Bangla
a month ago

ব্রিটিশ আমল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চলে আসছে যে মিষ্টি

Published :

Updated :

মিষ্টিজাতীয় খাবারের প্রতি বাঙালির ঝোঁক ঐতিহাসিক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই শত বছরের ঐতিহ্যবাহী নানান মুখরোচক মিষ্টি তার প্রমাণ। ১৮১ বছরের গৌরব নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টি এসব ঐতিহ্যের অন্যতম। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া মিষ্টির জন্য সুপরিচিত। অনেক প্রকরণের মাঝে সবার আগে যে নামটি আসবে সেটি হলো ছানামুখী মিষ্টি, যাকে স্থানীয়রা মুকড়িও বলে থাকেন। নরম ছানার ওপর হালকা চিনির প্রলেপ দিয়ে ছোট ছোট চার কোনা আকৃতির এ মিষ্টির জনপ্রিয়তা সারা বাংলাদেশেই। 

ঢাকা সহ,সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লায় পাঠানো ব্যাপক পরিমাণে চাহিদা রয়েছে এই মিষ্টির।এমনকি বিদেশেও পাঠানো হয় এই ছানামুখী মিষ্টি।

ছানামুখী মিষ্টি প্রথম তৈরি করেন কাশী থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসা মহাদেব। তিনি প্রায় ১৮০ বছর আগে এই মিষ্টি প্রথম বানান। বর্তমানে তার মহাদেব মিষ্টান্ন ভান্ডার ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদর্শ মাতৃভান্ডার, মাতৃভান্ডার, জগদ্ধার্তী মিষ্টান্ন ভান্ডার এই মিষ্টি বানিয়ে থাকে এবং এদের প্রায় সবারই মিষ্টির স্বাদের সুনাম রয়েছে ক্রেতাদের মধ্যে।

মহাদেব মিষ্টান্ন ভান্ডারের মিষ্টি কারিগররা দীর্ঘদিন ধরে এই মিষ্টি বানিয়ে আসছেন। ছানামুখী মিষ্টিতে শুধুই প্রয়োজন হয় গরুর খাটি দুধ আর চিনি। 

প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই মিষ্টি বানিয়ে আসা এক কারিগরের কাছে বানানোর প্রক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রায় ছয় থেকে সাত লিটার গরুর দুধ প্রয়োজন হয় এক কেজি ছানামুখী তৈরি করতে। গ্রাম থেকে আসা দুধ দিয়ে ছানা তৈরি করে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সুতি কাপড়ে বেধে ঝুলিয়ে রাখতে হয় পানি ঝরার জন্য। তারপর ছানা গুলো ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে গেলে ছোট চারকোনা আকৃতির করে কেটে নিতে হয়।” 

“কেটে নেওয়া হলে ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করা হয় মিষ্টিগুলোকে। তারপর ঠান্ডা মিষ্টিগুলোকে চিনির সিরায় পাক দিতে হয় দশ থেকে পনেরো মিনিটের মতো। তারপর একটি বড় পাত্রে নিয়ে মিষ্টিগুলোকে নাড়িয়ে চিনির সিরা শুকিয়ে নিতে হয়। এভাবেই তৈরি হয় বিখ্যাত ছানামুখী মিষ্টি।”

আরেক কারিগর বলেন, “দশ থেকে পনেরো দিন ভালো থাকে এই মিষ্টি। শুধু একটি শক্ত হয়ে যায় সময় বাড়লে।”

মিষ্টি কিনতে আসা স্কুল শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “যে ব্যক্তি একবার এই মিষ্টি খেয়েছে, সে বার বার খেতে চায় এই মিষ্টি।” 

প্রতিদিন লাখ টাকার বেশি বিক্রি হয় এই মিষ্টি। প্রতি কেজি ৬০০ টাকা। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড় লেগে থাকে দোকানগুলোতে। 

স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান, যেমন - বিয়ে, প্রশাসনিক কোনো আয়োজন সহ যেকোন অনুষ্ঠানে দেখা যায় ছানামুখী মিষ্টি। ষাটোর্ধ্ব জয় বসাক মিষ্টি খেতে এসে বলেন, “ছোট বেলা থেকে আজ অবধি এই মিষ্টির স্বাদ অপরিবর্তনীয়।” 

আরেক ক্রেতা জানান যে এই মিষ্টি বেশি খাওয়া যায় কারণ এতে পরিমিত পরিমাণে মিষ্টি দেয়া থাকে, না কম না বেশি।

ছানামুখী মিষ্টিকে জেলা ব্র্যান্ড বুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলাপ্রশাসক। সারা বছর এর স্বাদ অক্ষুণ্ন রাখলেও পূজা বা অন্যান্য সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে মিষ্টি বানানোর চাপে পড়ে যেন এর স্বাদের তারতম্য না হয়, এমনটিই প্রত্যাশা স্থানীয় ক্রেতাদের। এছাড়া একে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া উচিৎ বলেও মনে করেন অনেকে।

নাওশিন মুশতারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

[email protected]

Share this news