
Published :
Updated :

রাস্তায় হাটঁতে হাটঁতে প্রায়ই চোখে পড়ে ফেরিওয়ালার কাছে আরবি হরফে টানা টানা করে আঁকা ছবির ফ্রেম। এটি শুধুমাত্র চিত্র নয়, এটি শিল্প। জড়বস্তুর এই হরফ বা অক্ষরগুলাকে মানুষ সৃজনশীলতা আর শৈল্পিক বুদ্ধি দিয়ে রুপান্তরিত করেছে শিল্পে। এটিই ক্যালিগ্রাফি আর্ট হিসেবে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ক্যালিগ্রাফি মূলত গ্রীক শব্দ ‘ক্যালিগ্রাফিয়া’ থেকে এসেছে। গ্রিক শব্দ ‘ক্যালোস’ আর ‘গ্রেফেইন’ - এই দুই শব্দের মিলিত রুপই হচ্ছে ক্যালিগ্রাফিয়া। ক্যালোস অর্থ সুন্দর আর গ্রেফেইন অর্থ লেখা। বাংলায় যাকে বলা হয় চারুবিদ্যা; অর্থাৎ, সুন্দর করে লেখাকেই ক্যালিগ্রাফি বলা হয়।
ক্যালিগ্রাফি আর্টে হরফকে সাজানো হয় যেটি একটি সুনির্দিষ্ট অর্থ বহন করে। শুধু হরফই নয়, চিত্রে ব্যবহৃত ভিন্ন ভিন্ন রঙও ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। আরবি হরফ ব্যবহার করে এই আর্ট বেশি করা হলেও ইংরেজি, জাপানি, চাইনিজ - যেকোনো ভাষায় যেকোনো হরফ ব্যাবহার করে অর্থবহ চিত্র অংকন করাই ক্যালিগ্রাফি আর্ট।
ক্যালিগ্রাফি আর্ট দুই ধরনের। ট্রাডিশনাল ক্যালিগ্রাফি ও পেইন্টিং ক্যালিগ্রাফি।
ক্যালিগ্রাফি আর্ট করতে সবার প্রথমে যেটি লাগে সেটি হচ্ছে অক্ষর জ্ঞান। অক্ষর, শব্দ, কার, ফলা, হরফ, নুকতা - এসব কিছুর ব্যাকরণ ও অর্থ জেনেই একজন ব্যাক্তি অরিজিনাল কম্পোজিশন তৈরি করতে পারে। সবকিছু জানার মাধ্যমে সে তার নিজস্ব আবেগ, চিন্তা, ভালো লাগা, মন্দ লাগা নিয়ে অর্থবহ শিল্প সৃষ্টি করতে পারে।
ভাষা এবং হরফ জ্ঞান ছাড়া একজন ব্যাক্তি দেখে দেখে আঁকলে সেটি কখনোই শিল্প হতে পারে না। প্রকৃত অর্থে শিল্প সৃষ্টি করতে তাকে অবশ্যই জানতে হবে।
ক্যালিগ্রাফি আর্ট করতে ভিন্ন ভিন্ন নিবের কলম ব্যাবহার করা হয়ে থাকে। হরফের আকার ও তাকে মোটা চিকন করতে এই ভিন্ন ভিন্ন নিবের ব্যাবহার করেন শিল্পীরা। এছাড়া কখনো কখনো সূঁচ সুতারও ব্যাবহার করতে দেখা যায়।
ক্যালিগ্রাফি আর্টে রঙ ব্যাবহার এই শিল্পকে আরো সুন্দর করে তোলে। সাধারণত সাদা কালো ক্যালিগ্রাফিই বেশি দেখা যায়। তবে তা পুরোপুরি শিল্পীর ওপর নির্ভর করে। শিল্পী যদি চান তার শিল্পে অন্য রঙের ব্যবহার করতে পারেন।
বর্তমানে ক্যালিগ্রাফি আর্ট বিক্রি করে অর্থ আয়ও করা যাচ্ছে। ক্যালিগ্রাফি আর্টিস্ট মার্জিয়া জাহান বলেন, “ক্যালিগ্রাফি আর্টকে জাদুতে পরিণত করতে ব্যাক্তির নিজস্ব সৃষ্টি একান্তু প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজন হয় হরফ জ্ঞান। তাকে অবশ্যই ভাষাগত ও ব্যাকরণগত জ্ঞান রাখতে হয়।”
বাংলা ক্যালিগ্রাফি বর্তমানে চিত্রশিল্পীদের মধ্যে এক আগ্রহের নাম হয়ে উঠেছে। আরহাম উল হক চৌধুরী, শ্রেষ্ঠা হালদার, বাংলা ক্যালিগ্রাফি আর্টের মাধ্যমে প্রশংসা অর্জন করেছেন। এছাড়া নিলাঞ্জন বঙ্গোপাধ্যায় বাংলা কবিতাতে ক্যালিগ্রাফি আর্টের ব্যাবহার করে আলোচনায় এসেছেন।
সারা বিশ্বেই ক্যালিগ্রাফির চাহিদা বাড়ছে। বছরজুড়েই নানা সময়ে এই শিল্পের ওপর প্রদর্শনী হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এটি তুলনামূলক নতুন হওয়ায় সরকারি উদ্যোগে তেমন কোনো প্রদর্শনীর আয়োজন না হলেও কিছু সংগঠন ও শিল্পী তাদের ব্যাক্তিগত উদ্যোগে কিছু প্রদর্শনীর আয়জন করে থাকেন। তাছাড়া শিল্পীদের উদ্যোগে কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
মাহবুব মুরশিদ এদের মধ্যে অন্যতম একজন শিল্পী যিনি তার ব্যাক্তিগত উদ্যোগে এমন অনেক কর্মশালা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করেন।
শুরুর দিকে শুধু আরবি হরফে ক্যালিগ্রাফি করা হলেও বর্তমানে অন্যান্য ভাষায় ক্যালিগ্রাফি আর্টের দিকে শিল্পিদের ঝোঁক চোখে পড়ার মতো। তরুনদের মধ্যে এই আর্টের প্রতি বেশ উৎসাহ লক্ষ করা যায়। অনেকে আবার ক্যালিগ্রাফি আর্টকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন পেইজ, ওয়েবসাইট বা প্রদর্শনীর মাধ্যমে।
এছাড়া, ডিজিটাল প্রিন্টিংকে কাজে লাগিয়ে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা তাদের এই শিল্পে আধুনিকায়নের ছোঁয়া দিচ্ছেন।
nawshinmushtary38@gmail.com

For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.