেশে অবস্থিত যে সকল প্রতিষ্ঠান এই রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে, তাদের জন্যও এই স্বীকৃতির প্রয়োজন রয়েছে। এই সকল প্রতিষ্ঠান দূতাবাসের মাধ্যমে বৈধ হওয়ার পর যদি মাসে মাসে তাদের রেমিটেন্সের তথ্য দূতাবাসের সাথে শেয়ার করে, তাহলে দূতাবাসের মাধ্যমে এই সকল প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি প্রদান করা কঠিন কিছু নয়।
৪। বাংলাদেশি যে সকল প্রবাসীরা নানা কারণে অবৈধভাবে বিদেশে বসবাস করছেন, তারা কিভাবে বৈধ পথে কোন কাগজপত্র ছাড়া টাকা পাঠাতে পারেন, তার পথ তালাশ করতে হবে। এটা কঠিন কোন বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজনে বিদেশি সরকারগুলির সাহায্যও নেয়া যেতে পারে।
৫। বাংলাদেশ থেকে যখন কোন নাগরিক বিদেশে চাকরি নিয়ে আসছেন, তখন নিশ্চিত করতে হবে তিনি যেন তার পরিবারের নামে বাংলাদেশের ব্যাংকে একাউন্ট খুলে আসেন। আবার একই সাথে বিদেশি রিক্রূটিং এজেন্সিকেও সরকার থেকে বলে দিতে হবে উক্ত প্রবাসীর নামে যেন একটি বৈধ ব্যাংক একাউন্ট খুলে দেয়া হয়। এতে বৈধ পথে টাকা পাঠানো উৎসাহিত হবে। একই সাথে প্রবাসীর কাছ থেকে লিখিত প্রতিশ্রুতি নিতে হবে তিনি যেন এই একাউন্ট দুটির মাধ্যমেই নিয়মিত তার টাকা দেশে পাঠান। যেহেতু এটা হবে সরকারি একটি নিয়ম এবং একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার অধীনে, সেহেতু অনেক প্রবাসী এই নিয়ম সব সময় পালন করবেন।
সরকার যদি চায় হুন্ডিকে বন্ধ করতে, তাহলে তা অসম্ভব কিছু নয়। সামান্য পদক্ষেপ নিলেই তা সম্ভব। তবে তার জন্য মেহনত এবং সদিচ্ছার প্রয়োজন রয়েছে। মানুষ কখনই নিজের ইচ্ছায় অবৈধ পথ অনুসরণ করে না। অবৈধ পথ মানুষ তালাশ করে যখন বৈধ পথ কঠিন হয়ে যায়। তাই অবৈধ হুন্ডিকে আটকাতে হলে বৈধভাবে টাকা পাঠানোর পথকে সহজ করতে হবে। এর বিকল্প কিছু নেই।
লেখক জেদ্দা প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকে কর্মরত। ideasfd@gmail.com

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.